যতন মজুমদার, ফেনী    |    
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
প্রসূতির পেটে গজ রেখে সেলাই
মুমূর্ষু রোকসানাকে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি
চিকিৎসকের বিচার দাবি
অস্ত্রোপচারের ৩ বছর পর প্রসূতির পায়ুপথে বেরিয়ে এলো ছয় ইঞ্চি লম্বা একটি গজ। পেটে অবর্ণনীয় ব্যথা নিয়ে জেলার বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে গিয়ে লাখ টাকা খরচ করেও কোনো প্রতিকার পাননি রোকসানা। কয়েক দিন আগে তার পায়ুপথে সামান্য করে গজ বের হলে তিনি তা কেটে ডাক্তারকে জানান। এটি বিশ্বাস না করে পুনরায় ব্যথার ওষুধ দেন ডাক্তার। অবশেষে শুক্রবার রোকসানার পায়ুপথ দিয়ে ৬ ইঞ্চি লম্বা গজ বেরিয়ে এলে তিনি তা না কেটে ছবি তুলে দেখান ডাক্তারকে। মুমূর্ষু অবস্থায় রোববার স্থানীয়রা ছাগলনাইয়া থেকে তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তিনি ফেনী সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কামরুজ্জামান ও ডাক্তার হারুন অর রশীদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
প্রসূতির পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেয়ার অপরাধে সার্জন জাসরিন আক্তার মিলির বিচারের দাবি জানিয়েছেন রোকসানার স্বামী মনির আহাম্মদ। তিনি জানান, তার স্ত্রীর ভুল চিকিৎসা করায় পরবর্তী চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার শেষ সম্বল যে রিকশা ছিল তাও বিক্রি করে দিয়েছেন। গত ৩ বছরে সুদের ওপর নিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে তার। অভিযুক্ত ডাক্তারের সুষ্ঠু বিচার চান।
প্রসূতির পেটে গজ থাকার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। আজ ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফেনী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অসিম কুমার সাহা। সোমবার বিকালে তিনি যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রসূতির পরিবারের অভিযোগ, ফেনীর হায়দার ক্লিনিকে প্রসূতিকে অস্ত্রোপচার করার পর পেটে গজ রেখে সেলাই করেছেন সার্জন জাসরিন আক্তার মিলি।
স্বামী রিকশাচালক মনির আহাম্মদ জানান, ২০১৪ সালের ৩০ জুলাই তার স্ত্রী রোকসানা আক্তারের প্রসব ব্যথা ওঠে। তৎকালীন জেলা সদরের এসএসকে রোডে মহিপালের স্কয়ার ডায়াবেটিস অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের গাইনি, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন ডাক্তার জাসরিন আক্তার মিলির তত্ত্বাবধানে ভর্তি করানো হয়। স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব না হওয়ায় অস্ত্রোপচার করে একটি কন্যাসন্তান জন্ম দেন রোকসানা। তারপর ২ আগস্ট তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি পাঠান ডাক্তার মিলি। কিছুদিন যাওয়ার পর পেটে ব্যথা অনুভূত হলে রোকসানাকে ব্যথার ওষুধ দেন ডাক্তার মিলি। ব্যথা না সারলে ডাক্তার মিলি তাকে বলেন, কোনো ভারি কাজ করা যাবে না। এভাবে ৩ বছর কেটে যায়। অবশেষে শুক্রবার রোকসানার পায়ুপথ দিয়ে ৬ ইঞ্চি লম্বা গজ বেরিয়ে এলে তিনি তা না কেটে ছবি তুলে দেখান ডাক্তারকে। যন্ত্রণায় ছটফট করলে পায়ুপথের দৃশ্যমান গজসহ রোববার দুপুরে ছাগলনাইয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান ডাক্তার নুরুল আমীন জাহাঙ্গীরের কাছে হাজির হলে তিনি জরুরি ভিত্তিতে রোকসানাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে ফেনী সদর হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার মহিলা বিভাগের ২নং ওয়ার্ডের ২নং বেডে ভর্তি রয়েছেন। তার অপারেশনের জন্য সিটি স্ক্যানসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরু হয়েছে।
মেডিকেল অফিসার অসীম কুমার সাহা বলেন, অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগ পর্যন্ত বলা যাবে না অপারেশনটি মাইনর না মেজর। এ বিষয়ে ইস্কয়ার হাসপাতালে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ছাড়পত্রে লেখা রয়েছে পরিচালনায় ডা. হায়দার ক্লিনিক (প্রা.) হাসপাতাল। হায়দার ক্লিনিকের পরিচালক সায়েমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ডাক্তার মিলির ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর জানতে চাইলে তাও দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ইস্কয়ার হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক বর্তমানে ইস্কয়ার ল্যাবের পরিচালক ফারুকের কাছে জানতে চাইলে তিনিও কিছু জানেন না বলে জানান।
অভিযুক্ত ডাক্তার জাসরিন আক্তার মিলির কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি রোগীর অপারেশনের কথা স্বীকার করলেও পেটে গজ রাখার বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার বাসায় বিশ্রামে আছেন। পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন রেখে দেন। ফেনী বিএমএর সভাপতি সাহেদুল ইসলাম কাউছার বলেন, ঘটনাটি যদি সত্যি হয় তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অমানবিক। এ বিষয়টি উচ্চ মহলে জানানো হবে। ফেনীর সিভিল সার্জন হাসান শাহ্?রিয়ার কবির রোগীর পেটে গজ থাকার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে জানান, পেটে গজ থাকলেও পায়ুপথ দিয়ে এটি বের হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই, এটি যদি হয় তাহলে ডাক্তারি শাস্ত্র ভুল।
ফেনী হাসপাতালের ডাক্তার হারুন জানান, তারা মেশিন দিয়ে পায়ুপথ পরীক্ষা করে কিছু পাননি। রোগীর কথা অনুযায়ী কিছু রয়েছে মনে করে সিটি স্ক্যান করানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে তার পেটে কিছু একটা থাকার কথা তিনি স্বীকার করেন। পায়ুপথে গজ বের হওয়ার ছবি তুলেছেন রোকসানার বাড়ির মালিকের মেয়ে তাহমিনা আক্তার। ফেনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোকসানা জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ডাক্তার ইনজেকশন দেন।
এ জঘন্য কাজের জন্য ডাক্তারকে ভর্ৎসনা করেন এবং ডাক্তার মিলির বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে মামলা করার পরামর্শ দেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক ডাক্তার আলাউদ্দিন মজুমদার।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত