প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মোস্তফা কামালের অগ্নিকন্যা অগ্নিঝরা অগ্নিসময়

ঐতিহাসিক উপন্যাস একটি বিষয়ে এসে বিভক্ত হয়ে যায়। সেটি সময় ও চরিত্রে। বলা বাহুল্য, সময়কে তো এখানে বিভাজন কিংবা এড়ানো সম্ভব নয়। তাহলে তো ইতিহাসের আশ্রয়টুকুই শেষ হয়ে যায়। বাকি থাকে চরিত্র। এই চরিত্রগুলোর উপরই নির্ভর করে উপন্যাসের মূল কাঠামো এবং বক্তব্য। সময়টা ইতিহাসের বলে কোনো সন্দেহ নেই। চরিত্রগুলোও হতে পারে ওই সময়েরই। কিন্তু সেগুলো হতে পারে কাল্পনিক। অন্যদিকে সময়টা ইতিহাসের হয়েও চরিত্রগুলো হতে পারে বাস্তব। যে বাস্তব চরিত্রগুলো ওই সময়েরই ইতিহাসের নির্ণায়ক, গতিপথের সঞ্চালক কিংবা নতুন ইতিহাসেরই জনক। বলতে দ্বিধা নেই কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস লেখা যতটা সহজ বাস্তব চরিত্র নিয়ে লেখা ততটাই কঠিন। কারণ এখানে লেখককে তথ্য, তত্ত্ব, ঘটনার পরম্পরা, সম্পূরক ঘটনা- প্রতিটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সত্যাশ্রয়ী হতে হয়। সামান্যতম বিচ্যুতি থেকেও মুক্ত হতে হয়।

সমস্যা হল ইতিহাসের এই উপাদানগুলো তো নন-ফিকশনাল। কিন্তু লেখক ব্রতী হয়েছেন উপন্যাস লিখতে। নন-ফিকশনাল উপাদান ব্যবহার করে লেখককে যখন ফিকশন লিখতে বসতে হয় তখন ইতিহাসের সত্যনিষ্টতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সৃজনশীল উপন্যাস লেখা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।

লেখক মোস্তফা কামাল সেই জটিল পথের পথিক হলেন। তার উপন্যাস অগ্নিকন্যার সময় আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের, তার চরিত্রগুলো আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাজনৈতিক সৃজনশীলজন। যাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজ আমরা ভোগ করছি স্বাধীনতার সুখ।

শেরে বাংলা বলতে যেমন একজন এ কে ফজলুল হককেই বুঝি, বঙ্গবন্ধু বলতে যেমন একজন শেখ মুজিবুর রহমানকেই বুঝি তেমনি অগ্নিকন্যা বলতেও আমরা একজন মতিয়া চৌধুরীকেই বুঝি। কিন্তু অগ্নিকন্যা উপন্যাস শুধু একজন মতিয়া চৌধুরীরই জীবন-বয়ান নয়।

অগ্নিকন্যায় রয়েছে একজন মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট। আর সেই প্রেক্ষাপটে অবলীলায় চলে আসে আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রেরা। চলে আসে সাতচল্লিশের দেশ ভাগ। দেশ ভাগের নায়কেরা (কিংবা খলনায়কেরা)। চলে আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চলে আসে চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, চলে আসে ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন। অগ্নিঝরা উপনাসে প্রথম খণ্ডের ব্যাপ্তি-কাল এ পর্যন্তই।

তাতেই অবধারিতভাবে চলে আসে আমাদের নায়কেরা। চলে আসে মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুর হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেকে। চলে আসে আমাদের চিরশত্রুরাও।

ভাবতেই শিহরিত হতে হয় এমন একটা উপন্যাস যার চরিত্রগুলো আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাদের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই অগ্নিকন্যার উপন্যাস না হয়ে ইতিহাসগ্রন্থ হয়ে যাওয়ার কথা। লেখক মোস্তফা কামাল প্রথমেই উপন্যাসটিকে এই ত্রুটি থেকে মুক্ত করেছেন। ফলে পাঠকের পিপাসা জন্মেছে একটি উপন্যাস পড়ার। ইতিহাস পড়ার নয়। তিনি ইতিহাসের গুরুগাম্ভীর্য পরিহার করেছেন, পরিহার করেছেন ইতিহাস কপচানোর প্রবণতাও। ফলে পাঠক ভারমুক্ত হয়েছে ইতিহাসের চাপ থেকে। কিন্তু লেখক সুকৌশলে উপন্যাসের কাঠামোর ভেতর দিয়েই প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন ইতিহাসের সেই অংশের দিকে যেখানে হয়তোবা ঠিকমতো আলো পড়েনি। আমরা হয়তোবা একটি ঘটনার ফলাফল বা প্রতিক্রিয়া দেখেছি। কিন্তু এর অন্তরালের ঘটনা ও ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে জানতাম না। লেখক উপন্যাসের কাঠামোর ভেতর দিয়ে সেখানেও আলো ফেলেছেন। ফলে পাঠক উপন্যাসের নামে আসলে ইতিহাসের অলি-গলির ভেতরে ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। লেখক মোস্তফা কামাল সুকৌশলে এ কাজটি করেছেন।

এক অর্থে অগ্নিকন্যা উপন্যাসটি জননেত্রী মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠার ভূমিকা। দীর্ঘ ইতিহাস যার প্রেক্ষাপট রচনা করে দিয়েছে। মতিয়া চৌধুরীও সেই প্রেক্ষাপটকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। সঠিক পাঠ নিতে পেরেছেন সময়ের। এই সুদীর্ঘ প্রেক্ষাপট পেরিয়ে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে হাজারো সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কাহিনী। পাঠকের পিপাসা ইতিমধ্যে পেয়েছে চরম রূপ। অগ্নিকন্যা উপনাসের পরবর্তী অংশ হয়ে উঠবে সেই পিপাসা মেটানোর উজ্জ্বল উদ্ধার। স এমরান কবির

অগ্নিকন্যা মোস্তফা কামাল।। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ ।। প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশন্স

একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭

৩২০ পৃষ্ঠা । দাম : ৫০০ টাকা


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত