আহমদুল হাসান আসিক    |    
প্রকাশ : ২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’র এক বছর
সেই জাহাজ বিল্ডিং এখন ভুতুড়ে বাড়ি
অপারেশনে নিহত ৫ জন ‘আত্মঘাতী সেল’-এর সদস্য, ২ জন প্রশিক্ষক একসঙ্গে তিন হামলার পরিকল্পনা, টার্গেট ছিল বিদেশিরা * জাহাজ বিল্ডিংয়ের পঞ্চম তলার দেয়ালে এখনও রক্তের দাগ
কল্যাণপুরের ‘জাহাজ বিল্ডিং’ নামে পরিচিত ‘তাজ মঞ্জিল’ এখন ভুতুড়ে বাড়ি। পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযান ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’এর এক বছর পরও সেই বাড়ির জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি। বাড়ির সামনে ‘টু-লেট’ ঝোলানো থাকলেও মিলছে না ভাড়াটিয়া। এক সপ্তাহ আগে বাড়ির নিচতলায় দুটি পরিবারকে ভাড়া ছাড়াই থাকতে দিয়েছেন বাড়িওয়ালা। নিচতলা ছাড়া সাত তলা বিল্ডিংয়ের পুরোটাই ফাঁকা। স্থানীয়রা বলছেন, গত বছরের ২৬ জুলাই অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার পর এ বাড়িটি তখন সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এখনও সামনে দিয়ে গেলে কৌতূহল নিয়ে সবাই বাড়িটির দিকে তাকান। অনেকে ভয়ে এ বাড়িতে প্রবেশ করতে চান না। ভাড়াটিয়াও আসতে চায় না বাড়িতে। বাড়ির মালিকও বাসা ছেড়ে রাজধানীর জুরাইনের বাড়িতে চলে গেছেন।
বাড়ির মালিক আতাহার উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী মমতাজ পারভীন যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার দুই মাস পর বাড়িটি আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়। এখন বাসার সামনে ‘টু-লেট’ লাগিয়েছি। নিচতলায় দুটি পরিবারকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিয়েছি। এখনও বাড়ির কোনো ফ্ল্যাট ভাড়া দেয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জাহাজ বিল্ডিংয়ে কোনো ভাড়াটিয়া উঠতে চায় না। সবার মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। বাড়িওয়ালাও এই বিল্ডিং ছেড়ে দিয়েছে। এখন বাড়িটি ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। এ বাড়ি নিয়ে এখনও সবার মধ্যে কৌতূহল কাজ করে। এদিকে ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ এর এক বছর পর মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, কল্যাণপুরের অভিযান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর মধ্য দিয়ে জঙ্গিবিরোধী সফল অভিযানের সূত্রপাত হয়। একসঙ্গে তিন স্থানে হামলার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা। তাদের মূল টার্গেট ছিল বিদেশিরা। কল্যাণপুরে অভিযানে ৯ সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত জঙ্গি নিহত হওয়ায় সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তিনি বলেন, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর বাংলাদেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বায়ারসহ দেশের মানুষের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। কল্যাণপুরের অভিযানের মাধ্যমে আমরা সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পেরেছি। জঙ্গিদের নাশকতার পরিকল্পনা রুখে দিয়েছি।
সিটিটিসি বলছে, মামলার এজহারভুক্ত ১০ আসামির মধ্যে সাতজন পলাতক থাকলেও শিগগিরই অভিযোগপত্র দেয়া হবে। অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে দুই সপ্তাহ আগে। এটি পর্যালোচনা করে অভিযোগপত্র দেয়া হবে। নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৮ জনের পরিচয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হল- আকিফুজ্জামান খান, সেজাদ রউফ অর্ক, তাজ-উল-হক রাশিক, আবদুল্লাহ, আবু হাকিম নাইম, মতিউর রহমান, জোবায়ের হোসেন ও রায়হান কবির ওরফে তারেক ওরফে ফারুক।
নিহতদের মধ্যে দু’জন জঙ্গি প্রশিক্ষক : একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, কল্যাণপুরের অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে আবদুল্লাহ ও তারেক ‘অপারেশনাল সেল’ বা ‘আত্মঘাতী সেলের’ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিত। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী জঙ্গিদের প্রশিক্ষণও দিয়েছিল তারা। ওই বাড়িতে বসে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বিদেশিদের টার্গেট করে একসঙ্গে তিনটি বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা। এমন গোয়েন্দা তথ্যও ছিল পুলিশের কাছে। পরে ব্লক রেইড দিয়ে জাহাজ বিল্ডিংয়ে জঙ্গিদের সন্ধান মেলে। সেখানে সোয়াতের অভিযানে দুই জঙ্গি প্রশিক্ষকসহ ৯ জন নিহত হয়। রাকিবুল হাসান রিগ্যান নামে এক জঙ্গি আহত অবস্থায় ধরা পড়ে। ইকবাল নামে এক জঙ্গি একে-২২ নিয়ে আস্তানা থেকে পালিয়ে যায়।
ইকবাল সম্পর্কে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ইকবাল সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ইকবাল তার সাংগঠনিক নাম। বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহতদের অনেকের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধারণা করছি, ইকবাল কোনো অভিযানে নিহত হয়েছে।
তিন স্থানে একসঙ্গে হামলার পরিকল্পনা : সিটিটিসির প্রধান বলেন, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে তিন স্থানে হামলার পরিকল্পনা করেছিল নব্য জেএমবি। এ জন্য তারা নারায়ণগঞ্জে বাসাও ভাড়া নিয়েছিল। তারা মনে করেছিল, হলি আর্টিজান সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। একসঙ্গে তিন জায়গায় হামলা চালালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সামাল দিতে পারবে না। এ কারণে তারা এ পরিকল্পনা নেয়। মূলত দেশকে অকার্যকর করার চেষ্টা, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে তারা এ প্রস্তুতি নিয়েছিল।
সোহেল মাহফুজকে কল্যাণপুরের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে : নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও মজলিসে শূরা সদস্য সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজকে (আবদুস সবুর) কল্যাণপুরের ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কল্যাণপুরের ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকায় তাকে এ মামলায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংস্থা সিটিটিসির প্রধান। মনিরুল ইসলাম বলেন, সোহেল মাহফুজ গ্রেফতার হওয়ার পর তার নব্য জেএমবি গঠন, নব্য জেএমবির সঙ্গে তার যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সংগঠন সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছে। কল্যাণপুরের ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকায় এজাহারে নাম না থাকলেও তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এজাহারে নাম নেই কিন্তু কল্যাণপুরের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও চারজনকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তারা হল- মাওলানা আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর, আহমেদ আজওয়াদ তালুকদার ওরফে অমি, আবদুর রউফ প্রধান এবং সালাউদ্দিন কামরান। এদিকে এজাহারে নাম থাকলেও জুনায়েদ হাসান খান, মামুনুর রশীদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদের সম্পৃক্ততা এখনও পাওয়া যায়নি। তারা ঘটনার সময় দেশের বাইরে পলাতক ছিল।
নব্য জেএমবি এখন সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনেক জঙ্গি তাদের মনোবল এবং সংগঠনের ওপর আস্থা হারিয়েছে। সোহেল মাহফুজ নিজেও তার জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে তারা ভুল পথে ছিল। বিদেশি হত্যা ও ধর্মের নামে হত্যার অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল। সংগঠনেও এটি সংক্রামিত হয়েছে। অনেকের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। অনেক জঙ্গির উপলব্ধি হয়েছে, তারা দেশের ক্ষতি করেছে। এ কারণে তাদের রিক্রুটমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জাহাজ বিল্ডিংয়ের পঞ্চম তলার দেয়ালে এখনও রক্তের দাগ : মঙ্গলবার দুপুরে জাহাজ বিল্ডিংয়ে কথা হয় নিচতলার বাসিন্দা এক নারীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরের কাছে নিজের পরিচয় দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে তারা জাহাজ বিল্ডিংয়ের নিচতলায় উঠেছেন। তার স্বামী পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তাদের পাশের ইউনিটে আরও একটি পরিবার উঠেছে। এর বেশি তিনি আর কথা বলতে রাজি হননি। পরে বিল্ডিংয়ের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, সিঁড়ির পাশের দেয়ালে এখনও রক্তের দাগ লেগে আছে। পঞ্চম তলায় দুটি ইউনিট। প্রতি ইউনিটে ৬টি করে খুপড়ি ঘর। ওই দুটি ইউনিটের ১২টি কক্ষ ভাড়া নিয়ে জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে তোলে। অভিযানের সময় কক্ষগুলোর দেয়ালে অনেক গুলি লেগে দেয়াল খসে পড়েছিল। এগুলোতে নতুন করে সিমেন্টের প্রলেপ দেয়া হয়েছে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত