গৌতম কুমার রায়    |    
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মা ইলিশ সংরক্ষণে বাইশ দিন

২০১৪ সালের ৫ থেকে ১৫ অক্টোবর ব্যাপকভাবে পালিত হল মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান। ওই সালেরই ১৬ অক্টোবর ঢাকা যেতে পাটুরিয়া ফেরিতে ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে দেখে এগিয়ে গেলাম। মাছ দেখে চোখ ছানাবড়া। তিনটি ইলিশ। প্রতিটি ইলিশের পেট ভরা ডিম। বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন ধরা পড়ছে ইলিশ? বিক্রেতা বললেন, ঝাঁকে ঝাঁকে। বললাম, সব মাছেই কি ডিম? বিক্রেতা বললেন, হু। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হল। ১১ দিনে কত কষ্ট করে শিলাইদহ পদ্মার ইলিশ ধরা বন্ধ রেখেছি। অথচ এখনও ইলিশের পেটে ভরা ডিম। এরপর গণমাধ্যমের বদৌলতে জানলাম ঝাঁকে ঝাঁকে পদ্মা থেকে যমুনা কিংবা মেঘনা সব নদীতেই ইলিশ ধরা পড়ছে। তখনও প্রায় প্রতিটি মা ইলিশের পেট ভরা ডিম। আমি মা ইলিশ সংরক্ষণের সময় বাড়িয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিনীত অনুরোধ জানিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লিখলাম।

দেশে ঢালচর, মনপুরা, মৌলভীরচর ও কালিরচর দ্বীপ সব মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইলিশের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র এবং পরিবেশ প্রভাবিত ৫টি প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। ২০১৬ সালে দেশের জলে জলে ইলিশের যে বিশাল বিচরণ তার পেছনে ছিল সুনিপুণ পরিকল্পনা, কৌশল এবং নিয়ন্ত্রিত কর্মযজ্ঞ পরিচালনা। যার কারণে ইলিশ ধরা পড়েছে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ।

মৎস্যসম্পদে এককভাবে ইলিশের অবদান সবচেয়ে বেশি। ২০১৪-১৫ সালে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ৩.৮৭ লাখ টন। বাজারে এ পরিমাণ ইলিশের মূল্য ছিল ১৫ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতিতে যার অবদান ১৩ ভাগ, জিডিপিতে অবদান ১.২৫ ভাগ। অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি মানবদেহের প্রয়োজনে ইলিশের অবদান কম নয়। কেননা প্রতি ১০০ গ্রাম ইলিশে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ .১৮ গ্রাম, ফসফরাস .২৮ গ্রাম, লৌহ ২১৩ মিলি গ্রাম পাওয়া যায়। এছাড়া এ মাছে রয়েছে অ্যাশ ২.২ ভাগ, জল ৫৩.৭ ভাগ, বডিফ্যাট ১৯.৪ ভাগ এবং প্রোটিন ২১.৮ ভাগ। যেজন্য ইলিশ স্বাদ ও মুখরোচক খাদ্য হিসেবে বিশেষ করে বাঙালির কাছে খুবই প্রিয়।

সাধারণত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ইলিশ বছর পেরিয়ে পরিপক্বতা পায়। বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া এবং পরিবেশের ওপর যেমন- আলো, তাপমাত্রা, জলের গভীরতা, স্রোত এবং প্লাংক্টনসমৃদ্ধ খাবার প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে কোনো কোনো ইলিশ ৮ থেকে ১০ মাসেও পরিপক্ব হয়। পরিবেশগত কারণে প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ও স্ত্রী ইলিশের অনুপাত আলাদা হলেও সাধারণ নিয়মে এ অনুপাত ১:১ হয়ে থাকে। ইলিশের স্বাচ্ছন্দ্যময় প্রজননে দরকার আবাস নিরাপত্তা, গভীরতা এবং জলের স্রোত এবং সহনশীল তাপমাত্রা। প্রজনন সময়ে ইলিশ সমুদ্রের প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট গভীরতা থেকে ক্রমে ক্রমে জলস্রোতের উজানে উঠতে থাকে। মোহনার ৮০ থেকে ১০০ ফুট গভীরতাকে অতিক্রম করে ইলিশ প্লাংক্টনসমৃদ্ধ জলরাশি বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চল হয়ে দিন দিন পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রূপসা, যমুনা, মেঘনা, পদ্মা হয়ে ফারাক্কা বাঁধের আগ পর্যন্ত এবং মধুমতি, গড়াই ইত্যাদি নদীতে উঠে আসে। যত ওপরে উঠে আসে ততই ইলিশের জীবনের ঝুঁকি বাড়ে। সমুদ্র থেকে নদীর উজান মুখে আসার সময় খাবার, গভীরতা, স্রোত এবং তাপমাত্রা কমতে থাকে। যদিও প্রজনন ঋতুতে ইলিশ খাদ্য গ্রহণ করে না। নদীতে ভালো পরিবেশ পেলে পরিপক্ব ডিমের ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ ডিম ছেড়ে দেয়। অবশিষ্ট ডিম অনেক সময় ৩ থেকে ৫ মাসের ব্যবধানেও ছাড়তে পারে। ভালো পরিবেশ অব্যাহত থাকলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যেও দ্বিতীয়বার ডিম ছাড়তে পারে। ইলিশ বছরে ২ থেকে ৩ বার ডিম দেয়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, পরিপক্ব মা ইলিশ বেশি বেশি ইলিশ উৎপাদনে অবদান রাখে। মা ইলিশ একবার ৫ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। তবে ডিম্বকোষের সব ডিম একসঙ্গে পরিপক্ব হয় না। পরিপক্ব ডিম ছেড়ে দেয়ার পর ডিম্বকোষে যে পরিমাণ অপরিপক্ব ডিম অবশিষ্ট থেকে যায় তা পরবর্তী সময়ে হ্যাচ করে থাকে। এরপরও যে ডিম অপরিপক্ব অবস্থায় ডিম্বকোষে থেকে যায় তা এক সময় মাছের শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। এ কারণে মা ইলিশ তখন খাবার খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। আমাদের জানা দরকার ২ বছরের বেশি বয়সের ইলিশ সবচেয়ে বেশি পরিপক্ব ডিম দেয়।

প্রজননের সময়ে ইলিশ তার গন্তব্যের দিকে তীব্র গতিতে এগোতে থাকে। এসময় কোনো বাধার সম্মুখীন হলে স¤পূর্ণ ডিম পরিপক্ব করে ছাড়তে পারে না। উজানে যেতে বাধা পেয়ে থাকে বলে এসময় ইলিশের আকার ছোট হয়ে যায়। তবে ছোট হলেও বয়সের ব্যবধানের কারণে তার গর্ভ ধারণ হয়। যেজন্য ফারাক্কার ভাটিতে নদী মোহনা পর্যন্ত এলাকায় পেটে ডিম ভর্তি ছোট ইলিশ পাওয়া যায়। ইলিশ মাছের বৈশিষ্ট্য হল যেখানে জন্ম নেয়, সেখানে আবার ডিম ছাড়তে ফিরে আসে। মূলত ইলিশ যত বেশি সময় মিষ্টি জলে থাকবে, তত বেশি ফ্যাট প্রিজার্ভ করবে এবং বেশি সুস্বাদু হবে।

বৈরী জলবায়ুর কারণে দিন দিন ইলিশের ডিম্বকোষে ডিম ধারণক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। নদীর নব্য কমে যাচ্ছে, মিষ্টি জলে বর্জ্যরে বিষাক্ততা বাড়ছে। নদীতে চাদরের মতো অবৈধ জালে ইলিশ এবং জাটকা নিধন চলছে, চর সৃষ্টি হয়েছে, ঘোলা জলসহ ইত্যাদি কারণে ইলিশের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

মা ইলিশ সংরক্ষণের মাধ্যমে আমাদের ইলিশ সম্পদকে আরও সম্প্রসারণ করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়বে। পূর্ণিমার আগে ৩ দিন এবং অমাবস্যার পরে ৩ থেকে ৫ দিনসহ পূর্ণিমা এবং অমাবস্যার মাঝখানের ১৫ দিন ধরে মোট ২০ থেকে ২৫ দিন মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান অব্যাহত রাখা গেলে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ মা ইলিশের ডিম পরিপক্ব অবস্থায় জলে পাওয়া সম্ভব হবে। বিষয়টি মৎস্য অধিদফতর গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। যে কারণে ২০১৫ সাল থেকে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ১১ দিনের পরিবর্তে ১৫ এবং পরে ২২ দিন পালিত হচ্ছে। চলতি ১ থেকে ২২ অক্টোবর ২০১৭ সময়ের ২২ দিনের মা ইলিশের রক্ষার অভিযান চলছে। এ কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে অবদান রাখছে জেলে সম্প্রদায়, মৎস্য বিভাগ, নেভি, কোস্টগার্ড, প্রশাসন, আনসার, পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মীসহ দেশের জনগণ। মা ইলিশ সংরক্ষণের বিশেষ এ অভিযানে ডিমের পরিমাণ যেমন বাড়বে তেমনি বাড়বে ইলিশ উৎপাদনও।

লেখক : গবেষক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত