আবদুল্লাহ ওমর সাইফ    |    
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
সমকালীন কিছু গল্প ও আমাদের ভাষা

আমরা সাহিত্য পড়ি প্রাণ জুড়াতে, চক্ষু শীতলকারী আনন্দ লাভের আশায়। কেবল জ্ঞান বিতরণই যদি তার উদ্দেশ্য হতো তাহলে সেটা অংক স্যারের ক্লাসে বসে ঝিমোনোর মতো কিছু একটা হয়ে দাঁড়াত। শুধু শুধু তথ্যই যদি দিতে হয় সেক্ষেত্রে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতো একটা কিছু লিখলেই হল। সাহিত্য নাম করে একে বদনাম করার দরকারটা কী? মহাভারতের কবি বাল্মীকি দেবের আগেও অনেকে নিশ্চয়ই কৃষ্ণ-বন্দনা করেছেন। সেসবের খোঁজ প্রত্নতাত্ত্বিকরাও দিতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু এই ঋষিকবির নামে যে মহাভারত, তার জৌলুস যুগ যুগান্তর ধরে টিকে আছে কী করে? মহাভারতের অপূর্ব ভাষাশৈলী ও উপমার ব্যবহার, বিশেষ করে ভগবত গীতার প্রতিটি শ্লোকে যে পরিমাণ নান্দনিকতার ছড়াছড়ি, সেটা ছাড়া কী মানুষের মনে গাঁথতো এতসব ধর্মকথা? শুধু ধর্মের মহিমা কীর্তনই কেন, এ যুগে তো বিজ্ঞানও তার জনপ্রিয়তা পেয়েছে সাহিত্যের গুণে। স্পেন্সার জোনস, স্যার জেমস জিনস, কার্ল সাগান, রজার পেনরোজ, স্টিফেন হকিং- এদের লেখায় বিজ্ঞান থাকলেও তাতে নান্দনিকতা ষোলআনা উপস্থিত। রে ব্র্যার্ডবেরি, আইজাক আসিমভদের হাতে পড়ে কল্পবিজ্ঞানের মতো ছেলেদের বিষয়ও আজ সাহিত্যের মূলধারায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাহিত্যকে অবশ্যই নান্দনিক হতে হবে। নইলে সে সাহিত্য টিকবে না।

বাংলাদেশের ইদানীংকার সাহিত্যে ভাষারীতি নিয়ে পরীক্ষণ দশা চলছে বলেই মনে হয়। কারণ যারা লিখছেন তাদের অনেকে এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছেন না যে, বাংলাদেশের ভাষার রূপটি কী হবে? হুইটম্যান ও ফ্রস্ট পরবর্তীকালের আমেরিকান সাহিত্য যেমন ক্রমশ আমেরিকান হয়ে উঠেছে, আমাদের ক্ষেত্রে কিন্তু সেরকমটি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের সুনীল, সমরেশ, শংকর বা আরেকটু আগের বিভূতিভূষণ কিংবা তারাশঙ্করদের ভাষার ছাঁচে আমাদের এই বাংলাদেশের গন্ধ পর্যন্ত অনুপস্থিত। আর সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের গল্প তো আমাদেরকেই আমাদের ভাষায় বলতে হবে। সেক্ষেত্রে পড়শিদের ডাকা কেন?

বর্তমান কথ্য ও লেখ্য ভাষায় আঞ্চলিকতা বেশ ভালোভাবেই মিশে গেছে আর সেটা দিয়ে বাংলাদেশকে পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব হবে কিনা এটা একটা বড় প্রশ্ন। ভাষারীতি এমন হতে হবে যা হবে প্রাসঙ্গিক, যতটা সম্ভব আঞ্চলিকতামুক্ত এবং দেশগন্ধী। এই দেশগন্ধী উপাদানটা জরুরি। আমাদের গ্রাম্য ও নাগরিক জীবনের নিজস্ব গন্ধ আছে। সেটা সাহিত্যে তুলে আনাটা জরুরি। বাংলাদেশী ভাবকল্প, ভাষাশৈলী এবং পূর্ববঙ্গীয় উপমার ব্যবহার আমাদের গল্প বলার রীতিকে সমৃদ্ধ করবে। আবার মোটামুটি নিরপেক্ষ বাংলা ভাষাশৈলীও সম্ভব। যেমন বুদ্ধদেব বসু। তাকে কখনোই তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের ভাষার পুরো অনুসরণ করতে দেখা যায়নি। তার ভাষায় বর্ণনার ঘনঘটা আছে, শব্দের খেলা আছে, যেটা আষাঢ়ের মেঘের মতোই চিত্ত পুলকিত করে। বুদ্ধদেবের ভাষায় উপমা ব্যবহারের ছড়াছড়ি দেখা যায়। আসলে মহাকবি কালিদাসের সময় থেকেই সাহিত্যের মূল রস আস্বাদনে উপমা আচারের মতো কাজ করে আসছে। নতুন করে আধুনিক বাংলায় শকুন্তলা লিখতে বসে সুনীল ভূমিকায় বলেছেন, ‘তাছাড়া আমি ক্ষুদ্র কবি হলেও এই উপমা সম্রাটের রচনার মধ্যেও দু-একটি নিজস্ব উপমা-উৎপ্রেক্ষা যোগ করার লোভ সংবরণ করতে পারিনি।’ উপমা মোটেও সেকেলে ব্যাপার নয়। একে যুগে যুগে নতুন করে ব্যবহারের কায়দা রপ্ত করতে হবে। বুদ্ধদেব বসুর ব্যবহৃত পিন ফোটানো গরম, কিংবা, পাউরুটি রঙের বাড়ি এসব বাংলা ভাষার রত্নস্বরূপ। এসবকে পাশ কাটিয়ে শুধু কার্য পরম্পরার ধারা বিবরণী দিলে সাহিত্য একদম জোলো হয়ে যাবে।

বাংলাদেশে ভাষারীতি তৈরি করতে গিয়ে অনেকে আবার দেখি নান্দনিকতা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে বসেছেন। রূঢ় বাস্তবতাকে সাহিত্যে টেনে আনতে গিয়ে অদ্ভুত সব কথ্য শব্দ ব্যবহার করছেন যা উচ্চারণ করতে রীতিমতো বাধে। টাসকি, পিনিক, উড়াধুরা-এজাতীয় শব্দ বাক্যের ভাব ও অন্তর্নিহিত অর্থকে লঘু করে দিতে যথেষ্ঠ। সাহিত্যে বাস্তবতা অবশ্যই আসবে। তবে নান্দনিকতার মোড়কে আসবে। নইলে সেটা পড়ার অযোগ্য হয়ে যাবে। বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দোপাধ্যায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি রূঢ় বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু নান্দনিকতাবহির্ভূত কিছু তিনি করেননি। মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথার একদম শুরুতে হারু ঘোষ বজ্রাঘাতে মারা যায়। মৃত্যু ও মানব নিয়তি নিয়ে কী অসাধারণ উচ্চারণ : ‘খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন’। এই দুটো বাক্যের মধ্যে হারু ঘোষের বজ্রপাতে মৃত্যু এবং নিয়তির কাছে মানুষ যে খেলার পুতুল সেটা কেমন মিলেমিশে এক অদ্ভুত আলোয় আমাদের চোখে উদ্ভাসিত হয়। অথচ হারু ঘোষ খালের ধারে দাঁড়াইয়া বজ্রপাতে মরিয়া গেলেন, এটা লিখলে জনসাধারণের বুঝতে সুবিধা বেশি হতো। কিন্তু সাহিত্যের সবকিছু একবারে সাধারণ করে বুঝে নিতে গেলে শেষমেশ ঠকে যেতে হয়। সাহিত্যে শব্দের খেলা থাকতে হবে। আটপৌরে জীবনের বর্ণনাও যথাযথ করে দিতে গেলে নানারকম শব্দের ব্যবহার করতে হয়। শব্দের উপযুক্ত ব্যবহার দৃশ্যকল্পকে জীবন্ত করে তোলে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে প্রচুর চমৎকার ছোটগল্প লেখা হয়েছে। শওকত ওসমান, শাহেদ আলী, শওকত আলী, আল মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, রাহাত খান বা সৈয়দ হকদের হাতে এখানকার গল্পরীতিতে আধুনিকায়ন ঘটেছে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে এদের প্রত্যেকের ভাষারীতিই নান্দনিকতা কেন্দ্রিক। এ কারণে এখনও এরা আমাদের নিত্য পাঠসঙ্গী। এদের গল্পের পরিধি ব্যাপক হওয়ায় এদের প্রভাবও মোটামুটি সর্বগ্রাসী ধরনের। পশ্চিমবঙ্গে এখনও হাসান আজিজুল হকের গদ্য পাঠকরা পছন্দ করে। আবার আশি বা নব্বইয়ের দশকে আমাদের নগরকেন্দ্রিকতা বাড়ায় আমরা পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, মইনুল আহসান সাবের কিংবা আন্দালিব রাশদীদের। তারা মধ্যবিত্তের জীবনপ্রবাহ নিয়ে প্রচুর লিখেছেন, অনেকে এখনও লিখছেন। এদিকে আবার নগরকেন্দ্রিকতার পরিধিও আগের মতো নেই। দু’হাজারের পর কেন জানি মনে হয় পৃথিবীতে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত ঘটতে আরম্ভ করেছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশ্বজুড়ে হুট-হাট যুদ্ধ, দেশের মধ্যেই বড় বড় গোলযোগ, রাজনৈতিক টানাপড়েন- সবকিছু মিলিয়ে ভাবের এমন আদান-প্রদান ঘটছে যে সেসব ঠিকমতো বাংলা ভাষায় উঠে আসতে একদম হিমশিম খাচ্ছে। যে পাঠক আগে বাসে ট্রেনে কাজের ফাঁকে একটা পেপারব্যাক নিয়ে বসে যেত, তাকে আজ দেখা যাচ্ছে মোবাইল টেলিফোনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে। এরকম অস্থির সময়ে আমাদের সাহিত্যের পরিসর হুমকির মুখে পড়েনি তা বলি কী করে? তারপরও বলতে হয় এ সময়ের লেখকরা এতসব ঝঞ্ঝাটের মধ্যেও বাংলা ভাষাশৈলীর ভবিষ্যৎ রচনা করে চলেছেন।

আসলে গল্পের প্রতি লোভ আমাদের অনেক দিনের। দূর অতীতে যখন মানুষ লিখতে শেখেনি তখনও কী গল্প ছিল না? গল্প তো ছিলই, এখনও আছে এবং থাকবে। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আরম্ভ করে যখনই মানুষ অবসর পেয়েছে তখনই গল্পের ঝাঁপি নিয়ে বসেছে। কিন্তু গল্প সবাই করতে জানত না। গল্পকথক সবাই হতে পারে না। যারা পারত তাদের চারিধারে লোক জড়ো হয়ে বসে শুনত। হয়তো কাছেই কোথাও নদীর তীর থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, দূরে শেয়াল তক্ষকের ডাক শোনা যাচ্ছে। এর মাঝে প্রদীপের আলোয় গল্প কথক তার জাদুকরী ভাষায় গল্প বলে যাচ্ছে। এ চিত্র মানুষের খুব চেনা। আধুনিককালে যখন ছোটগল্পের প্রবর্তন হল, মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারল এই গল্পের ভাষা অবশ্যই এমন হতে হবে যেন গল্প কথকের সামনে চাদর মুড়ে বসে গল্প শোনার আনন্দ পাওয়া যায়। ল্যাটিন আমেরিকার লেখকদের মধ্যে এই ধারাটি গুরুত্ব পায়।

আমাদের বাংলায় প্রাচীনকাল থেকেই বেশির ভাগ গল্পের ঐতিহ্য কথ্যরীতিনির্ভর। সমসাময়িক প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মধ্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্পে অনেকে এই ধারাটির স্বাদ পেতে পারেন। আধুনিক সাহিত্যের নানা উপাদান মোটামুটি নিরীক্ষণ ছাড়াই তিনি প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেন। তার ‘ডিডেলাসের ঘুড়ি’ কিংবা ‘জলপুরুষের প্রার্থনা’ পাঠকপ্রীতি পেয়েছে। তার গল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে মিথের ব্যবহার ও তার নির্মাণ। এ কাজটাও ল্যাটিন আমেরিকান লেখকরা ভালো করতে জানেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের অনেক গল্পে দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে সমকালীন বাস্তবতাকে যেমন প্রকাশ করা হয়, তেমনি সেখানে চিরন্তন কিছুর খোঁজও পাওয়া যায়। ‘শালবনে জ্যোস্না’ গল্পের আওলাদ, যে কী না হরতাল অবরোধের সময় বোমা বহন করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা যায়, সে নিজে অকিঞ্চিৎকর হতে পারে কিন্তু তার মায়ের সেই দৃশকল্প, সেটা কী চিরন্তন নয়? চাঁদের আলোয় যখন শালবন জ্বলছিল তখন পাঠকদের মনেও একটা চিরন্তন জিজ্ঞাসা জ্বলে ওঠে। এই জিজ্ঞাসাই একটি আধুনিক সার্থক ছোটগল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পরিণত চিন্তন গল্পগুলোকে অন্য মাত্রা দান করে। দেশীয় সাহিত্যে এ বস্তুটি বিরল। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্পের ভাষা আমাদের চিরায়ত কথ্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

মঞ্জু সরকার বহুদিন ধরেই লিখে চলেছেন। তার লেখা আমাদের সাহিত্য মহলে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়। আমার মনে হয় এর পেছনের অন্যতম কারণ হতে পারে লেখকের ভাষার সৌকর্য। তার গল্পে ভাষার ব্যবহার সংযত ও যথাসম্ভব হৃদয়গ্রাহী। বিশেষ করে তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্পগুলো বাংলাদেশী সাহিত্যরীতির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তার উপলব্ধির গভীরতা আমাদের বিস্মিত করে। গল্পগুলোর ভেতরে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক ‘বই থেকে পাওয়া’ নয়, এটা সম্পূর্ণরূপে মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখার ফল। তিনি তার এক বইয়ের সূচনায় লিখেছেন তিনি নিজেকে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফসল। কথাটা লেখকের ক্ষেত্রে খাটে। তবে তার এই চেতনাটি পক্ষপাতদুষ্ট নয়। এ কারণেই তার গল্পের বর্ণনা মেকি লাগে না। সত্য উচ্চারণ বলে মনে হয়। তার ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে তার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তির কারণে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক।

‘পেছনে ছিল হানাদার পাকবাহিনী। ডানে-বামে বেধর্মী রাজাকার। ফলে অবরুদ্ধ স্বদেশে মুক্তির পিপাসা ওদের যতটুকু ছিল, মৃত্যুভীতি টান টান হয়ে উঠেছিল তারো চেয়ে বেশি। আগুনে সর্বস্ব পুড়ে ছাই হওয়া কিংবা রক্তাক্ত ধড় থেকে প্রাণ উড়ে যাওয়ার ভয়ংকর দৃশ্য দেখার মত বিন্দুমাত্র সাহস ছিল না মনে। ফলে আজন্মের পরিচিত বাড়িভিটা ছেড়ে ভারতের অনিশ্চিত পরবাসে, আশি লক্ষ শরণার্থীর ভিড়ে যোগ দেয়ার জন্যে রতনপুর গাঁয়ের আরো ছয়টি হিন্দু পরিবার রাতের অন্ধকারে যাত্রা শুরু করেছিল একদিন’। (গল্প : শরণার্থী ও বেহাল নৌকা)।

‘অপারেশন জয় বাংলা’ গল্পটিতে আছে একটি লঞ্চ আর দু’দল মানুষ। যুদ্ধ কেবল শেষ হয়েছে। লঞ্চের যাত্রীদের মধ্যে একদল বাঙালি, এক দল বিহারি। আবার এদের ভেতরেই আছে মুক্তিযোদ্ধা নামধারী কিছু লোক। এরা কী সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা, নাকি সুবিধাবাদীর দল?

লঞ্চে নিরস্ত্র অবাঙালিদের ওপর নির্দয়ভাবে এরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় ঠিক যেমনটি করেছিল পাকিস্তানিরা সেই একাত্তরের মার্চে। যদি এতসব লোকের আড়ালে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা লুকিয়েও থাকে, তারা এখন কী করবে?

গল্পটি আকর্ষণীয়, ছাঁচে ঢালা নয়। বর্ণনায় অতিরঞ্জন নেই। এখানে উন্মাদনার আগুনে দগ্ধপ্রায় নৈতিকতাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করা হবে এটাই প্রশ্ন। মঞ্জু সরকারের ভাষায় আবেগের সংযত ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করে।

শাহনাজ মুন্নীর ছোটগল্পের শুরুটা খুব ভালো। এক কাপ চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ে চুমুক দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কথাটা প্রথম মাথায় আসে সেটা হচ্ছে আরেকটি চুমুক না দিলেই নয়। শাহনাজ মুন্নীর গল্পের শুরু অনেকটা সেরকম। গল্পের ব্যাপারে এক ধরনের আসক্তি চলে আসে। তার ওপর ভাষার সাবলীলতা পাঠকের মনে এক ধরনের আরামদায়ক অনুভূতির জন্ম দেয়। ক্যামেরার চোখের মতো গল্পের ধারা বর্ণনা করার এই প্রক্রিয়াটিতে নতুনত্ব আছে। তার ‘বহুবার বলা গল্প’ থেকে একটা উদাহরণ দেয়া যাক।

‘একটা ঠাণ্ডা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে মাটির গর্তে ততোধিক স্যাঁতস্যাঁতে ঠাণ্ডা ভয় নিয়ে মাথা নিচু করে উবু হয়ে বসে আছি। বসে আছি মানে আরো কয়েকজনের সাথে আমাকেও বসিয়ে রাখা হয়েছে। যেটাকে মাটির গর্ত বলছি আসলে সেটা মাটি খুঁড়ে তৈরি করা একটা বাংকার। অনেকটা কবরের মতো থমথমে অন্ধকার বাংকারের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে শুনতে পাচ্ছি দূরে কোথায় যেন থেমে থেমে গুলির আওয়াজ হচ্ছে।’

চাপা আতংকের ছাপ উপরের বাক্যগুলোতে রক্তের দাগের মতো লেগে আছে যেন। বর্ণনার ভঙ্গি সুন্দর। হুট করে একগাদা তথ্য দিয়ে মাথা ভার করে দেয়ার কৌশল নেই। একে একে পাঠকের সামনে দৃশ্য উন্মোচিত হচ্ছে। শাহনাজ এখানে নতুন কিংবা একটু অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করেননি, ভাষার কারুকাজও তেমন নেই। বলতে গেলে আটপৌরে শব্দের মালাই গাঁথা হয়েছে। কিন্তু তবু কোথা থেকে যেন পাঠক আতংকের অনুভূতিটা টের পাচ্ছেন। এখানে ভাষা দামি দামি অলংকার পরে বসে নেই। কিন্তু এতে বাক্যের সার্থকতা তেমন কমেনি। শাহনাজ মুন্নী সূক্ষ্ম সুঁচ দিয়ে গল্পের জাল বুনতে পারেন। প্লটের অভিনবত্ব তার সাহিত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান। ‘ব্র্যান্ডি ও বাদুর’-এর একটি চমৎকার উদাহরণ।

মাসউদুল হকের গদ্যধর্মী নামের গল্প ‘সন্তানেরা কাবাব খায়, পিতারা গন্ধ শুঁকে’ বেশ সার্থক মনে হয়েছে। মাসউদুল হকের সেন্টিমেন্টাল ইস্যুতে কাজ ভালো। নিম্ন আয়ের পিতার পরিবারকে লুকিয়ে একবার কাবাব খাওয়ার ঘটনা পুত্রের জীবনে কী রকম প্রভাব ফেলেছিল সেটা বেশ ভালো স্টোরিটেলিং-এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। মাসউদুল হকের অন্য গল্পেও একই ধরনের ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। তার প্রতিটি গল্পের প্রধান চরিত্র কিছুটা অনির্দিষ্ট ভঙ্গিতে চিন্তা করতে শুরু করে যেটা এক সময়ে পাহাড়ি খাদের মতোই গভীর হতে শুরু করে। গল্পের প্লট এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য পিতা ও পুত্রের মনস্তত্ত্ব। আর পাঠকরা সেই মনস্তত্ত্বের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে এক রকম মিলিয়ে দেখতে শুরু করে। আমার মতে মাসউদুল হকের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে তার গল্পের প্রাসঙ্গিকতা, যেখানে পাঠক নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আবিষ্কারে গল্পের শেষ পর্যন্ত পড়ে যায়।

মানুষের জীবনের চিরন্তন সত্যকে ধারণ করতে গেলে চিরায়ত সাহিত্য তথা ক্ল্যাসিক সাহিত্যের ভাষার যোগাযোগ থাকাটা জরুরি। মনে রাখতে হবে বাংলায় যত শব্দ বা উপমা আছে তার সবটা মিলেই কিন্তু বাংলা ভাষা। চিরায়ত সাহিত্য বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। শব্দ একদিনে তৈরি হয় না। শব্দ তৈরি হতে গেলে একটা জাতির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, কালচার সবকিছুর পরিমাণমতো মিশ্রণ চাই। সাহিত্যিকদের কাজ এ জন্য শব্দ নির্ভর। এসব শব্দ ভাষার অলংকার। এদের ছাড়া সাহিত্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা মুশকিল। এখনকার অনেক লেখক মনে করেন একটু অপরিচিত শব্দ ব্যবহার করলে আজকের পাঠক বুঝবে না। শুধু বোধগম্যতার দোহাই দেয়াটা এক্ষেত্রে অনুচিত। মানুষের মনে অনেক রকম দ্যোতনা হয়, অনেক ভাবের সঞ্চার হয়। সব ভাবের জন্যে একই শব্দ ব্যবহার করা যায় না।

একটি সমাজের সামগ্রিক কালচার ওই সমাজের মানুষের ভাষার নানা শব্দ তৈরিতে মোক্ষম ভূমিকা পালন করে। আমাদের বঙ্গে একটা যুগ ছিল যখন বাঙালি মুসলমান, হিন্দু সবাই ফার্সি কিংবা আরবির ব্যাপারে কিছু না কিছু জানত। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজে প্রচুর শব্দ ব্যবহার করা হতো যার উৎপত্তি আরবি কিংবা ফার্সি। এ কারণে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে যখন নজরুল বা ফররুখরা তাদের লেখায় প্রচুর আরবি ফার্সি শব্দের ফোয়ারা ছোটালেন, কেউ কিন্তু তখন শব্দগুলো নিয়ে তেমন অসুবিধেয় পড়েনি। কারণ ওই সময়কার পাঠক ওসব শব্দে অভ্যস্ত ছিলেন ষোলআনা। কিন্তু এই প্রজন্মে এসে সেসবের অনেক শব্দই আমাদের কাছে অজানা ঠেকবে। এর কারণ সময় পাল্টিয়েছে। বাংলাদেশে এখন বাংলাই প্রধান ভাষা। ভারতীয় সিনেমার প্রভাবে হিন্দির আমদানি ঘটলেও হিন্দি এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় অপাঙ্ক্তেয়। আমাদের এখনকার বাংলা ভাষায় তাই বাংলাদেশের শব্দ থাকতে হবে। অন্য দেশের শব্দের জোর ক্রমশ কমিয়ে আনতে হবে। তবে এক্ষেত্রে জোরাজুরির কিছু নেই। যেখানে প্রতিশব্দ নেই সেখানে হিব্রও মেনে নিতে আমরা প্রস্তুত। কিন্তু বাংলায় উৎকৃষ্ট প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও সমকালীন অনেকে অনর্থক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে ভালোবাসেন। আমাদের বাঙালি হৃদয়ে এসব শব্দ ছুরির মতো বিঁধে।

সাইফুর রহমানের গল্পে ক্ল্যাসিকতা আর আধুনিকতার একটা মেলবন্ধন করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তিনি সম্ভবত দুই বাংলার জন্যই গ্রহণযোগ্য একটি ভাষারীতি তৈরির চেষ্টা করছেন। ইদানীংকার সাহিত্যে অনেকে যেখানে শুধু কথ্যরীতির ওপর ভর করে চলেছেন সেখানে এই লেখকের দুই বাংলা নিরপেক্ষ ভাষারীতি তৈরির প্রয়াস কৌতূহলকর। সাইফুর রহমানের গল্প ‘পক্ষিরাজের ডানা’র প্রেক্ষাপট পাবনা জেলার এক গ্রাম। গল্পের প্রধান চরিত্র জানে আলম কল্পনাবিলাসী ছেলে। কল্পনাবিলাসী বলেই তার চোখে জগৎ অন্যরকম। সে ঘোড়ার ভিটেতে শুয়ে সত্যি সত্যি অলৌকিক ঘোড়া দেখতে পায়। সেই ঘোড়া আবার কথা বলে। এখন গল্পজুড়ে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে আলম কী সত্যি বলছে, না মিথ্যা। এই রকমের একটা প্রশ্নে গল্প এগিয়ে যায়। এ ধরনের গল্পের ন্যারেশানে গতি সঞ্চার করতে গেলে আলমের স্বভাবের বিপরীত কোনো চরিত্রের অবতারণা করতে হয়। লেখক এখানে তাই করেছেন। আলমের একদম উল্টো চরিত্রের মানুষ তারই স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব। এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের একটা দ্বন্দ্ব আছে। ব্যাপারটা উপভোগ্য। সাইফুর রহমানের ভাষা উন্নত তবে ন্যারেশনে উন্নতির জায়গা এখনও আছে। মনে রাখতে হবে, ভাষার পাশাপাশি একজন লেখককে গল্প বলার ভঙ্গিতেও সমান দক্ষ হতে হয়। তবে সাইফুর রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তিনি এমন এক সময়ে বাংলা গদ্যে নিওক্লাসিসিজম (নব্যধ্রুপদী) আনতে যাচ্ছেন যখন বেশির ভাগ তরুণ প্রজন্মই সাহিত্যেরস নিতে অনিচ্ছুক। এখনকার বহু তরুণের মধ্যে সবকিছুতেই ‘ফান’ নেয়ার যে প্রবণতা সেটা সাহিত্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। সহজ-সরল ভাষায় গদ্য লেখার নাম করে চলে আসছে রস বর্জিত ঘটনা পরম্পরার বিবরণ (যেটা অবশ্যই ব্যাড লিটারেচার) আর শুধু হাস্যরসের চেষ্টা। অথচ লোক হাসানো আর ভয় দেখানো সাহিত্যে অতি শক্ত কাজ হিসেবে বিবেচিত।

সাইফুর রহমানের ’একশ ছিদ্রযুক্ত জামা’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প। গল্পের খুঁটিনাটি বর্ণনা তথ্যভিত্তিক হওয়ায় জ্ঞান লাভের আনন্দ পাওয়া যায়। তবে এখানে আকর্ষণের জায়গা হচ্ছে গল্পের মূল চরিত্র রেজেকের আধ্যাত্মিক শক্তির অন্বেষণ আর মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি অবস্থান। সাইফুর রহমানের গল্পের ভাষার আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে তার শব্দচয়ন। চমৎকার অর্থবাহী শব্দের সমাহারে বাক্য তৈরি তার লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। লেখকের পড়াশোনা লেখায় ছাপ ফেলে। আমরা সাহিত্য যেমন পড়ি আনন্দের জন্য, তেমনি কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জানার জন্যেও। এক্ষেত্রে গল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য দেয়ার বিকল্প নেই।

মাহবুব মোর্শেদের গল্প ‘পোস্টমাস্টার রিভিজিটেড’। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের নবরূপায়ণ। এখানে রতন আছে। তবে এবারের রতন ঢাকা শহরে কাজের মেয়ে হিসেবে একটি বাসায় আসে। এখানে এসে ঋভু নামের এক শিশুর সঙ্গে তার মাতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যদিও ঋভুর নিজের মা আছে এবং সেই ভদ্রমহিলা রতনের প্রতিও বেশ স্নেহশীলা। এই গল্পের সময় বা প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও রতনকে এখানে আগের গল্পের পোস্টমাস্টারবাবুর মতোই একটা দ্বিধায় পড়তে হয়। সে কী আদৌ এই ঋভুকে ছেড়ে যেতে পারবে? গল্পটায় রাবীন্দ্রিক প্রভাব স্পষ্ট। সেটাই অনুমেয়। তবে এতে করে গল্পের আদলে কোনো সমস্যা অনুভূত হয়নি। লেখাটির কয়েকটি স্থানে কাব্যশ্রয়ী বর্ণনা থাকায় লেখাটির সাহিত্যিক মান বেড়ে গেছে। আসলে বাস্তবতাকে সাহিত্যে নান্দনিকভাবে বর্ণনা করলে বাস্তবতার প্রকোপ কম হয়ে যায় না, বরং বৃদ্ধি পায়। গল্পটি উৎকৃষ্ট। মাহবুব মোর্শেদের জগত দেখার চশমাটি আমাদের কৌতূহলী করে তোলে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত