যুগান্তর ডেস্ক    |    
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
অবশেষে ‘বঙ্গ বাহাদুরের’ মৃত্যু
এলাকাবাসীর বিক্ষোভ : ৩ সদস্যের কমিটি গঠন
কাদা পানিতে পড়ে থাকা মৃত হাতিটি। মঙ্গলবার তোলা ছবি -যুগান্তর

কখনও নদী, কখনও ডাঙায়, কখনও বা চরে ছোটাছুটি। আবার কখনও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা। তাকে দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় দিন ও রাতে। বিশাল এ প্রাণীকে দেখতে দেখতে তার প্রতি মায়া জন্মে যায় অনেকের। বন্যাদুর্গত চরজনপদের মানুষের ঘরে খাবার নেই, অথচ তাদের বাড়ির কলাগাছ কেটে খেতে দিয়েছে হাতিটিকে। তাকে কেন্দ্র করে যেন ছড়িয়ে যায় উৎসবের আমেজ। কিন্তু হঠাৎ বিষাদের ছায়া। দু’মাস আগে ভারতের আসাম থেকে আসা বন্যহাতিটির অবশেষে মৃত্যু হয় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টায়। এর মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটল হাতিটির ৬১ দিন বাংলাদেশে অবস্থান। হাতিটির এমন মৃত্যু মানতে পারছে না মানুষ। যাকে আদর করে নাম দেয়া হয়েছিল ‘বঙ্গ বাহাদুর’। বঙ্গ বাহাদুর পোষ মানা হাতি নয়। তাও আবার প্রতিবেশী দেশ থেকে বানের পানিতে ভেসে আসা। এই বানভাসি হাতিটিকে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর মানুষ মোটেও ভিনদেশী বলে গ্রহণ করেননি। বরং আপন করে নিয়েছিলেন। সরিষাবাড়ী উপজেলার কামরাবাদ ইউনিয়নের সোনাকান্দ গ্রামে খোলা জায়গায় হাতিটির শরীরে তাপমাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তার মৃত্যু হয়।

হাতিটির মৃত্যুতে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার মানুষ। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের রৌমারীর মানুষ। হাতিটিকে পেয়ে তারা যেমন খুশি হয়েছিলেন, তেমনি মারা যাওয়ার খবরে মর্মাহত হয়েছেন। চেতনানাশক ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং বন কর্মকর্তাদের অবহেলা হাতিটির মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন তারা। তবে দীর্ঘ পথপরিক্রমার শ্রান্তি, উপযুক্ত খাদ্যের অভাব, মানসিক চাপ ও জলজ পরিবেশের কারণে হাতিটির মৃত্যু হয়েছে বলে জানান এই হাতিটি উদ্ধারের সঙ্গে জড়িত বন কর্মকর্তা তপন কুমার দে এবং অসীম মল্লিক।

মেডিকেল টিম : হাতিটি ময়নাতদন্তের জন্য ৩ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রয়েছেন- কক্সবাজার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী চিকিৎসক ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী চিকিৎসক ভেটেরিনারি সার্জন ডা. নিজাম উদ্দিন ও সরিষাবাড়ী পশুসম্পদ অফিসের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. বিদ্যুৎ কুমার সাহা।

দীর্ঘ পথপরিক্রমা যেভাবে : ভারতের আসাম রাজ্যের কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের হাতিটি ১৭ জুন দলছুট হয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে আসে। পরে গাইবান্ধা, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ হয়ে ২৭ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার ছেন্নার চর যমুনা নদীর দ্বীপে আটকে পড়ে হাতিটি। এখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর ২৮ জুলাই স্থান পরিবর্তন করে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়াচ্ছিল এ হাতি।

উদ্ধার তৎপরতা : হাতিটি উদ্ধারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিল বাংলাদেশের বন বিভাগের ৩টি ইউনিটের ১৭ সদস্যের দল। সোমবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে হাতিটি কাদাপানিতে লুটে পড়ে গড়াগড়ি করতে থাকে। এ সময় হাতির শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পানি দিতে থাকে বন বিভাগের সদস্যরা। হঠাৎ করে সন্ধ্যার পর হাতিটি জ্ঞান হারায়। সোমবার সারারাত অচেতন অবস্থায় কাদাপানিতে পড়ে থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে হাতিটির মৃত্যু হয়। হাতিটি কাদাপানিতে থাকাবস্থায় শরীরে পানি দেয়া ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বন বিভাগের সাবেক উপবন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে বলেন, হাতিটি বাঁচানোর জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই করা হয়েছে। এতে বন বিভাগের সদস্যদের কোনো অবহেলা ছিল না। হাতিটির শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্ট্রোক করে তার মৃত্যু হয়েছে।

রাজশাহী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী সার্জন ডা. সোহেল রানা বলেন, ‘হাতিটি যখন ব্রহ্মপুত্র নদের রৌমারী রাজীবপুরে অবস্থান করছিল তখন পর্যবেক্ষণে ছিলাম আমি। আসলে পানির সঙ্গে লড়াই করে হাতিটির এতদিন বেঁচে থাকা একটি বিরল ঘটনা। কেননা সঙ্গীহীনভাবে পানিতে চরে চরে ঘুরে প্রয়োজনীয় খাবার না পাওয়ায় এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল হাতিটি। উদ্ধারের পর বারবার ট্রাংকুলাইজার করা, টানাহেঁচড়া, কাদামাখা গরম পানিতে শিকলে বেঁধে রাখার কারণেই হাতিটি মারা গেছে- এমনটাই মনে হচ্ছে।’

রৌমারী প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক রাজু বলেন, ‘বন্যাদুর্গত চরজনপদের মানুষের ঘরে খাবার নেই, অথচ তারা বাড়ির কলাগাছ কেটে খাবার দিয়েছে হাতিটিকে। আসলে বানের পানিতে ভেসে হাতিটি নদীতে অনেকদিন ধরে ভাসছিল। এ কারণে দেশের মানুষের মায়া জন্মেছিল। আর সেটি মারা যাওয়ার পর তারা কষ্ট পেয়েছে।’

এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে হাতিটিকে মাটিতে পুঁতে ফেলার কাজও শেষ হয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরি করতে সহযোগিতা করেছেন সরিষাবাড়ী, দেওয়ানগঞ্জ, জামালপুর ও রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত