• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী    |    
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বিএনপির কাঁটা ভূঁইয়া পরিষদ আওয়ামী লীগে প্রার্থী জট
জাতীয় পার্টিতে মনোনয়ন দৌড়ে অ্যাডভোকেট রেজাউল ও আলমগীর কবীর

শিবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত নরসিংদী-৩ আসনটি মূলত বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার এলাকা। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংস্কারবাদীর তকমা পরার আগ পর্যন্ত আসনটি তারই কব্জায় ছিল। নব্বইয়ের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এর পর ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে মান্নান ভূঁইয়া বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে ছিটকে পড়ার পরও মান্নান ভূঁইয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরে যান। বিএনপি থেকে তখন মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল মান্নান ভূঁইয়ার কাছ থেকে রাজনীতির পাঠ শেখা তোফাজ্জল হোসেন মাস্টারকে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জহিরুল হক মোহনের কাছে হেরে যান তোফাজ্জল মাস্টার। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় জহিরুল হক মোহনকে। আগামী নির্বাচনেও তিনি এ আসনের শক্তিশালী প্রার্থী। কিন্তু কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘হাঁস’ মার্কায় লড়ে নৌকাকে হারিয়ে বিজয়ী হন। সূত্র বলছে, ২০০৮ সালে ‘হাঁস’ মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেন মান্নান ভূঁইয়া। ২০১৪ সালে মোল্লা সেই ‘হাঁস’ মার্কা নিয়ে মাঠে নামেন। স্থানীয়দের বক্তব্য হচ্ছে- প্রয়াত মান্নান ভূঁইয়ার সমর্থক গোষ্ঠী ও তার অনুসারীদের ‘সিমপ্যাথি’ ভোট গিয়ে পড়ে ‘হাঁস’ মার্কায়। এতে তার জয়লাভ সহজ হয়। পরে ১১ জন স্বতন্ত্র এমপির সঙ্গে মোল্লাও আওয়ামী লীগের এমপির স্বীকৃতি পান। আগামী নির্বাচনেও তিনি শাসক দল আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করতে আগ্রহী। এরই মধ্যে নির্বাচনী আবহ বিরাজ করতে শুরু করেছে এলাকায়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগে প্রার্থী জট লেগেছে। মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগে একাধিক প্রার্থী মাঠে। এদিকে শিবপুরে মান্নান ভূঁইয়ার শক্তিশালী একটি সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। মান্নান ভূঁইয়া পরিষদই এখন বিএনপির পথের কাঁটা। বিএনপি থেকে মনোনয়নের তালিকায় মান্নান ভূঁইয়ার ছেলে নাহিয়ান সজল নির্বাচন করতে পারেন বলে বলাবলি হচ্ছে।

মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। প্রার্থী নিয়ে রীতিমতো জট লেগেছে। শিবপুরে নৌকার মাঝির তালিকায় আরও রয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মাহাবুবুর রহমান ভূঞা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনুর রশিদ খান ও সাবেক এমপি জহিরুল হক মোহনের ফুফাতো ভাই এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম রাখিল।

স্বতন্ত্রের তকমা মুছলেও এবার সিরাজুলকে নৌকায় চড়তে দিতে নারাজ শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। জানতে চাইলে সামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, গত নির্বাচনে মোল্লা বিজয়ী হলেও তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন। মোল্লাকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়েই মূলত তিনি ব্যস্ত থাকেন। তিনি শিবপুরের জনগণের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি জহিরুল হক মোহনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত আছে।

কথা হয় সাবেক এমপি জহিরুল হক মোহনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মোল্লা হচ্ছেন স্বতন্ত্র এমপি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে কালো টাকা দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের প্রলুব্ধ করে বিজয়ী হন তিনি। তার কাছে নৌকা নিরাপদ নয়। তাই গত নির্বাচনে নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এবারও জননেত্রী আমাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে আমি আশাবাদী।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে এমপি মোল্লা বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কমিটির সবাই আমার পক্ষে আছেন। আমি দলের সবাইকে নিয়ে কাজ করেছি।

গত নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ভোটে পাস করার অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে সব দলের লোকই ভোট দেয় এটা দোষের? গত নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত অংশগ্রহণ করেনি। তারা কেন্দ্রে গিয়ে ভোটও দেয়নি। তাহলে কীভাবে বিএনপি ও জামায়াত আমাকে ভোট দিল। তিনি বলেন, চারজন এক হয়ে আমার বিরোধিতা করছে। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহনের পরাজিত হওয়ার মূল কারণ ছিল তার ফুফাতো ভাই রাখিল। তারা দুজন নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে টিআর ও কাবিখা নিজেরাই ভাগাভাগি করে ফেলেছে। তাই ২০১৪ সালে জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে মোহনের কাছ থেকে মুক্তি নিয়েছে।

প্রবীণ নেতা মাহাবুবুর রহমান ভূঞা বলেন, শিবপুর আওয়ামী লীগের জন্য আমি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি; দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমি মান্নান ভূঁইয়ার মতো প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করেছি। তখন তারা ক্ষমতায় ছিল, ভোটের ফলাফল জোর করে আটকে রেখেছিল। তাদের ষড়যন্ত্রের কাছে আমি হেরেছিলাম, ভোটের কাছে নয়। টানা ১৬ বছর শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আশা করি, এবার শেখ হাসিনা আমাকে মূল্যায়ন করে মনোনয়ন দেবেন।

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে শিবপুর উপজেলা বিএনপি দল গোছানোর চেষ্টা করছে। দলের মনোনয়ন পাওয়ার আশায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন বেশ কয়েকজন নবীন ও প্রবীণ নেতা। তারা হলেন- কেন্দ্রীয় বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান।

আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে বিএনপি। বর্তমান বিএনপির সঙ্গে ২০০৮ সালে গঠিত মান্নান ভূঁইয়া পরিষদের বিরোধ কাটেনি। আগামী নির্বাচনে মান্নান ভূঁইয়া পরিষদ থেকে কোনো প্রার্থী দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও মান্নান ভূঁইয়া পরিষদের সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম মৃধা বলেন, সময়মতো জনগণের চাহিদামতোই প্রার্থী দেবে পরিষদ। পরিষদের প্রতীক থাকবে হাঁস। তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে মিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তবে বিএনপি থেকে প্রয়াত মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হলে তার ছেলে ভূঁইয়া নন্দিত নাহিয়ান সজল নির্বাচন করতে পারেন বলে আভাস মিলেছে। সজল নির্বাচনে এলে পাল্টে যেতে পারে বিএনপির হিসাব-নিকাশ।

দলীয় মনোনয়ন সম্পর্কে অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমি মনোনয়ন পেলে দলের ভেতরে যে সমস্যাগুলো আছে তা কেটে যাবে। মান্নান ভূঁইয়া পরিষদ যারা করে, তারা বিএনপিরই ভোটার। আমি আশাবাদী, ভবিষ্যতে তারা ধানের শীষে ভোট দেবে। তা ছাড়া জেলা বিএনপির নতুন কমিটি হলে দলের স্থবিরতাও কেটে যাবে, দল আবার চাঙ্গা হবে। আমি সপ্তাহে দু’দিন এলাকায় ভোটারদের সময় দিচ্ছি। নেতাকর্মীদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।

এ ব্যাপারে তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার বলেন, আমি দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। আগামী নির্বাচনে আমি মনোনয়ন পাব বলে বিশ্বাস করি। মান্নান ভূঁইয়া পরিষদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মান্নান ভূঁইয়া পরিষদে আগে যেসব নেতাকর্মী ছিল তারা সবাই আবার বিএনপিতে যোগ দিয়েছে। আগামী নির্বাচনে মান্নান ভূঁইয়া পরিষদ কোনো বিষয় নয়।

জেলা জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম বাসেদ বলেন, উপজেলা পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ার কারণে সব শিক্ষা, ধর্মীয় ও সুধী সমাবেশে আমার বিচরণ। শিবপুরবাসীর মধ্যে জাতীয় পার্টিকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছি। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এলাকার মানুষ জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা জাপার সহ-সভাপতি আলমগীর কবীর বলেন, শিবপুরের মাটি লাঙ্গলের ঘাঁটি। এই এলাকায় জাতীয় পার্টির শাসনামলে ব্যাপক উন্নয়ন হযেছে। তাই কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা শিবপুরে লাঙ্গল প্রতীক প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে রযেছে। আর আমি তাদের সন্তান হিসেবে আমাকেই তারা আগামী সংসদ নির্বাচনে এমপি হিসেবে চায়। আমি নির্বাচিত হলে কৃষক ও মেহনতি মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত