logo
টানা পঞ্চমবার জয় চায় আ’লীগ পুনরুদ্ধার চেষ্টায় বিএনপি
জাতীয় পার্টিও তৎপর
    |    
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
ব্রিটিশবিরোধী ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহের সূতিকাগার বঙ্কিম চন্দ্রের আনন্দমঠ খ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুর নামের সঙ্গে দেশের অন্যতম বনাঞ্চলের উপাধিও যুক্ত। সঙ্গে আনারস, আদিবাসী গারো, রাবার বাগান ও সাম্প্রতিক কলাচাষ মধুপুরকে আরও সমৃদ্ধ এবং পরিচিত করেছে। মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে টাঙ্গাইল-১ আসনের এমপি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। চার দফায় টানা এ আসন থেকে এমপি হয়ে আসছে আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনেও আসনটি ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। বিএনপিও চেষ্টা করছে আসনটি নিজেদের পক্ষে নিতে।

১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৩ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। কিন্তু আসনটি তখনই হাতছাড়া হয়। তখন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মধুপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মহেন্দ্র লাল বর্মণকে হারান জাসদের আবদুস সাত্তার (মশাল)। জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী আসাদুজ্জামান পরাজিত হন বিএনপির নবাবজাদা সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরীর কাছে।

১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগের ডা. নিজামুল ইসলাম প্রথম এমপি হন। ’৮৮ সালের আলোচিত নির্বাচনে আ’লীগ ও বিএনপি অংশ নেয়নি। তখন ডাকসু’র সাবেক সদস্য খন্দকার আনোয়ারুল হক স্বতন্ত্র ভোট করে এমপি হন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন।

নব্বইয়ে রাজনৈতিক পটবদলের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে অভিষেক হয় আবুল হাসান চৌধুরীর। ঝড়ো বেগে আবির্ভূত হয়ে বিএনপির আশিকা আকবরকে মাত্র ২ হাজার ভোটে হারিয়ে আ’লীগের আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার নির্বাচিত হন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ছেলেকে বিরোধী দলের হুইপ ও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদকের পদও দেয়া হয়।

১৯৯৬ সালের ১৫ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মহাসচিব পাশের জেলা জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার এমপি হন এ আসনে। একই বছর ১২ জুনের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবুল হাসান চৌধুরী বিএনপি মহাসচিব সালাম তালুকদারকে পরাজিত করেন এবং তাকে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়।

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে নতুন মুখ আবির্ভূত হয়। সালাম তালুকদারের মৃত্যুতে বিএনপির মনোনয়ন পান টাঙ্গাইল-২ আসনের এমপি আফাজ উদ্দিন ফকিরের ছেলে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা শিল্পপতি ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন জনতার মঞ্চের অন্যতম স ষ্টা প্রকৃচির তৎকালীন মহাসচিব কৃষিবিজ্ঞানী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক। ড. রাজ্জাক দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক প্রায় ৮০ হাজার ভোটে বিএনপির মাহবুব আনামকে দ্বিতীয়বারের মতো হারান। ড. আবদুর রাজ্জাককে খাদ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। সব মিলিয়ে টাঙ্গাইল-১ আসনে ড. রাজ্জাক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ড. আবদুর রাজ্জাক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে অর্থবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

মূলত তিনিই আওয়ামী লীগের এ আসনের একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী। দলের নেতাকর্মীরা একাট্টা। জানতে চাইলে ড. আবদুর রাজ্জাক জানান, দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। তাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর জনগণের আস্থা আরও বেড়েছে। মধুপুর-ধনবাড়ী উপজেলার উন্নয়নে তিনি অনেক কাজ করেছেন। তাই এ আসনের জনগণ তাকে আবারও নির্বাচিত করবেন বলে তিনি শতভাগ আশাবাদী।

এছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সাবেক জিএস শামসুন নাহার চাঁপা ও মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছরোয়ার আলম খানের নাম প্রার্থী তালিকায় থাকার কথা শোনা যাচ্ছে। এলাকার মোড়ে মোড়ে চাঁপার নামে পোস্টার-ব্যানার-বিলবোর্ড শোভা পাচ্ছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফকির মাহবুব আনামের প্রার্থিতা নিয়ে মধুপুর উপজেলা বিএনপিতে বিভেদ নেই। বিএনপি নেতাকর্মীরা ফকির মাহবুবকে নিয়ে মাঠে কাজ করছেন। সেবামূলক নানা কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা রয়েছে। দুই উপজেলায় উন্নয়নে তার অবদান অনেক। ফকির মাহবুব আনাম স্বপন বলেন, রাজনীতিতে আসায় এমপি না হয়েও নিজের টাকায় মধুপুর ধনবাড়ীর অনেক উন্নয়ন করেছি। ধনবাড়ীকে উপজেলায় উন্নীত করার পেছনে বিএনপি সরকার তথা তার অবদান রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সবকিছু ছেড়ে এসে এ অঞ্চলের মানুষ হিসেবে আমি সবার পাশে থাকতে চাই। সবার সহযোগিতা চাই। সারা দেশের মতো মধুপুর-ধনবাড়ী উপজেলার জনগণও সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। তাই নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে জনগণ আমাকে নির্বাচিত করবে বলে আশাবাদী।’

তবে বিএনপি ও সাধারণ জনগণের মধ্যে অনেকে মনে করেন, স্থানীয় যে কোনো নেতাকে মনোনয়ন দিলে বিএনপির ভোটের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এছাড়াও মধুপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি তিনবারের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার ও সাধারণ সম্পাদক তিনবারের সাবেক পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম সরকারের (সহিদ) নাম আসছে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায়। জাকির হোসেন সরকার ও সরকার সহিদ দুইজনই জানিয়েছেন, তারা প্রার্থী- এমন ঘোষণা বা ভাবনা তাদের নেই। দলের কর্মী পর্যায় থেকে উঠে আসা দাবির প্রতি সম্মান রেখে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই কাজ করে ধানের শীষ প্রার্থীকে বিজয়ী করবেন।

এছাড়া বিএনপি থেকে সদ্য জাতীয় পার্টিতে যোগদানকারী চলচ্চিত্রকার নুরুল ইসলাম রাজকে মৌখিক মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনী কাজে মাঠে নামতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্দেশ দিয়েছেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। নুরুল ইসলাম রাজ জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। গণসংযোগে জাতীয় পার্টির পক্ষে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ধনবাড়ী উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৬৫ জন। দুই উপজেলা মিলে এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬০৮ জন।