যশোর ব্যুরো, মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর প্রতিনিধি    |    
প্রকাশ : ২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পানিবন্দি ভবদহের মানুষ
টানা বর্ষণে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

কয়েক দিনের টানা বর্ষণে ভবদহ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অসহায় মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তার পাশে টংঘর ও আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। মাছের ঘের ভেসে গেছে। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার (ভবদহ অঞ্চল) জলাবদ্ধ এলাকায় কয়েকশ’ কোটি টাকার মাছ, ফসল, বাড়িঘর ও সড়কের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ অঞ্চলের নদী ও খালের পলি অপসারণে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) চালু না হওয়ায় এবারও স্থায়ী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে মনিরামপুর উপজেলার অন্তত ৯ ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শ্যামকুড় ইউনিয়নের হাসাডাঙ্গা, আমিনপুর, নাগোরঘোপ, চিনাটোলা, শ্যামকুড়, জামলা, মুজগুন্নি, হালসা, ঘুঘুরাইল, আগরহাটি, তেঘরি, সৈয়দ মোহাম্মদপুর ও বাঙ্গালীপুর; খানপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভরতপুর, ঘুঘুদা, গোপালপুর, শেখপাড়া; দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের দূর্বাডাঙ্গা, কুশখালী, হরিণা ও কোনাকোল; কুলটিয়া ইউনিয়নের সুজাতপুর, হাটগাছা, বাজেকুলটিয়া; চালুয়াহাটি ইউনিয়নের গৌরিপুর, রতনদীয়া, রত্নেস্বরপুর, আটঘার ও গুপিকান্তপুর; হরিদাসকাটি ইউনিয়নের নেবুগাতী, পাঁচকাটিয়া, ভুলবাড়ি ও কুচলিয়া; মনোহরপুর ইউনিয়নের খাকুন্দি, বাজিতপুর, ভবানিপুর, মনোহরপুর ও কপালিয়া; মশ্মিমনগর ইউনিয়নের চাকলা, হাকিমপুর ও পারখাজুরা এবং হরিহরনগর ইউনিয়নের ডুমুরখালী গ্রামের হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘর ছেড়ে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কে আশ্রয় নিয়েছেন। ফসল, মাছের ঘের ও বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। টানা বর্ষণে মনিরামপুরে ১৩৬৫ হেক্টর জমির ফসল, ৪৬৩টি মাছের ঘের ও বিস্তীর্ণ প্লাবিত হয়েছে। ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্ধশতাধিক কাঁচা বাড়ি ভেঙে গেছে। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিল কেদারিয়ার সততা মৎস্য খামারের সভাপতি শাহাজাহান আলী বলেছেন, মুক্তেশ্বরী নদী ও টেকা নদী এবং জবরডাঙ্গা খাল দখল করে পাটা স্থাপনের কারণে বৃষ্টির পানি সরছে না। ফলে সেটি বিল কেদারিয়ায় ঢুকে পড়ে ঘের ভেসে যাচ্ছে। যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কে টোঙ (খুপড়ি) ঘরে আশ্রয় নেয়া হাসাডাঙ্গা গ্রামের সালেহা জানান, পানির চাপে তার কাঁচা ঘরটি ধসে পড়েছে। নাগোরঘোপ স্কুলে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা সোহরাব হোসেন জানান, ঘরে হাঁটুপানি, তাই বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়েছি। শ্যামকুড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘হরিহর নদীর পানি দেড়ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। এই পানি তীরবর্তী এলাকায় ডুকে পড়ায় ইউনিয়নের ১৩টি গ্রামের প্রায় ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাড়িঘর ছেড়ে ২শ’ পরিবার স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে।

অপরদিকে অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের মাগুরা, জিয়াডাঙ্গা, বনগ্রাম, চেঙ্গুটিয়া ও বালিয়াডাঙ্গা, সুন্দলী ইউনিয়নের রাজাপুর, রামসরা, আড়পাড়া, হরিসপুর, ফুলেরগাতি, গোবিন্দপুর, সড়াডাঙ্গা, ডহর মশিয়াহাটি, ডাঙ্গা মশিয়াহাটি গ্রাম। পায়রা ইউনিয়নের দিঘলিয়া, বারান্দি, আড়পাড়া, পায়রাসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলায় দুই হাজার ৭৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৪০টি কাঁচা বাড়িঘর ধসে গেছে। এ ছাড়া তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির মধ্যে এক হাজার ছয়শ’ হেক্টর আউশ, ৭শ’ হেক্টর আমন, সবজি ৩৫০ হেক্টর, আমন বীজতলা ৩৪০ হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। প্রায় ২৫শ’ হেক্টরের সাড়ে চার হাজার মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কেশবপুর উপজেলার ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে পাঁচ হাজার মাছের ঘের ও পুকুর। এতে প্রায় ৩২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের মনোরঞ্জন বৈরাগী জানান, বাড়িতে হাঁটুপানি জমে গেছে। ঘরের ভেতর জল ঢুকে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তাই রাস্তার ওপর ঝুপড়ি বাঁধছি। স্থানীয় ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সমির বৈরাগী জানান, আমার ওয়ার্ডে সাতশ’ পরিবার জলে ডুবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঘের ব্যবসায়ী ধোপাদি গ্রামের আবদুর রহিম বলেন, ‘সাত বিঘা জমিতে তিনটি ঘের রয়েছে। সব কটি ঘের ডুবে গেছে। গত বছরের লোকসান কেটে উঠতে পারেনি, এ বছর আবারও ঘের ডুবে যাওয়ায় আমার পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না।’

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, বিল কপালিয়ায় টিআরএম চালু না হওয়া, টেকা, মুক্তেশ্বরী নদী ও ভবদহ সংশ্লিষ্ট খাল থেকে পলি অপসারণে পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) কার্যকর ভূমিকা না নেয়ায় এবার বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতি অতীতের রেকর্ড অতিক্রমের আশঙ্কা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর গোস্বামী মুঠোফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মাজেদুর রহমান খান বলেন, ইতিমধ্যে কেশবপুর উপজেলায় ১০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মনিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নেতৃত্বে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পর্যবেক্ষণ চলছে। তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হবে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত