• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯
যুগান্তর ডেস্ক    |    
প্রকাশ : ২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ভারি বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত
ভেঙে গেছে চিত্রা নদীর বেড়িবাঁধ * ভেসে গেছে ১০ হাজারের বেশি চিংড়ি ঘের * ফসল ডুবে কৃষকের মাথায় হাত
নিন্মচাপের প্রভাবে ভারি বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে বাগেরহাট জেলার ১০ হাজারের বেশি বাগদা, গলদা চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। জলমগ্ন হয়ে রয়েছে মাছের ঘের ও সবজি বাগান। চিতলমারী উপজেলার চিত্রা নদীর রিং বেড়িবাঁধ ভেঙে সদর উপজেলার ১০ গ্রাম তলিয়ে গেছে। বান্দরবানের লামা-আলীকদম-ফাঁসিয়াখালী সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জোয়ারের পানি আর ভারি বর্ষণে জনজীবনে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে খুলনা, বরগুা, বরিশাল, পিরোজপুর, ফেনী, রাজশাহী, পাবনা, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বাগেরহাট : চিতলমারী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিপুল কৃষ্ণ পাল জানান, ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে উপজেলার ৫ হাজার ১৭০টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। এতে প্রায় ২৩ কোটি ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবমতে, ক্ষতিগ্রস্ত ঘের বা পুকুরের সংখ্যা বাড়তে পারে। উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবুল হাসান জানান, ভারি বর্ষণে এ পর্যন্ত এ উপজেলায় আমন বীজতলা ৫৫ হেক্টর, রোপা আমন ২৯৫ হেক্টর, সবজি ৫০৫ হেক্টর, আউশ ধান ২৫ হেক্টর, পান বরজ ৭ হেক্টর তলিয়ে গেছে।
চিতলমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ নিজাম উদ্দিন জানান, তার ইউনিয়নের খিলিগাতী, খড়িয়া, করাদ দিয়া, ও ডুমুরিয়া এলাকার চিত্রা নদীর রিং বেড়িবাঁধ ভেঙে ৫ শতাধিক বাড়িঘরসহ এ ইউনিয়নের প্রায় ৯০ ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ পরিদর্শন করেছেন এবং বাঁধ মেরামতের জন্য সরকারিভাবে ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন।
ভেসে গেছে জেলার বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় ১০ হাজার মৎস্য ঘের। এ অবস্থার মধ্যে মৎস্য চাষীরা বাজার থেকে জাল কিনে নিজ নিজ ঘেরের মাছ রক্ষা করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
লামা (বান্দরবান) : লামা উপজেলায় মাতামুহুরী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ঝিরি ও খাল দিয়ে পানি ঢুকে পড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এ উপজেলার লামা পৌরসভা, রূপসী পাড়া, গজালিয়া, ফাঁসিয়াখালী, লামা ও সদর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এ এলাকার ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, লামা বাস টার্মিনাল, ইয়াংছা, শীলের তোয়া, লাইনঝিরিসহ বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে তলিয়ে আছে। উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। লামা-আলীকদম-ফাঁসিয়াখালী সড়কের বদুরঝিরি এলাকার রাস্তার ওপর পার্শ্বের পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়লে সকাল থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) : চকরিয়া ও পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। মঙ্গলবার প্রবল বর্ষণে মাতামুহুরী নদীর পানি ও সামুদ্রিক জোয়ারের পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পেকুয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। চকরিয়া মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢল নামায় অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শতাধিক চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। মাতামুহুরী নদীর চিরিঙ্গা ব্রিজ ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরজমিন দেখা যায়, পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, রাজাখালী, টৈটং, শিলখালী ও পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া এসব এলাকায় বেড়িবাঁধের বহু অংশে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। মঙ্গলবার পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মেহেরনামা হাজির ঘোনা এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ওই ভাঙন দিয়ে সদর ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে মাতামুহুরী নদী থেকে ঢলের পানি ঢুকছে। প্রবল বর্ষণ ও সামুদ্রিক জোয়ারে চকরিয়া উপজেলার ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বদরখালী ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে উপচে লোকালয়ে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি ঢুকেছে। এসব এলাকায় বহু চিংড়ি ঘের জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে।
খুলনা ও দাকোপ : তলিয়ে গেছে খুলনার নিম্নাঞ্চল। স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। বৃষ্টির প্রচণ্ডতায় ঘর থেকে বের হতে পারছে না মানুষজন। বিপাকে পড়েছে নিন্মআয়ের মানুষগুলো। আবহাওয়া অফিস বলছে, আজ বুধবার রাত থেকে অবস্থার উন্নতি হতে পারে। আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী, সোমবার ভোর ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে খুলনায়। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পাইকগাছা, দাকোপ ও কয়রা উপজেলার বিভিন্ন চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। কয়রা উপজেলার চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী মোস্তাজিবুল হক জানান, তার ২০ বিঘা জমির ঘের পানিতে ভেসে গেছে। এতে তার চার লক্ষাধিক টাকা লোকসান হবে।
দাকোপের নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে আছে। সরেজমিন ৯টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা ঘুরে দেখা যায়, ওয়াপদার অধিকাংশ স্লুইস গেট অকেজো থাকায় পানি নিষ্কাশন ঠিকমতো হচ্ছে না। ফলে উদ্বেগজনকভাবে পানি জমছে আবাদি জমি, বসতভিটা সহ সর্বত্র।
আমতলী (বরগুনা) : উপকূলীয় বরগুনার আমতলী উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে আমনের অধিকাংশ বীজতলা। অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। প্লাবিত হয়েছে পৌর শহরের আমুয়ার চরসহ ৩০টি গ্রাম ও চর। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব চর ও গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫০ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল ও ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে দেশীয় জাতের বীজতলা রয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এসব বীজতলার অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে।
বরিশাল : চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বরিশাল নগরবাসী। বিশেষ করে অফিস এবং স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনও মুষলধারে বৃষ্টির কারণে চলাফেরায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে যথাসময়ে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছতে পারেননি অনেকে। এ ছাড়া টানা বৃষ্টির কারণে নগরীর নিম্নাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। আবহাওয়া অফিস বলছে, জোয়ারের সঙ্গে বৃষ্টির কারণে পানির এ বৃদ্ধি। দেশের সব সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত এবং নদীবন্দরসমূহকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) : কাউখালীর নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২৫টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ। পানিবন্দি এলাকাগুলো হল : উপজেলার রোঙ্গাকাঠি, গন্ধব, আশোয়া, আমরাজুরী, কুমিয়ান, হোগলা বেতকা, সয়না, ধাবরী, মেঘপাল, সোনাকুর, হরিণধারা, শিয়ালকাঠি, চিরাপাড়া, ডুমজুরী, জোলাগাতি, ফলইবুনিয়া, বিজয়নগর, কেশরতা, বাশুরী ও জয়কুল।
দাগনভূঞা (ফেনী) : দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া বিঘœ ঘটছে। পানিবন্দি দুর্গত এলাকার জন্য সরকার ২ টন খাদ্য বরাদ্দ করেছে। এলাকাটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন পরিদর্শন করেছেন।
রাজশাহী : মহানগরীতে মঙ্গলবার দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। রোববার দুপুর পৌনে ২টায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়। সেই থেকে বিরতিহীনভাবে বৃষ্টি চলছেই। অবিরাম বর্ষণ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বর্ষাকাল চলছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটেছে। টিপ টিপ বৃষ্টি আর মেঘমেদুর আবহাওয়া নগরবাসীর কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির জন্য সকাল থেকেই প্রধান সড়কগুলোয় যানবাহন চলাচল কম ছিল। রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে সকাল থেকে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি।
পাবনা : পাবনা পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক জলাবদ্ধতা। শহরের নিম্নাঞ্চল তো বটেই পাবনা শহরের প্রধান প্রধান সড়কেও এখন হাঁটুপানি। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে পৌরসভার উদ্যোগ নেই। তারা বলছেন, সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই এ সমস্যা সমাধানের জন্য। টানা বর্ষণে পাবনা শহরের ১৫টি ওয়ার্ডের ১০টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকায় মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পৌরসভার হাজার হাজার মানুষ।
মধুখালী (ফরিদপুর) : মধুখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মচিরসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সরেজমিন বিভিন্ন স্থান ঘ–রে দেখা গেছে, মৌসুমি অর্থকরী ফসল মরিচের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বৃষ্টির পানিতে ডুবে। চাষীরা যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করে মরিচের চাষ করেছেন তার এক-চতুর্থাংশও ঘরে তোলা সম্ভাবনা নেই।
সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) : সিংগাইর উপজেলার কৃষিক্ষেত্রসহ সড়কগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়কসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেইসঙ্গে রোপা আমন চাষে বিঘিœত হয়েছে এবং রোপণকৃত আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনে হাটবাজারে আসা-যাওয়া বন্ধ রয়েছে। কৃষক পরিবারগুলো বৃষ্টিতে ঘর থেকে বের হতে না পায়ায় রুটি-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। নিম্নাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় নৌকা দিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত