যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে ইউএনও বদলি
একদিনের মাথায় আদেশ বাতিল
শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিরাপত্তা উইংয়ের এডিসি পরিচয়ে ফোন করে চট্টগ্রামের নবসৃষ্ট কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা বিজন ব্যানার্জিকে বদলি করার এক মহাপ্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। তবে বদলির একদিনের মাথায় প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই কর্মকর্তার বদলি আদেশ বাতিল করে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করেছে। প্রতারণার বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও হতবাক ও বিস্মিত করেছে।
কর্ণফুলী উপজেলার ৩ নম্বর শিকলবাহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে হামলা করে বিজয় দিবস উদযাপনের একটি অনুষ্ঠান পণ্ড করা হয়। এ ঘটনায় ওই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মচারী বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলা দায়েরের পর জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজন ব্যানার্জি স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ায় মাঠপ্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের একান্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাশ বুধবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উইংয়ের এডিসি পরিচয় দিয়ে ২৪ ডিসেম্বর এক প্রতারক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চাইছেন যাতে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজন ব্যানার্জিকে বদলি করা হয়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা ওই মোবাইলে ফোন করে কথা বললে ওই ব্যক্তি একই পরিচয় দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ওই দিনই বিজন ব্যানার্জিকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব দেওয়ান মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত এ বদলি আদেশ এসে পৌঁছার পর প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অপরাধীর শাস্তি হওয়ার পরিবর্তে অপারাধীর বিরুদ্ধে যিনি আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন, তার বদলি আদেশে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় চরম অসন্তোষ। তাছাড়া বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে হামলাকারী ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ও তার লোকজনও এলাকায় ছড়িয়ে দেন যে, ‘চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করায় চেয়ারম্যানই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করিয়েছেন। এটা চেয়ারম্যানেরই কেরামতি!’ এ বদলি আদেশকে পুঁজি করে একটি কুচক্রী মহল ভূমি প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে। তার নির্দেশেই এ অন্যায় বদলি হয়েছে বলেও প্রশাসনে ভুল বার্তা পৌঁছায়। দলের অভ্যন্তরেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এদিকে হঠাৎ করে ইউএনও বদলির আদেশ আসার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ নিজেও বিস্মিত হন। তার অজান্তে তার সংসদীয় এলাকার একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কোনো কারণ ছাড়াই বদলি হওয়ার ঘটনা তাকে হতবাক করে। এ বদলি আদেশের নেপথ্যে কী, এটা স্বাভাবিক বদলি না অন্য কিছু- তা খোঁজ নেয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
ভূমি প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাশ জানান, বদলি আদেশের নেপথ্যের খবর জানতে গিয়েই প্রতারণার বিষয়টি উদ্ঘাটিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উইংয়ের কোনো কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার কাছে কর্ণফুলী উপজেলার ইউএনও বদলির জন্য ফোন করেননি, যে ফোন নম্বরটি থেকে ফোন করা হয়েছিল, সেটি ছিল ভুয়া। অর্থাৎ সোটি প্রধানমন্ত্রীর নিরপত্তা উইংয়ের কোনো এডিসির ফোন নম্বর নয় বলে নিশ্চিত হন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন। এর পরই ২৬ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজন ব্যানার্জির বদলি আদেশ বাতিল করে (স্মারক নম্বর: ৫৬০/২৬.১২.১৭) তাকে স্ব পদে বহাল রাখা হয়। প্রদীপ কুমার দাশ জানান, প্রতারণার আশ্রয় নেয়া সেই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
নবসৃষ্ট কর্ণফুলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বিজন ব্যানার্জি যোগ দেন চলতি বছরের ১৩ আগস্ট। যোগ দেয়ার পাঁচ মাসের মাথায় কোনো কারণ ছাড়াই ২৪ ডিসেম্বর বদলি আদেশ আসায় তিনি নিজেও হতভম্ব হন এবং বিব্রতবোধ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসনের আদেশের বিরুদ্ধে আমার কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য নেই। তবে ১৬ ডিসেম্বর উপজেলার এজে চৌধুরী কলেজ মাঠে বিজয় দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হামলা, অতিথিদের নাজেহাল করা এবং অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়ার ঘটনাটি ছিল ঘৃণ্য। একজন জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে এ ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য ছিল না। জেলা প্রশাসককে ওই দিনের ঘটনাটি অবহিত করি। এরপর জেলা প্রশাসনের নির্দেশেই আমার অফিস সহকারী দীপু চাকমা মামলা করেন। যেখানে শিকলবাহা ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।’
সূত্র জানায়, শিকলবাহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম সিএমপির তালিকাভুক্ত একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। কর্ণফুলী ও পটিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখল-বেদখল, অস্ত্র আইনে দুই ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত দেয়া হলেও মাইকে নাম ঘোষণা করা হয়নি, মঞ্চে আসন সংরক্ষণ করা হয়নি- এসব অভিযোগে উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী, ইউএনও বিজন ব্যানার্জি, অনুষ্ঠানের ঘোষক এক স্কুল শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের নাজেহাল করে। দলবল নিয়ে ভাংচুর করে বিজয় মঞ্চ।
বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে হামলার তদন্ত শুরু : কর্নফুলীতে বিজয় দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হামলা ও সরকারি লোকজনকে মারধরের ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত দলের প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) হাবিবুর রহমান কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের অস্থায়ী সম্মেলন কক্ষে ওই দিনের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। অনেকেই ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে ওই ঘটনার জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেন। এরপর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) ও তদন্ত দলের প্রধান হাবিবুর রহমান যুগান্তরকে জানান, তদন্তকালে শিক্ষক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন। সাত দিনের মধ্যে তাকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়েই তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত