বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী থেকে    |    
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
আ’লীগে নজরুলের পাল্লাই ভারি আসন পুনরুদ্ধার চায় বিএনপি
জাতীয় পার্টিতে মনোনয়ন চান শফিকুল ইসলাম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরব হয়ে উঠেছে নরসিংদী সদর আসনের রাজনৈতিক অঙ্গন। তৃণমূলে দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন নেতারা। এ আসনের বর্তমান এমপি লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু বীর প্রতীকের পেছনে একাট্টা স্থানীয় আওয়ামী লীগ। হীরুই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে নজরুল ইসলামের নিরলস চেষ্টায় সদর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম দফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলেও পরের দফায়ই আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নজরুল ইসলামের হাত ধরে আসনটি আওয়ামী লীগের কব্জায় আসে। ২০১৪ সালেও জয়লাভ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম। আগামী নির্বাচনে তিনি আসনটি ধরে রাখতে চাইছেন। তিনি ছাড়াও ফ্লোরিডা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আইয়ুব খান মন্টু মনোনয়ন চাচ্ছেন। এরই মধ্যে গোটা এলাকায় নির্বাচনী আমেজ বইতে শুরু করেছে। প্রার্থীদের পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে এলাকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সরব প্রার্থীরা। মাঠে সক্রিয় রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন। বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির ছাড়াও বিএনপির আরও দু-একজন প্রার্থী মাঠে সক্রিয়। বিএনপির মনোনয়ন তালিকায় রয়েছেন সাবেক এমপি সামসুদ্দিন আহম্মেদ এছাকের বড় ছেলে হারুন-অর রশিদ হারুন এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মনজুর এলাহী। তবে বিএনপিতে খায়রুল কবির খোকনের পাল্লাই ভারি। এ আসনে জাতীয় পার্টিও মাঠে রয়েছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির জেলা শাখার সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন। তিনি নানা কৌশলে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে সভা-সেমিনারসহ গণসংযোগ করছেন। একসময়ে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নরসিংদী সদর আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া এখন স্থানীয় বিএনপি। দলকে চাঙ্গা করতে সংগ্রহ করা হচ্ছে নতুন সদস্য। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে মামলা-হামলা মাথায় নিয়ে সভা-সমাবেশ করছেন নরসিংদী জেলা বিএনপির নেতারা। তবে কোন্দল আর অন্তর্কলহের খোলস থেকে মুক্ত হতে পারছে না উভয় দলই।

জেলা নির্বাচন কমিশন বলছে, ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মোসলেহ উদ্দীন ভূইয়া প্রথম এমপি হন। পরে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল মোমেন খান বিজয়ী হন। ক্ষমতার পালাবদলের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৪ সালে নরসিংদীকে জেলা ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এমপি হন জাতীয় পার্টির মেজর (অব.) সামসুল হুদা বাচ্চু। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামান বেবী এমপি হন। ১৯৯১ সালে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে বিএনপির সামসুদ্দিন আহমেদ এছাক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপির সামসুদ্দিন এছাক জয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন। ২০০৩ সালে এছাকের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে এমপি হন ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচনে বিএনপির খায়রুল কবির খোকনকে পরাজিত করে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম হীরু। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও বিজয়ী হন হীরু। দ্বিতীয় দফা এমপি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন।

দশম সংসদ নির্বাচনের আগে জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল নরসিংদী-৫ আসনের এমপি সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর হাতে। ২০১১ সালে নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডে রাজুর ছোট ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এর পরই শুরু হয় আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য কোন্দল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কোন্দলের অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ভূঁইয়াকে দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

কথা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি নবাগত হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে ২০০৮ সালে সদর আসন থেকে মনোনয়ন দেন। ১৯৭৩ সালে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়। আমিই আসনটি উদ্ধার করে আওয়ামী লীগকে উপহার দিই। এখন নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। ত্যাগী নেতাকর্মীরা দলে ঠাঁই পেয়েছে। নতুন সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে আমরা প্রান্তিক পর্যায়েও আওয়ামী লীগের বীজ বপন করেছি। তাই আগামী নির্বাচনে সদরসহ ৫টি আসনেই আমরা বিজয়ী হব। সদর আসনটি সব সময়ই উন্নয়নবঞ্চিত ছিল। চরাঞ্চলের করিমপুর, নজরপুর, আলোকবালী ও চরদীঘলদী চারটি ইউনিয়নে এক ফুট পাকা রাস্তাও ছিল না। সেখানে আমরা নতুন করে পাকা সড়ক তৈরি করেছি। শতকোটি টাকা ব্যয়ে মেঘনা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে ওইসব অঞ্চলে দুই লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে। কলকারখানাসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে চরাঞ্চলে। সেখানে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এসেছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সদর উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নসহ প্রায় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান আছে। আগামীতে একটি মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ১০০ শয্যা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ সংযোজন করা হবে। এ ছাড়া আরও ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে আমার উদ্যোগেই। আগামী নির্বাচন নিয়ে ফ্লোরিডা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আইয়ুব খান বলেন, আমি দল থেকে মনোনয়ন চাইব। আশা করি, দলের নীতিনির্ধারকরা আমার বিষয়টি দেখবেন। এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

আগামী নির্বাচন ও মনোনয়ন নিয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন বলেছেন, অনেকেই দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন। কিন্তু মনোনয়ন দেয়াটা কেন্দ্রের ব্যাপার। আমরা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন চাই। একতরফা নির্বাচন মেনে নেয়া হবে না। নির্বাচনের পরিবেশ স্বচ্ছ রাখতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ তথা সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। নরসিংদীতে বিএনপির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আবাদ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সদর আসনসহ জেলার ৫টি আসনেই বিপুল ভোটে বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ আমাকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছেন। কিন্তু মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন ক্ষমতার দাপটে ব্যালট ছিনতাই ও ইলেকশন-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমাকে পরাজিত দেখানো হয়েছে।

বিএনপির অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মনজুর এলাহী বলেন, আশা করি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নতুনদের দলে সুযোগ দেবেন। মনোনয়ন পেলে ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয় ছাড়া বিকল্প কিছুই ভাবছি না। আর জেলা বিএনপির নতুন কমিটি হলে দল আরও শক্তিশালী হবে। জাতীয় পার্টির সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, বিগত দিনে জাতীয় পার্টি এ আসনে দু’বার জিতেছে। এখানে জাতীয় পার্টির নয় বছরের শাসনামলে রাস্তাঘাটসহ ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়। নংসিংদীকে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত করা হয়। এখনও জাতীয় পার্টির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। যদি জাতীয় পার্টি থেকে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়, তাহলে নরসিংদীর ভাসমান মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থাসহ ব্যাপক উন্নয়ন করব। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নরসিংদী গড়তে কাজ করব।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত