আখতার হোসেন খান    |    
প্রকাশ : ১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
শরণার্থী শিবিরের শহীদেরা
পাল রাজারা বাংলাকে কেন্দ্র করে এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন বটে; কিন্তু কালের ধাক্কায় তার কথা খুব একটা আজ আর মনে আসে না। ইখতিয়ারউদ্দীন বখতিয়ার খিলজীর আঠারো যোদ্ধা নিয়ে বাংলায় আগমন এমন এক ঘটনা, যা ইতিহাসকে ভিন্ন খাতেই নিয়ে যায়, সংস্কৃতি-বিশ্বাস সবকিছুকে পাল্টানো শুরু করে। পরে বাংলার দুশ’ বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগ। আর মোগলদের হাতে সে স্বাধীনতার অবসান। ১৭৫৭তে পলাশীর আমবাগানে ক্লাইভের কাছে এক বিস্ময়কর যুদ্ধে ওই মোগলদের বংশধর নবাব সিরাজউদদৌলা পরাজয় ও স্বাধীনতা হরণ আরেক উল্লেখ্য ঘটনা। সংশ্লেষে ওই জায়গাটির ধারে কাছেই আরেক আমবাগানে ২১৪ বছর পরে বাংলার বৃহত্তর অংশ স্বাধীন সরকার গঠন করে ও ২৬ মার্চ ১৯৭১ তারিখে শুরু হওয়া এক যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিক বৈধ রূপ দেয়।
শেষের ওই যুদ্ধ এ অঞ্চলের জানা ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ীতম যুদ্ধ। এ যুদ্ধ এক অবিস্মরণীয় তাৎপর্য ও স্বপ্নগাথার যুদ্ধ, এ যুদ্ধ একইসঙ্গে রোমান্টিক ও বাস্তব, এদেশের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। গল্প, উপাখ্যান, কথা-কাহিনী আর বাস্তবতার স্বপ্নদাতা মুক্তিযুদ্ধ এক স্বপ্নপূরণের যুদ্ধ, স্বপ্ন-জাগানো যুদ্ধ। এ অঞ্চলের আর কোনো যুদ্ধ এতটা লিপিবদ্ধ হয়নি।
এ যুদ্ধ নিয়ে কাহিনী-উপাখ্যান-প্রকাশনার শেষ নেই। স্বপক্ষ-প্রতিপক্ষ-সহায়ক-সমবেদনাকারী-নির্লিপ্তরা সবাই এ যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন, লিখে যাচ্ছেন। এ ধারাবাহিকতায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনন্যা প্রকাশিত ধীরাজ কুমার নাথের (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা) ‘শরণার্থী শিবির ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ আরেক তৃপ্তিদায়ক প্রয়োজনীয় সংযোজন।
পৌনে দুশ’ পৃষ্ঠার আটটি অধ্যায়য়ের বইটিতে মিলবে ওই যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী একজনের জবানি। ১৭ এপ্রিলে যে প্রবাসী সরকারের যাত্রা শুরু হয়, ধীরাজ নাথ তার সঙ্গে প্রায় শুরু থেকেই যুক্ত। তিনি ছিলেন প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামানের একান্ত সচিব। তার বইয়ের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়টি পুরোপুরি শরণার্থীদের বিষয় নিয়ে লেখা; আর সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায় দুটি প্রবাসী সরকারের কর্মকাণ্ড, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত তথা যুদ্ধে জয় ও শরণার্থীদের দেশে ফেরার কাহিনী। চতুর্থ অধ্যায়ে পূর্ব বাংলায় যুদ্ধকালীন চালচিত্র, পঞ্চম (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ‘মহাকাব্যিক’ ভাষণের মূল কথা) ও ষষ্ঠ অধ্যায় ধারণ করে আছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ও ক্রমবিকাশ ইত্যাদি।
বইটির অন্যতম আকর্ষণের উৎসর্গপত্র: ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কালে যেসব মুক্তিকামী মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে চরম অবহেলা ও যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন এবং রোগেশোকে অন্ন্যভাবে শরণার্থী শিবিরেই দেহত্যাগ করেছেন, অথচ বাংলাদেশের অর্জিত স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি তাদের পুণ্যস্মৃতিকে স্মরণ করে’। শিবিরেই যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের জন্য এই ধরনের অপূর্ব কথার স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ক’জনই বা করেছেন।
একজন অংশগ্রণকারীর জবানিতে এ বইয়ের পাঠে অন্য রকম মজা। সব পাঠক তার সব মতামত ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত হবেন না; কিন্তু এ বই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা অন্য অনেক বইয়ের সঙ্গে সুনিশ্চিতভাবে ইতিহাস রক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করবে। ভবিষ্যতে ঐতিহাসিকরা যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পুরো ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে নামবেন, বাকিগুলোর সঙ্গে এবইটিও তাদের কাছে অতিপ্রয়োজনীয় লাগবে।
কিছু দুর্লভ চিত্র বইটির মূল্য বাড়িয়েছে। সপ্তম অধ্যায়ে (প্রবাসী সরকারের যাত্রা শুরু) মেহেরপুরের আমবাগানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও তার মন্ত্রিসভাকে তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর ব্যবস্থাপনায় মাহবুব উদ্দীন আহমেদের দেয়া গার্ড অব অনার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আওতায় প্রশাসনিক অঞ্চলভাগ, সামরিক নায়কদের অঞ্চল চিহ্নিতকরণ, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের চালুকরণ (প্রধানমন্ত্রীর কথায়: .. ‘মেজর জিয়াউর রহমান একটি বেতার কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে আপনারা শুনতে পান স্বাধীন বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর। এখানেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়’), তার স্বাধীন বাংলা বেতারে রূপান্তর, সে বেতারের অনুষ্ঠানমালার শিল্পীদের উল্লেখ, পুরো সরকারে সামরিক ও বেসামরিক কর্তাদের অবদান, আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দলিল ও তার অনুবাদ, একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত প্রায় আট পৃষ্ঠার পুরো বক্তব্য- এসবের সমাহারে লেখক বইয়ের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। বাংলাদেশকে দেয়া ভারত প্রজাতন্ত্রের স্বীকৃতিধারক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পত্রও এতে মিলবে: যুদ্ধের প্রায় পুরো নয় মাস দেশের ভেতরে-বাইরে সবারই প্রশ্ন ছিল- দিল্লির স্বীকৃতি কেন আসছে না; শ্রীমতি গান্ধীর এ পত্র শেষমেশ সেই প্রশ্নের আনন্দদায়ক সমাপ্তি ঘটায়।
শরণার্থী শিবিরে যারা মারা গেছেন, তারাতো নিছক সংখ্যা হয়ে আছেন। ধীরাজ নাথের এ বইটির পরে এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে ওই অজানাদের সঠিক নাম-সংখ্যা সংগ্রহ করে তাদের যথাযথ শহীদের মর্যাদাদান। হ



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত