আহমেদ বাসার    |    
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
শামসুর রাহমানের কবিতা
ব্যক্তির আর্তি ও সমষ্টির আর্তনাদ

বাংলাদেশের এক অবিনশ্বর মানচিত্র বুকে এঁকে যে কবি দাঁড়িয়েছেন সব বাধা-বিপত্তি আর প্রতিকূলতার মুখোমুখি তিনি শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার কবি, মুক্তিযুদ্ধের কবি। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাকে তিনি রূপ দিয়েছেন কবিতার অনিন্দ্য পঙ্ক্তিমালায়। তার কবিতায় তাই কখনও ঝলসে ওঠে ‘জলপাই রঙের ট্যাংক’ কখনও ‘সৈনিক ধর্ষিতা তরুণীর’ আর্তচিৎকার কখনও বা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামী চেতনার অভিব্যক্তি। ফলে তার কবিতা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের জ্বলজ্বলে অভিজ্ঞতাখচিত অনন্য দলিল। সামষ্টিক জীবনের সমূহ উত্তাপ শামসুর রাহমানকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে একথা সত্য; কিন্তু তার বিশাল কাব্য-ভূখণ্ডে ব্যক্তি চেতনার প্রক্ষেপ ব্যাপক ও গভীর। শামসুর রাহমান এমন একজন কবি, যিনি সামষ্টিক চেতনাকেও ব্যক্তিক চেতনার আলোকে পর্যবেক্ষণে উৎসাহী। ফলে তার কবিতায় ব্যক্তিতার ছাপ প্রবল। ব্যক্তির চোখ দিয়েই শামসুর রাহমান দেখেন সমাজ, জনপদ, রাষ্ট্র কিংবা নাগরিক জীবনের কোলাহল। ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গির অভিনবত্বে কোনো বিশেষ ঘটনা কিংবা দৃশ্য ভিন্নমাত্রিক ব্যঞ্জনা লাভ করে। সামাজিক কোনো আলোড়ন যে রূপ কিংবা ভাবমূর্তিতে সাধারণের কাছে প্রতীয়মান হয়, শামসুর রাহমান অন্য এক প্রেক্ষণবিন্দু থেকে তা পর্যবেক্ষণ করে তাকে ভাষিক অবয়ব দান করেন। ঘটনার ফলাফল একই থাকলেও তার গতিবিধি ও ভাবগত রূপান্তর ঘটে যায় তার কবিতায়; যা একদিকে যেমন কাব্যিক উৎকর্ষমণ্ডিত হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তেমনি সংগ্রামী প্রেরণায় পাঠককে উজ্জীবিত করে তোলে। আমাদের জাতীয় জীবনের উত্তাল রাজনৈতিক ঘটনাবলিকেও তিনি ব্যক্তিচেতনার আলোকে মূল্যায়ন করেছেন। বাংলাভাষা ও বাংলা বর্ণমালাকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মম ষড়যন্ত্রকে কবি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি এর মধ্যে দেখেছেন ‘খেংরার নোঙরামি’। ফলে বাংলা বর্ণমালা তার কাছে হয়ে ওঠে ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’। লাল কৃষ্ণচূড়া রক্তলাল সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয় তার কবিতায়। আমাদের চেতনার রঙ কৃষ্ণচূড়ার রঙ আর সংগ্রামের চেতনাকে তিনি সমান্তরালে স্থাপন করেছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কবির ব্যক্তিক অনুভবকে নাড়া দিয়েছিল। এ আন্দোলনে নিহত ছাত্রনেতা আসাদ কবির বোধে সংগ্রামী চেতনার প্রতীকী চরিত্রে পরিণত হয়। আসাদের রক্তভেজা শার্ট জাতির ‘প্রাণের পতাকা’ হয়ে ওঠে তার কবিতায়। অর্থাৎ ব্যক্তি আসাদ আর একজন ব্যক্তি থাকে না, হয়ে ওঠে জাতির প্রাণশক্তির পরিচায়ক। বাংলাদেশের গৌরবময় স্বাধীনতার সংগ্রামও কবির ব্যক্তিক অনুভবের দ্যোতনায় ভিন্নমাত্রা লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ঠিক তন্ময় দৃষ্টিতে না দেখে মন্ময় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিবৃত্ত নয় বরং কবির ব্যক্তিক অনুভব উৎসারিত অন্য এক যুদ্ধের আবহ তার কবিতায় মুদ্রিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কবিকেও এক মনোবৃত্তিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। কবি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণে অপারগ ছিলেন, তাই বিবেকের তাড়না ছিল তার নিত্যসঙ্গী। আবার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম অত্যাচার নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করে তিনি ক্ষুব্ধ ও ভীতশ্রদ্ধ। ফলে নিজের ভেতরে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় এক বিদ্রোহী সত্তার উপস্থিতি তিনি অনুভব করেন। নিজের প্রতি ঘৃণা ও করুণার বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে কিছু কিছু কবিতায়। ‘পথের কুকুর’ নামক কবিতায় পথের কুকুরকে পাকিস্তানি সেনাদের দিকে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে যেতে দেখে কবি নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন। পথের কুকুরের চেয়েও নিজেকে তার অধম ও অথর্ব মনে হয়েছে। এই আত্মদহনই কবিকে মহত্ত্বর করে তুলেছে নিঃসন্দেহে। কবি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেননি; কিন্তু তিনি মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন। তার কাছে ‘স্বাধীনতাই ছিল একমাত্র আকাঙ্ক্ষার ধন। সমগ্র জাতির মুক্তির অভিলাষ কবির হাতে এক নতুন ভাষাভঙ্গিতে বাক্সময় হয়ে উঠেছে। শ্রেণীভেদ, বর্ণভেদ কিংবা জাতিভেদের কথা ভুলে গিয়ে সমগ্র বাঙালি সেদিন স্বাধীনতার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠেছিল। কৃষক, শ্রমিক, মজুর, ছাত্র-শিক্ষক কিংবা সাধারণ গৃহিণী সবার কাছেই তখন ‘স্বাধীনতা’ই একমাত্র আরাধ্য। এ সর্বজন আরাধ্য স্বাধীনতাকে তিনি জাতীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সঙ্গে একান্ত করে পর্যালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবিনাশী সৃষ্টিযজ্ঞ, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ নজরুল কিংবা ঝাঁঝালো মিছিল ও শহীদ মিনারের উজ্জ্বল শোভা কবির বোধে স্বাধীনতার স্বর্ণাক্ষর হয়ে ধরা দেয়। বাঙালি চিরকালই শান্তিপ্রিয়; কিন্তু কখনোই প্রতিবাদবিমুখ নয়। অধিকার আদায়ের লক্ষে কিংবা অন্যায় ও শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা সবসময়ই সোচ্চার। ফলে এ দেশের প্রকৃতি সবুজ ও লাল রঙের প্রবাহে উচ্চকিত। শামসুর রাহমান এ জাতিগত বোধকে কবিতায় সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

নাগরিক কবি হিসেবে শামসুর রাহমানের প্রসিদ্ধি সর্বজনগ্রাহ্য। নগর প্রতিবেশ, নগর জীবন ও নাগরিক ভোগান্তির নানা চিত্র তার কবিতায় দৃশ্যমান। শামসুর রাহমানের কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মার্ক শাগালের (১৮৮৭-১৯৮৫) ভয়ানক আত্মদর্শ পরাবাস্তব চিত্রকলার কথা। যেখানে জন্তু, মানুষ কিংবা অট্টালিকা সবকিছুই ঊর্ধ্বগামী। নিষ্প্রাণ ফুটপাত কবির চেতনার দোলায় একটি জীবন্ত চরিত্রে রূপ পায়। শামসুর রাহমানের কবিতায় নগর বাস্তবতা ছাড়িয়ে পরাবাস্তবতায় পরিণতি লাভ করে। নাগরিকের অ্যাবসার্ড অস্তিত্বের রূপায়ণে স্থান-কালহীন এক ভিন্ন বাস্তবতায় তা অর্থবহ হয়। ফলে শামসুর রাহমানের শহর আর ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বোদলেয়ারের প্যারিস, এলিয়টের লন্ডন, কিংবা জেমস জয়েসের ডাবলিন শহরের সমান্তরাল হয়ে ওঠে। এভাবে শামসুর রাহমানের নগর ভাবনা একটি সর্বজনীন ব্যাপ্তি লাভ করে। এ প্রক্রিয়াটিকে ম্যালকম ব্রাডবারি 'metamorphosis of form' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ‘শামসুর রাহমানের শহর- ঢাকা অথবা নামহীন-নিশানাহীন এক archetypal শহর,মহাদেশহীন, শতাব্দীবিহীন- অতি অবশ্যই চেনা দৃশ্যপটে উন্মোচিত হয়; কিন্তু ওই দৃশ্যপটের ভিড়ই অবধারিত করে একটি পরাবাস্তবে উত্তরণকে।’ T.S. Eliot এর Waste land কাব্যে আমরা London নগরীকে 'unreal cit'তে রূপান্তরিত হতে দেখি।

শামসুর রাহমান বাংলাদেশের কবিতায় ব্যক্তিক অনুভবকে যেমন প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, তেমনি সমষ্টি জীবনের উত্তাপকেও তুলে এনেছেন শিল্পিত পরিসরে। ব্যক্তি ও সমষ্টি তার কবিতায় কখনও পাশাপাশি অবস্থান করে, কখনও বা একাকার হয়ে ওঠে। ফলে কবিতায় ধ্বনিত হয় নতুন কণ্ঠস্বর। শামসুর রাহমান সেই অভিনব কণ্ঠস্বরের অনন্য রূপকার।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত