মতিন বৈরাগী    |    
প্রকাশ : ১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
অনির্দিষ্ট ঠিকানা
শামীম কিছুই বুঝতে পারল না, আদালত তাকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে এবং বিচারক কি শুনছে উকিলের কাছ থেকে। উকিল দুজন বাহাসের পর বাহাস করছে, একজনের বক্তব্যের মাঝখানে তার পক্ষের উকিল কি সব বলছে আর আদালত কখনও হাতুড়ি পিটিয়ে অর্ডার অর্ডার বলে একে ওকে থামাচ্ছেন। কী এমন ঘটেছিল যে তাকে প্রথমে থানায় এনে পুলিশ পিটিয়েছে, তার পর নাকে-মুখে কাপড় দিয়ে জল ঢেলেছে, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আঙুলগুলো মুচড়িয়েছে, পিন ঢুকিয়েছে। অথচ প্রতিবারই সে যা বলেছে তা তারা কেউ গ্রহণ করেনি। কেবল প্রতিটি প্রশ্নের পর লাথি মেরেছে, পায়ের নলায় পিটিয়েছে আর জিজ্ঞেস করেছে তোর বাড়ি কোথায়, তোর সঙ্গে কে কে ছিল, কে মাস্টারমাইন্ড মানে তোর নেতা, গ্রেনেড আছে কিনা। কোথা থেকে এসেছিস, কোথায় রেখেছিস, বোম আছে কয়টা।
শামীম বুঝতে পারছে না কেন এমন হল। সে তো এসেছিল তার নিজ গ্রামে, তার ভিটে ভূমি দেখবে বলে। তার পর তো আদালতে তার বিচার হচ্ছে। কী নিয়ে সন্দেহ তা কেউ বলছে না, আর কী সব বলছে দুই আইনজীবী তা সে অনুমান করতে পারছে; কিন্তু কিনারা করতে পারছে না। আদালত কখনও শুনছে, কখনও মনে হচ্ছে কিছুই শুনছে না কেবল বসে বসে কলমটা নাড়াচাড়া করছে, আর কিছু দর্শক গোগ্রাসে গিলছে দুই উকিলের বাহাস।
তবু আদালত তাকে জামিন দিল। তবে এ-ও বলে দিল এ শহর ছাড়া যাবে না, যতদিন বিচার শেষ না হয় ততদিন তাকে এখানেই থাকতে হবে এবং তারিখ মতো সশরীরে হাজিরা দিতে হবে। শামীমকে জামিনের আদেশ শোনানোকালে আদালত একবার তার দিকে তাকিয়েছিল, এমন দৃষ্টি থেকে শামীমের মনে হয়েছিল যে আদালত শামীমের প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু শামীম হিসাব করে বের করতে পারল না বিপক্ষের উকিলের সে কী ক্ষতি করেছিল, সে আদাজল খেয়ে তাকে ভয়ানক লোক বলে চিহ্নিত করতে চাইল। আর জামিন যাতে না হয় তার জন্য কী রকম চোখাচোখা যুক্তিগুলো হাজির করছিল।
শামীমের এইখানে কেউ নেই। এক বয়স্ক লোক তার জন্য উকিল দিয়েছিল। সে তাকে চেনেও না। সে যখন পুলিশের হাতে পড়ে তখন আরও কিছু লোক ছিল তার সামনে, আশপাশেও ছিল। তার মধ্যে এ লোকটি ছিল না। তা হলে সে এলোই বা কোথা থেকে। এসব ভাবতে ভাবতে সে আদালত ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলো। তখন দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ। সে তেমন হাঁটতে পারছিল না, তার হাঁটুর জখম তাকে বেসামাল করে দিচ্ছিল। সে বসে পড়ল ফুটপাতে একটা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। কেউ তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিল না। আর এরকম অবস্থায় তার চোখে ঘুম নেমে এলো। মনে হল রাজ্যের ঘুম তার দুই চোখে একটা প্রশান্তির হাওয়া নিয়ে এসেছে। সে ঘুমিয়ে পড়ল কী জেগে ছিল তা সে ঠিকমতো অনুমান করে উঠতে পারল না। তার কেবলই মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে কোনো মানুষের ঠিকানা নেই। মরে গেলে ঠিকানা থাকে না। সে-ও মরে গেছে। তারও কোনো ঠিকানা নেই। সে মনেই করতে পারল না কোথা থেকে এখানে এলো। কেবল এটুকু মনে আছে যে সে নাকি এখানে বরদা গ্রামে জন্মেছিল, তার পর কত বছর কেটে গেছে-
শামীম যখন হারিয়ে যায় তখন তার বয়স আর কতই বা হবে ৫ কী ৬। তারা এসেছিল ঢাকায় তার মার সঙ্গে মার চিকিৎসা করাতে। সঙ্গে ছিল তার চাচা। বাবা তো আগেই মারা গেছে। তার মা আর সুস্থ হল না বটে, অধিকন্তু শামীম হারিয়ে গেল চিড়িয়াখানা দেখতে গিয়ে। তার মনে আছে সে খুব কানছিল এবং একটি বাসে তার চাচার মতো এক লোক কে দেখে সে সেই বাসের পেছনে দৌড়েছিল; কিন্তু কেউ ফিরে তাকায়নি। তারপর অসহায় শামীম কীভাবে কেমন করে সাতক্ষীরার এক রাহাতউল্যার সঙ্গে চলে এসেছিল তিনদিন ফুটপাতে পড়ে থাকার পর, তা আর মনে নেই। তার মা কিছুদিন বেঁচে ছিল প্যারালাইজড হয়ে এ খবর সে জানত না। ধীরে ধীরে সবকিছু মুছে গেছে স্মৃতি থেকে। কেবল একটা স্মৃতি তার মনের পর্দায় মাঝে মাঝে উঁকি দিত সে হল তার কুকুরটি যার নাম ছিল টমি। রাহাতউল্যা ছিল উকিল নিঃসন্তান। শামীম তার বাসার এক পুত্র হয়ে থাকল আর ভদ্রলোক তাকে লেখাপড়া শেখাল। সে বিএ পাস করল একদিন। এখন সে যুবক। তারপর একদিন রাতে সে স্বপ্ন দেখল তার মা তাকে ডাকছে এবং বলছে তুই একবার নিজ গ্রামে যা, দেখ আমাদের বাড়িটা আছে কিনা। আরও একদিন সে তার সঙ্গী প্রিয় কুকুরটাকেও স্বপ্নে দেখেছিল। কুকুরটা তার দিকে চেয়ে আছে, বিমর্ষ তার চোখে পানি। সেই থেকে মনে হচ্ছে কুকুরটা তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। সে তার পালিতা মায়ের কাছে শুনেছিল জিনপরী নানা সময়ে নানা প্রাণীর ছল ধরে থাকে। সে ঘুমের মধ্যেও কুকুরটার মাথায় হাত বুলায়, তার গলা চুলকে দেয়। নরম লোমগুলো স্পষ্ট হয়ে হাতে লাগে। এর মধ্যে রাহাতউল্যা মারা গেছেন। এখন বেঁচে আছেন তার স্ত্রী আমেনা। আমেনাকে সে মা বলে ডাকে। শহরের বাড়িটায় তারা দুটি প্রাণী। মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজন আসে, তার মধ্যে রাহাতউল্যার ছোটভাই কেরামতউল্যাহ শামীমকে সহ্য করতে চায় না। আপদ সরাতে পারলেই যেন ভালো; কিন্তু সে জানে না রাহাতউল্যা মৃত্যুর আগে বাড়িটা শামীমের নামে লিখে দিয়ে গেছে। আসলে শামীমও সে খবর খুব একটা জানত না। ভাসা ভাসা শুনেছে। একদিন আমিনা শামীমকে সে কথা বলেছিল, রাহাতউল্যার মৃত্যুর পর। আমিনা শামীমকে ভালোবাসত, স্নেহ করত সন্তানের মতো। শামীম আইন পড়বে এবং আইন ব্যবসায় সে নিয়োজিত হবে এ ছিল রাহাতউল্যার ইচ্ছা। কিন্তু একরাতে সে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠল মা মা বলে। আর ভোরবেলা সে তার পালক মা আমিনাকে বলল: শুনেছি বড়দা গ্রাম আমার জন্মগ্রাম, আমি একটু সেই গ্রামে যাব; আমার মায়ের কবর দেখতে। কিন্তু গ্রামটি কোথায় কোনো জেলায় আমিতো কিছু জানি না। পালক মা তখন তাকে বলল: তোমার জন্মগ্রাম নাকি দক্ষিণের কোনো এক জেলায়। তোমার বাবা নানাভাবে খবর নিয়ে জেনেছিলেন, বলেনি কারণ তখন সেখানে কেউ ছিল না। তখন তোমার মা-ও মরে গেছে। চাচারা তোমাদের ভিটা দখল করে নিয়েছে। তাদের বাড়িঘর করে ফেলেছে। তুমি আর সেখানে গিয়ে কী করবে। মানুষ মরণশীল, যে মরে গেছে সে আর ফিরে আসে না। তবে তারা সব দেখে।
তবু শামীম যেতে চাইল। কারণ তার মনে হল টমিটা বেঁচে আছে, আর তার জন্য বসে থাকে পথের মুখে। সে দেখতে পায় টমিকে, লেজ নাড়ছে, আর কুই কুই শব্দ করছে। আর কান্নায় কান্নায় তার দু’চোখের ঘা কালো হয়ে আছে। সে তার পালক মাকে বলল, না মা আমি যাব শুধু দেখতে, তার পর ফিরে এসে আইনে ভর্তি হব। বাবার ইচ্ছাটা তো পূরণ করতে হবে। পালিতা মা আর বাদসাধেনি। শামীমকে যাতায়াতের টাকাগুলো দিয়ে বলল যাও তবে বড়জোর ৫ দিন থেকো। ৬ দিন নয়, দেরি হলে ৭ দিনে চলে এসো ৮ দিন নয়। বেজোড় সংখ্যায় যাতায়াত ভালো। আজও বেজোড় দিন। আজ ৩ তারিখ।
শামীমুর রহমান যখন বড়দা স্টেশনে নামল বাস থেকে তখন দুপুর হেলে গেছে। চারদিকের নিস্তব্ধা কেবল গলছে। কিন্তু কী করে যাবে তার গ্রামে, সে তো চেনেনা কিছু। কিছুটা দূরে এগোতেই সে দেখল একটা কুকুর তার সামনে লেজ নাড়ছে, আরও ভালো করে তাকাতে কুকুরটা তার গায়ে উঠল, লেজ নাড়ল, হাত চাটল অবিকল টমি। আর টমি নামটা ডাকতেই কুকুরটা আবারও তার গায়ে লাফিয়ে উঠল, কুই কুই করে ডাকল, সামনে-পেছনে ছুটল এবং ও ও করে পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। যেন সে শামীমকে পথ চিনাচ্ছে। শামীম আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল কুকুরটা বারবার রূপ বদলাচ্ছে, কখনও অবিকল টমি, কখনও অন্য কুকুর। শামীম ঠিক বুঝতে পারল না এটা কী টমি। সেই কত বছর, এত সময় তো কুকুর বেঁচে থাকে না, বড় জোর ৭-৮ বছর। শামীম হাঁটল কুকুরটার সঙ্গে এবং এক সময় একটা বাড়ির প্রবেশ মুখে কুকুরটা দাঁড়াল। শামীমের মনে পড়ল এখানে একটা বড় শিরীষ গাছ ছিল, ওইতো সেই জলপাই। শামীমের দ্বিধা প্রবল হল। এত কাল পড়ে কে আছে তার। কারও কথাই তো মনে পড়ছে না। যে চাচার সঙ্গে চিড়িয়াখানা দেখতে গিয়ে সে হারিয়েছিল [নাকি হারিয়ে যাওয়ার কৌশলে সে পড়েছিল] সে-ই বা কেমন হয়েছে দেখতে। সেই চাচার একটি ছেলে ছিল ২ বছরের তারাই বা কতটা বড় হয়েছে এখন। শামীম কি করে চিনবে, কি পরিচয় দেবে সে, তার বাবা মরে গেছে যখন তার বয়স ৪। বাবার কণ্ঠস্বরটা একটু একটু মনে পড়ে তার। হঠাৎ সেই কণ্ঠস্বর সে শুনতে পেল। কে যেন বলল আয়, তবে সাবধানে।
শামীম হাঁটল সামনে, সামনে কুকুরটাও হাঁটছে। কিন্তু কেমন এক সংশয় তাকে আড়ষ্ট করে ফেলেছে। আর সে যখন বাড়িতে প্রবেশ করল তখন সে দেখল এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে।
কে আপনি, না বলে বাড়িতে ঢুকলেন, বলল সেই যুবক, তার কণ্ঠ উষ্ণ।
আমি শামীম, আমি আমার জন্মগ্রাম দেখতে এসেছি, আমার বাড়ি-
আপনার বাড়ি! যুবকের উত্তেজিত স্বর।
হ্যা, আমি হারিয়ে গেছিলাম সেই ছোট্ট বেলায়, তার পর সে তার চাচার নাম বলল। বলল ডাক নাম, রমজান। কারণ পুরো নামটা আজ আর তার মনে নেই।
যুবক কণ্ঠ চড়িয়ে বলল : ভোগলামী ছাড়েন মিয়া, এমন সময় এক বৃদ্ধ আরও দুই যুবক সেখানে হাজির, হাজির নারীরাও। শামীম কিছু বলতে চাইল, কিন্তু যুবকদের যুক্ত কণ্ঠ তাকে থামিয়ে প্রথম যুবক বৃদ্ধকে বলল: দেখো বাবা কোথা থেকে এ ধান্দাল এসে বলছে এ বাড়ি নাকি তার। সে নাকি হারিয়ে গেছিল, এখন গজাইছে।
বৃদ্ধ যুবককে নিবৃত করে বলল: ঠিক আছে ও বলুক কোনদিকে ওর ঘর ছিল আর কোনদিকে তার ছিল মুখ।
শামীম উত্তরের ঘর দেখিয়ে বলল: ওইখানে, আর ওর পূর্ব দিকে ছিল দুটো তালগাছ, নারকেল গাছ ছিল পেছনে, পেছনে একটা বাদামগাছও ছিল। ওই তালগাছ দুটোর মাঝে আমার নাড়িপোঁতা ছিল। আমার মা একদিন আমায় স্বপ্নে বলেছিল তুই যাবি তোর জন্মমাটিতে; কিন্তু কিছুই পাবি না, তবে যাবি, এ হল নাড়ির টান। আপনি কে এই বলে সে তার নাম বলল। বৃদ্ধ তেমন গা করল না, বরং কেমন যেন গম্ভীর হয়ে ছেলেদের বলল: ওকে বাড়িটা দেখিয়ে দে। তখন শামীমের আবার মনে পড়ে গেল তার মা স্বপ্নে বলেছিল যদি কখনও তোর নাড়ির টান প্রবল হয় আর তুই যাও, খবরদার রাতযাপন করবি না। তবু সে বৃদ্ধের অনুরোধে থেকে গেল। তাকে থাকতে দেয়া হল বাইরের ঘরটাতে। রাতে খাবারও সে পেল; কিন্তু তাতে আদর আপ্যায়ন ছিল না। শামীম বুঝল এরা আত্মীয় তবু আত্মীয় নয়, এরা খুশি হয়নি তার আগমনে। হঠাৎ তার মাকে মনে পড়ে গেল। সে ভেবে রাখল কাল তার কবরটা জিয়ারত করে ফিরবে। রাতে তার তেমন ঘুম হল না। কেবল একটু একটু তন্দ্রা আর তার মধ্যে পালক বাবা মায়ের মুখ, তার মায়ের মুখ বারবার আনাগোনা করছে। কী তারা বলতে চাইছে। এমন সময় তার হাত পড়ল টমির মাথায়। সে দেখল টমি তার বিছানার পাশে শুয়ে আছে। যেমন সে সেই ছোটবেলায় শুতো। তখন বিস্ময় ছিল না। আজ তার শরীর ঝম ঝম করে উঠল। শেষ দিকে সে একটু ঘুমিয়েই পড়েছিল।
সকাল হয়েছে। একটা কাঠবিড়ালী দৌড়ে উঠে গেল গাছে। একটা মোরগ ডাকছে। আর মসজিদ থেকে ফিরছে তার চাচা। নিচু মুখ, মাথায় গোলটুপি।
এখন ফিরবার পালা, তার চাচা বলল: একটু বসে যাও। কেমন যেন খাপছাড়া। এর মধ্যে দুই যুবক মানে তার চাচাত ভাই এসে বলল: আপনি এখনও যাননি, তাড়াতাড়ি বাইর অন। অপরিচিত লোক বাড়িতে রাখা নিষেধ। এখন চারদিকে জঙ্গি। আপনি জঙ্গি কিনা আমরা জানিনা, যান বাইর অন। নইলে পুলিশ ডাকব। এবার শামীম বুঝল বাড়িটি থানা থেকে বেশি দূরে নয়। তার মনেও পড়ল তাই। কিন্তু নানা কথা ও বিপরীত থেকে একটা বচসার শুরু হল। এক ভাই এসে শামীমকে হাত ধরে টেনে বাইরে আনল এবং একভাই তাকে দু’চার ঘা বসিয়ে দিল। শামীম ঘাড় ফিরতে দেখে অন্যজন একটা শক্ত লাঠি নিয়া তার মাথায় মারতে এগিয়ে আসছে। ঠিক তখন শামীম রুখে দাঁড়ানোর কথা ভাবতে কোথা থেকে কে ওই যুবকের নাকে-মুখে চালিয়ে দিল ঘুষি। আর তাতে তার নাম-মুখ দিয়ে গল গল করে রক্ত ঝরছে। এমন সময় আশপাশ থেকে যারা এলো তারা প্রতিবেশী। কাঠের পুতুল। তারা ঘটনাটা দেখল। কিন্তু নীরব পুতুলের মতো।
পুলিশ এলো এবং শামীমকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল।
ঘুমের মধ্যে শামীম দেখল যে ঘুষি চালিয়েছিল সে তার বাবার মতোই হবে। বাবার মতো চেহারা যা আবছা আবছা তার মনে হল। কিন্তু তার মুখ সে দেখতে পেল না। আর যখন তার ঘুম ভাঙল তখন দেখল সেই উকিল তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে বলল: তুমি এখানে ঘুমিয়ে কেন? তোমার যাওয়ার জায়গা নেই? শামীম ধাতস্থ হয়ে বলল : না। এখন আমি কোথায় যাব আমার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। উকিল বলল : চলো আমার সঙ্গে। আমার নাম আনিসউদ্দিন। তোমার বাবার এককালের খেলার সাথী। তুমি আমার ওই খানে থাকবা।
মামলায় শেষতক শামীমের দুই বছরের জেল হয়েছিল। পক্ষ-বিপক্ষের উকিলের বাহাস সে মন দিয়ে শুনেছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না তার দোষটা কোথায়। আর ওই যুবককে তো সে আঘাত করেনি। তবে কে তা করল। তবু সে কথা সে আদালতে বললে আদালত নেবে না, আর যা ঘটেছিল তা কেউ বিশ্বাসও করবে না। সে জন্মগ্রামের ঠিকানাটা হারিয়ে ফেলল।
যে দিন তার মুক্তি মিলল সেই দিনই সে রওনা হল সাতক্ষীরার উদ্দেশে। কিন্তু কী আশ্চর্য কুকুরটাকে আর কোথাও সে দেখতে পেল না। উকিল আনিসউদ্দিন যাতায়াত ভাড়াটা আর কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে বাসে তুলে দিল। সেই তার জন্মের মতো বড়দা ছেড়ে আসা। সে জানে আর কোনোদিন ফিরে আসা হবে না। অবশ্য উকিল চাচা বলেছিল, তুমি আবার এসো, তোমার জমি-জিরেত আমি উদ্ধার করে দেব। কিন্তু শামীমের কোনো আসুক্তি হল না। সে বলল : আপাতত যাই কাকা, যদি মনে হয় তা করা উচিত তো আসব। আসলে ইচ্ছে হচ্ছে না। কী লাভ, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর ফিরতে পারে না। এটাই দৈব।
বাস চলছে, দু’পাশের সারিগুলো দৌড়ে পেছনে। শামীম ভাবল এই তো জীবন মানুষের, কতদ্রুত পেছনে সরে যায়। তারপর হারায়। আমিও হারিয়ে যাচ্ছি। একটা বিশাল আকাশ থেকে একটাবদ্ধ আকাশতলে দুই বছর তারপর আবার খোলা আকাশ; কিন্তু সে ছোট্ট আকাশই মনে হল তার। মাঠে মাঠে শস্য, শীতের সময়, সবজির গাঢ়ো সবুজ রঙ, শাদা ধপধপে কপি আলুর খেত, ভুট্টার গাছগুলো দুলছে। আর সন্ধ্যায় যখন সে ফিরল সাতক্ষীরায় তখন তার মনে হল শহরটা কাঁদছে। আর বাসায় ফিরে সে যখন তার পালক মাকে ডাকল তখন তিনটি কিশোরী অবাক হয়ে তাকে দেখছে। তারপর এক মধ্যবয়সী মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল : তোমার মা মরে গেছে। আর এই বাড়ি আমরা কিনি নিয়েছি। শামীম অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল অনেকক্ষণ, কী করবে সে, যদিও তারা বলল : আসো ভেতরে আসো, থাকার জায়গা না থাকলে আজ রাত এখানে থাকো। শামীম স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল আরও কিছুক্ষণ। মনে পড়ল তার পালক মা আমেনাকে।
হঠাৎ তার মনে হল তার পালক মা বলছে আমি এ বাড়ি বিক্রি করিনি। তুইতো কিছুটা জানতি, তোর বাবা উকিল সাহেব তোকেই এ বাড়ি দিয়ে গেছে। তুই রাত্রে এখানে থাকিস না, মামলা করিস, বাড়ি তোর। তখন একঝলক সে দেখল টমিটা দাঁড়িয়ে আছে।
তবু শামীম ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো এবং কতক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে, উঠে পড়ল এক বাসে। সে জানে না এ বাস কোথায় যাবে। হ



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত