স্বপ্না রেজা    |    
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
গল্প
না
ভালো লিখতে পারি না। সাহিত্যের শিক্ষার্থীও না। মাথা যে ভালো তাও না। আমার লেখার পাঠক যে উল্লেখযোগ্য, সেটাও না। এমন অগুনতি না এর মধ্য দিয়ে চেষ্টা করি লিখতে। কী হয়, যারা ভুল করে পড়েন তারা ভালো জানেন, আমি জানি না।

তবে লিখতে যেয়ে আমার বেশ উপকার হয়। আমার মনের ভেতর যে আরেকটা মন থাকে, তার সন্ধান পাই। সেই মনটা আমাকে একটা খোলা জানালার সামনে এনে দাঁড় করায়। যা আমি চোখ দিয়ে দেখতে পাই না, তা এই জানালা দিয়ে দেখতে পাই। আর সেই দেখায় লেখালেখি হয়। আদেও কী হয়, সেই উত্তর নাই খুঁজি। কারণ, আমি আমার এ দেখার সঙ্গে কোনো কিছুর মিল খুঁজি না। বলছিলাম প্রকাশককে। প্রকাশক অনিমেষ শুনলেন। তার প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক জানা হল না। এক কাপ চা পিয়নকে দিয়ে আনালেন। রঙচটা কাপ। ঠোঁটের ছোঁয়ায় কাপের ওপরটায় কালচে ভাব বেশ। পিরিচের ধার ভাঙা। আদা ভাসা চা দুলছে। এমনিতেই দুধ, চিনি ছাড়া চায়ে আমার কোনো টান নেই। বিস্বাদে বিষাদ। ঠোঁট আর জিভের নীরবতা থাকে। তবুও পান করলাম। প্রকাশকের অনুগত প্রমাণ জরুরি। চা পান শেষ হল। প্রকাশক কিছু বললেন না। মনোযোগ দিয়ে লেখা পড়ছেন। আমাকে চা দিয়ে তিনি এ সুযোগ নিয়েছেন। অতঃপর চোখ তুলে আমাকে পড়া শুরু করলেন। যেন সূচি থেকে শুরু। দ্রুত পড়লেন। পড়া শেষে জানতে চাইলেন, এসব কী লিখেছেন! এতটা অবাক প্রকাশক যে, তার অবাক হওয়ার ভারে চোখের চশমা নাক বেয়ে গোঁফের প্রায় কাছে হেলে পড়েছে। লেখক নন, তিনি অন্য কিছু যেন দেখতে পাচ্ছেন। কিছুটা নার্ভাস আমি। তবুও বললাম, গল্প।

হয়নি। বেশ জোর দিয়ে বললেন প্রকাশক। শরীর কাঁপিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি সঠিক বুঝেছেন। আমি বুঝে নিলাম, সম্ভব নয়। হবে না বই বের করা। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা গল্পগুলো কুড়িয়ে চলে যেতে হবে। আমি চলে যাওয়ার জন্য উঠি।

কী হল?

জ্বী যাব।

কেন ?

গল্প হয়নি, তাই।

আপনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছেন? ভাবছেন আমি মিথ্যা কথা বলছি? আমি বিশ বছর এ প্রকাশনা পেশায় আছি। অনিমেষকে সবাই চেনে। জানে। যেনতেন বই আমার প্রকাশনা থেকে বের হয় না। পারলে বলে ফেলেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ছাপাখানা থেকে বই ছাপাতে ব্যাকুল ছিলেন।

জ্বী, আমি জানি। আমার আর ভালো লাগছে না কথা বলতে। হেরে গেছি বুঝলাম। স্বপ্নটা দুঃস্বপ্ন এখন।

অবাক করে দিলেন। পিয়নকে ডেকে আরও এক কাপ চা আনতে দিলেন। সঙ্গে গরম সিঙ্গারা। আমি চা পান করতে চাই না এমন আচরণ করেও লাভ হল না। বেশ জোর খাটাচ্ছেন। যেন কিনে ফেলেছেন। আমার বিনয়ের প্রাচীরে ফাটল ধরতে শুরু করল। মেজাজ যেন গরম কড়াইতে টগবগ করে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অনিমেষ আমার জীবন পুকুরে বড়শি ফেলেছেন। নাছোড়বান্দা। শিকার করেই ছাড়বেন।

আপনি কেন আমার কথা মেনে নিতে পারছে না যে, এগুলো আদেও গল্প নয়। গল্প হয়নি।

জ্বী, আমি তো অস্বীকার করছি না আপনার কথা। মেনে নিয়েছি। তাই যাওয়ার চিন্তা করছি।

যাবেন তো বটেই। জেনে যাবেন না, এসব কী?

লোকটা বড্ড যন্ত্রণা দিচ্ছেন আমাকে। রীতিমতো পুতুল খেলছেন। জেনে গেছি। আপনার আচরণ বুঝিয়ে দিয়েছে। এর চেয়ে পরিষ্কার করে বললে হয়তো আমার আর কোনোদিনও লিখতে মন চাইবে না। আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ, বেশি পরিষ্কার করে আজ আর আমাকে নাই-ই বলুন। আমার বলা কথায় প্রকাশক ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন। বেশ টানাটানা হাসি। উ. দিয়ে শুরু আ. দিয়ে শেষ করেন হাসি। বলেন, আপনি আসলে গল্প লেখেননি, লিখেছেন জীবনের কথা। সত্য ঘটনা। আমাদের চারপাশের কথা। এসব গল্প নয়, সত্য। সত্য ঘটনা কখনও গল্প হয় না। গল্প হয় কাহিনীর রঙ তামাশায়।

আমি স্তম্ভিত। এত দ্রুত চোখে কখনও জল এসেছে কিনা মনে পড়ছে না। শ্যামবর্ণের মানুষটি জ্যোৎস্নার মতো স্নিগ্ধতায় স্বচ্ছ হয়ে উঠল। জ্বলজ্বলে। অনিমেষ আমার চোখের জল দেখল। যেন এ দেখার অপেক্ষায় সে ছিল। মানুষকে আবেগী করে তুলতে সবাই পারে না, অনিমেষ বেশ পারে। ভেবে নিতে হল সত্য ঘটনা মনে হওয়াটাও লেখার গুণ, লেখকের কৃতিত্ব।

কতদিন ধরে লিখছেন?

বছর চারেক। ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ার থেকে।

জীবনের বোঝাপাড়া কী সেই থেকে? এতকিছু জানবার কী মানে থাকতে পারে। লেখকের সব পড়তে চাওয়া নিছক বাড়াবাড়ি। বললাম, লিখতে পেরেছি, এটুকুন বুঝতে পারি।

জানেন, মানুষ কল্পনাকে বেশি ভালোবাসে, বাস্তবতার চেয়ে?

জানি না।

ওহ! উত্তর নিন, বাস্তবতা হল একটি কঠিন অবস্থা। আর কল্পনা হল তরল, যেভাবে রাখবেন সেভাবেই থাকবে, থেকে যাবে। শুধু ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে তার অবস্থার পরিবর্তন হবে। আর সম্ভবত সে কারণেই মানুষ বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাকে বেশি ভালোবেসে ফেলে। অনিমেষ কী কখনও লেখালেখি করত জানা নেই, তবে লিখলে বেশ ভালো করত, বুঝতে পারছি।

প্রকাশক কিছু পরিষ্কার করে বললেন না, আদেও তিনি আমার বই ছাপাবেন কিনা। পাণ্ডুলিপি রেখে দিলেন। পরে কথা বলবেন। সেই পরটা কবে, কখন, সেটা নিজের কাছেই রেখে দিলেন। আমার কাছে কিছুই থাকল না। আমি একা একটা উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।

অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়া আমিরের খুব একটা পাত্তা নেই কোথাও। বালিকা নই, তবুও বালিকা ভেবে নেয়া অনেকেরই। ব্যতিক্রম আসলাম, রুনা, সুমন আর সাম্মী। পাড়ার স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়ে। ঘরলাগা প্রতিবেশী। বেশ পাত্তা দেয় ওরা আমাকে। ওদের বিশ্বাস, আমি অনেক জানি, বুঝি। মোদ্দা কথা আমি জ্ঞানী। ভাবার কারণ, ওদের আমি গৃহশিক্ষিকা। বই প্রকাশের ব্যাপারে মনটা খারাপ। রুনা বেশ চালাক প্রকৃতির। হয়তো বুঝতে পেরেছে।

আজ পড়া না করে, গল্প করি আপা। কেমন হয়?

কী সাংঘাতিক দুঃসাহসের কথা। বাকি তিনজন আকাশ থেকে আছড়ে পড়ে। আর আমি? তেমনটাই চাইছি, বলতে পারছি না কেবল। রুনা আমাকে চোখের ইশারায় ওর প্রস্তাবকে মেনে নিতে আহ্বান জানায়।

শুরু হল গল্প। আসলাম আর সাম্মী উঠতি বয়সের ডালা নিয়ে বসে। পাখির মতো উড়াল বয়স। চোখ-মুখে মাদকতা। স্কুলের কোন ছেলে কেমন দেখতে, কোন মেয়ের সঙ্গে কার কেমন সম্পর্ক তোতা পাখির মতো আলাপ শুরু করে। আলাপের মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া সংলাপ, আপনার মতো এতটা সুইট, লাভলী, আবেদনময়ী টিচার আমাদের স্কুলের একজনও না। মুচকি হেসে রুনা বলে,

আসলাম আর সাম্মীর অবস্থা ভালো না। আচমকা রুনার কথায় আসলাম আর সাম্মী বেশ বিব্রত। রেগে যায় আসলাম।

মানে কি? আসলামের কড়া প্রশ্ন। আসলাম রুনার ইমিডিয়েট ছোট ভাই। রুনার চেয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী। রেজাল্টও ভালো। সাম্মী, রুনার বান্ধবী, পাশের বাসায় থাকে। সুমন, সাম্মীর ছোট ভাই। হিরো হিরো ভাব আসলামের।

খারাপ কথা বলিনি। কায়দা করে, ভাব নিয়ে বলে রুনা।

ভালো বা খারাপ কী রুনা? তুমি জানো তুমি কী বলেছো? এই কথার মানে কী? রীতিমতো চিৎকার করে কথা বলছে আসলাম। রুনাও উত্তেজিত।

চেষ্টা করছি না ওদের থামাতে। শেষ দেখতে চাই এই বাকযুদ্ধের। ফলাফলে অনেক কিছু বুঝবার আছে। গল্প লেখার খোরাক আছে। বর্তমান সময়কে বুঝবার সুযোগ আছে। গৃহশিক্ষিকাকে আবেদনময়ী বলার কারণ কী? রুনার পাল্টা প্রশ্নে থতমত আসলাম ও সাম্মী। লজ্জায় আড়ষ্ট। আসলাম অন্য ঘরে চলে যায়। পেছন পেছন সাম্মী আর সুমন। আর রুনা প্রশ্নটা করে নিজেই বেকুব। মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। ওকে কাছে নিয়ে বসলাম।

আবেদনময়ী শব্দটার মানে কী, রুনা? বোবার মতো চেয়ে থাকে রুনা।

তোমার কী মনে হয়েছে, আমাকে আবেদনময়ী বলা যায় না?

আপা, আপনি তো আবেদনময়ী।

তাহলে ?

আপনাকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা কী ঠিক? আজকাল স্কুল-কলেজগুলোতে কত রকম অঘটন ঘটে। শুরু তো এভাবেই হয়। ঠিক না আপা? ভাবুক কিশোরী, সেটা প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য বেশ উদ্যোগ রুনার। কৌশলে বলা কথাটাকে অর্থবহ করে তুলতে চাইছে।

আমার কাছে আবেদনময়ী শব্দটা খারাপ লাগতে শুরু করল। বেশ খারাপ। কিশোর শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এমন মন্তব্য না পাওয়াই ভালো মনে হতে লাগল।

তোমার কথা হয়তো ঠিক। সব সম্পর্কের ভেতর মর্যাদার জায়গাটুকু অবিকল থাকা উচিত।

এ টিউশনি আমার জীবনকে গতিশীল রেখেছে। এগিয়ে দিয়েছে। এখনও পেটের ক্ষুধা, মনের ক্ষুধা মেটায়। আমাকে মানুষ বানায়। সভ্য করে রাখে। সেই টিউশনির কাছ থেকে মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে মুক্ত করলাম। অজানা দিন, অজানা জীবনকে সঙ্গে করে ফিরে আসবার সময় রুনাকে বললাম,

কাল থেকে আমি আর আসছি না। অবাক হলাম, আমার সিদ্ধান্ত রুনাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করল না। এতদিন পড়িয়েও আমার প্রতি তার চাহিদা সম্ভবত হয়নি। বিশ্বাস বিনামূল্যে ঝরে পড়ে, ঝরা পাতার চেয়েও নরম, পায়ে দলে ধুলোয় মেশে। মোবাইলে ঘুরেফিরে চোখ পড়ে, অনিমেষ ফোন করে কিনা। ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে অনিমেষ আমাকে। নিজের লেখাকে এতটা প্রিয় ভাবিনি, অনিমেষ ভাবিয়ে দিল সহজে।

আমার বসবাসের জায়গাটা বেশ সরু। বাসার সবা ঘুমুবার ব্যবস্থার পর ডাইনিং রুমের উদ্বৃত্ত এক কোণে এক চিলতে সরু জায়গায় একটা সিঙ্গেল খাট বিছানো। খাট সারা দিন সিলিংয়ের দিকে একভাবে তাকিয়ে আমার নিরেট অপেক্ষায় থাকে। আমার দেহ ওর দেহে বিছাতেই ওর প্রাণ আসে। মায়ের ঠাণ্ডা হাত কপালে। চোখ মেলি।

কী হয়েছে? শুয়ে পড়লি যে! শরীর খারাপ? আজ পড়াতে যাসনি? মায়ের প্রশ্ন কখনোই একটা হয় না। এক এর সঙ্গে অনেক এবং পরপর।

টিউশনি ছেড়ে দিলাম মা। মায়ের কাছে নিজের সব কথা বলার সুখ সীমাহীন। মা চিন্তিত। বেকার ছেলেমেয়েরা কী করে পড়াশোনা শেষ করে এ সম্পর্কে মায়ের খুব ভালো জানা নেই, জ্ঞান নেই। বড় দুই ভাই বাবার আয়ের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছে। এ সুবিধা আমার পড়ালেখায় পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তার আগেই তার অবসর জীবন শুরু।

তাহলে!

দেখি কী করা যায়। তুমি ভেবো না। আমি জানি মায়ের ভাবনার জায়গা আরও একটা আছে। আর তাহল, আমি প্রতি মাসে সংসারের জন্য যে টাকাটা মায়ের হাতে তুল দিতাম, তা আর এখন দেয়া হবে না। কতদিন কে জানে। কিন্তু মা আমার ধারনাকে উল্টে দিলেন।

সংসারের জন্য তোর আর কিছু করতে হবে না। শুধু পড়ালেখার কথা ভাব। ওটুকু করতে যেটুকু পয়সা লাগে তাই জোগাড় কর। মা বলেই এতটা নিঃস্বার্থপরতার পরিচয় দিলেন। বিনে পয়সায় খাওয়াবে বছরের পর বছর এমন পরিজন কই মা ছাড়া এ জগতে?

তোকে পড়াতে পারলাম না, ওদের পেরেছি। কথা আর চোখের জল মিলেমিশে একাকার। আজকাল মা একটুতে কাঁদেন। বাবা ওপারে চলে যাওয়ার পর এ প্রবণতা। আজকাল বেশ জোরেশোরে হয়। শরীর কাঁপানো কান্না। গভীর কষ্টের বুদবুদ ফেনিয়ে ওঠে। কোলে মাথা রেখে কষ্টগুলো নিংড়ে নিতে ইচ্ছে হল। রান্নাঘর থেকে বের হওয়া মায়ের শরীরে ঘামের গন্ধ। আহ্ কী পবিত্র সুগন্ধি। মানুষের শরীরের গন্ধের ভেতর সম্পর্কের একটা অপূর্ব টান থাকে, যে গন্ধ নেয় সে টের পায়। আশ্চর্য আমিও কাঁদছি। কেঁপে নয়, নীরবে।

তোর মন খারাপ? বললাম,

মন সবসময়ই খারাপ থাকে সুখে-দুখে। সুখ বুঝে উঠতেই দুঃখ চলে আসে। আমার কথায় মায়ের কান্না থেমে যায়। কাঁপুনি বন্ধ হয়। টের পেলাম আমার কপালে মায়ের স্নিগ্ধ ঠোঁট জায়গা নিয়েছে। মোবাইল বেজে ওঠে।

আপনার বই প্রকাশ করব আমার প্রকাশনা থেকে। বলে কী অনিমেষ। আমার মনে হল বিশাল আকাশটা অনিমেষ আমাকে ধরিয়ে দিল। নানান রঙের, শব্দের ঘুড়ি উড়বে এবার, থাকবে লাটাই আমার হাতে। ইচ্ছেমতো উড়াব শব্দের ঘুড়ি। মাকে জড়িয়ে বললাম। আমার আবেগের সঙ্গে মায়ের শুনবার উচ্ছ্বাসের কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেল। বই বের হওয়ার সংবাদে হাসলেন না। নীরবে চোখের আড়াল হলেন।

কাল সকালে যেতে বলল অনিমেষ। অবশ্যই যাব। স্বপ্ন পূরণে দৌড় দিতে হবে, দৌড় দিতে চাই। কেমন এক সুখ, কেমন এক আনন্দ শরীরের ভেতর অনবরত ঢেউ দিয়ে আমাকে পাগল করে তুলেছে, কেউ জানতে পারছে না।

খুব সকালে ঘুম ভাঙল। ঘুম ছিল না আসলে পুরোটা রাত, চোখের পাতা নুইয়ে ছিল কেবল। পছন্দের শাড়ি পড়লাম। ভেজা চুল কাঁধে ছড়ানো। ঠোঁটে হালকা লিপ্সটিক। প্রতিদিনের চেয়ে একটু বেশি হল সাজ, মন তাই বলে। সাজ কী তবে অনিমেষের জন্য। আমি তো অনিমেষের কাছেই যাচ্ছি। প্রশ্ন নিজেকে করতে উত্তরটা নিজের কাছ থেকেই পেলাম। মানুষ মাত্রই প্রাপ্তির সংবাদে সাজে, মনে এবং অবয়বে। অনিমেষ নয়, এ সাজ আমার আনন্দের।

ক্লাস ফাঁকি দিতে হল। বাংলা বাজার অলিগলির ভেতর শতশত প্রকাশনা অফিস পাশ কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম অনিমেষের অফিস। আগেই অনিমেষ পৌঁছে গেছেন। রঙিন শার্ট গায়ে চড়ে এসেছেন। বেশ পাত্তা দেয়ার মতো আমার দিকে তাকালেন।

বসুন।

রেওয়াজ মতো চা এলো। শুধু চা আনাতে পিয়নকে বকা হল। পিয়ন দৌড়ে গেল। বেশ মুডে আছেন অনিমেষ। কণ্ঠ গুনগুনিয়ে ওঠে। এ রকম অনিমেষকে আগে দেখা হয়নি। গানের ভলিয়্যুম বাড়িয়ে আমার পাশে এসে বসেন। বডি স্প্রের কড়া গন্ধ নাকে এসে লাগে।

অনেক বড় লেখক হবেন, সন্দেহ নেই। নাটকীয়ভাবে পাশে এসে বসাতে কিছুটা বিব্রত আমি।

সমাজে এখন যা সৃষ্টি হয় সবই আধুনিক। তাই আধুনিক কবি, আধুনিক সাহিত্যিক, আধুনিক সমাজসেবক ইত্যাদি। আধুনিক না হলে উপায় নেই। আপনাকেও আধুনিক হতে হবে। এ মানে লেখায়, আচার-আচরণে। টের পাচ্ছি আমার ভাবনায় অগোছালো মেঘ ভাসা শুরু করেছে। ভারি বর্ষণ শুরু হতে দেরি নেই। অনিমেষ কথায় যতিচিহ্ন দেননি।

গল্প লিখবেন, না কি সত্য ঘটনা লিখবেন, সেটাও ঠিক করে নিতে হবে। সত্য ঘটনার জন্য পত্রপত্রিকা আছে। যদিও কতটা সত্য হয়ে আসে ঘটনা, সেটাও বিতর্কিত। তবুও মানুষ সত্য ঘটনা জেনে নিতে পারে টিভি, পত্রপত্রিকায়। গল্পের জায়গা বই। গল্প আপনাকে লিখতে হবে বইয়ের জন্য এবং তা আধুনিক। আপনি পারবেন। আপনার বাচনভঙ্গি অপূর্ব! শুধু গল্পের বিষয়গুলোকে রঙ দিন, ঢং দিয়ে সাজান। উদ্দীপনায় ভরিয়ে দিন। উদ্দীপিত করুন। পাঠক যাতে সহজেই আকৃষ্ট হতে পারে। বেশি সংখ্যক পাঠক ধরুন। বেশিসংখ্যক পাঠক যা চায়, তাই লিখুন। কথা শেষ করে অনিমেষ টেবিলের ওপর উল্টে রাখা নিষিদ্ধ যৌবন বইটি সোজা করে এগিয়ে ধরেন।

এ রকম বই লিখুন। পাঠক বেশি। আমার মস্তিষ্কের মেইন সুইচ অফ করে দিল অনিমেষ। বসে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।

আপনি যে বললেন, আমার পাণ্ডুলিপি আপনার পছন্দ হয়েছে! গলা উজাড় করা হাসি অনিমেষের।

আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে, সেটাই বলেছি। আপনাকে পছন্দ হওয়াই বড় কথা। কারণ, আপনাকে দিয়েই আমি যা চাইছি তা পেতে পারি। আপনিও অনেক কিছু পেতে পারেন।

না! কখনোই না! শক্ত ‘না’ বললাম। অনিমেষ থমকে গেছেন।

বাংলা বাজার পেছনে। আমি হাঁটছি সামনে। নিজেকে আবিষ্কার করতে পারছি বেশ। মন বিষণ্ণ মেঘে পুরোটাই ঢাকা পড়েছে। হয়তো এমনই ছিল, বুঝিনি। হৃদয়বাসী আবেগ কখনো-সখনো অনেক কিছু বুঝতে দেয় না। কলিংবেলে আঙুল ছোঁয়াতে মা দরজা খুললেন। হাসি মাখা মুখ। ঘরে ঢুকে দেখি রুনা। আপনার কাছে পড়তে চাই। আপনাকে দুঃখ দিয়েছি!

তোমার দেয়া দুঃখটা তোমার কাছে ছিল, আমি সঙ্গে আনিনি।





আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত