ডা. সাঈদ এনাম    |    
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২৩:০৩:৩৫ প্রিন্ট
গ্রামের পোস্টিং
দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সোহেল ইমাম খান, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃপঃ কর্মকর্তা সাইকিয়াট্রিস্ট লেখক ডা. সাঈদ এনাম এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুল আলম
আমার প্রথম কর্মস্থল ছিল সিলেট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায়। মনু উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ২০০৫ সালের  ২ জুলাই (২৪তম বিসিএস)।  হেলথ কমপ্লেক্সে যোগদান দিয়ে পরের দিন সকালে একটা সিএনজি রিজার্ভ করে কর্মস্থলে যাই।
 
ব্রিটিশ আমলের একটি জরাজীর্ণ আধা পাকা ঘর। উপরে টিনের চালা। বেইজ অব দ্য স্কালের মতো অসংখ্য ছিদ্র যা দিয়ে আলোর ঝিলিক আর বৃষ্টির জল টেবিলে খেলা করতো। ফ্যান,লাইট কিছুই নেই। রোগী বসার জন্য বেঞ্চও নেই। চেয়ার টেবিল যা আছে সব আধা ভাঙা। স্টাফ বলতে অফিস সহকারী প্রয়াত ইসমাইল সাহেব, চিকিৎসা সহকারী প্রবীণ ব্যক্তি হোসেন আহমদ। দুজনেই অত্যন্ত ভদ্র গোছের মানুষ। 
 
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার এখানে আসবেন, থাকবেন? আমি চমকে গেলাম। 
 
আসবো মানে আমার পোস্টিং তো এখানে। উনারা বললেন, না স্যার এখানে কেউ আসলে থাকেন না, জয়েন করে চলে যান। কেউ হেলথ কমপ্লেক্সে ডিউটি করেন আবার কেউ বদলি নিয়ে ফের ঢাকা। 
 
আমি বললাম, ‘না- আমি থাকব। অবশ্যই আসবো এবং কাল থেকেই।’ 
 
আসার সময় অফিস সহকারী আমাকে এগিয়ে দিলেন। বলে দিলেন সদর থেকে আসার সবচেয়ে সহজ উপায়।
প্রথমে রিক্সাযোগে কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশন। এরপর রেলযোগে ২০ কিমি. গেলে মনু স্টেশন। সেখান থেকে কিছুটা পথ রিক্সা দিয়ে মনু নদীর তীর ঘেঁষে মিনিট পাঁচেক গেলেই আমার সাব সেন্টার।
 
সেই যে যাওয়া শুরু করলাম। প্রতিদিন যেতাম। আমার যাওয়াতে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠে সাব সেন্টারটি। প্রথমে ৪/৫ পরে ২০/২৫ জন অতঃপর দেড়শ’ থেকে দুইশত রোগী আসা শুরু হয়।
 
প্রথম মাসের বেতন দিয়ে টিনের চালা মেরামত করি। একটি চেয়ার দুটো বেঞ্চ আর একটা সিলিং ফ্যানসহ কিছু পর্দা কিনে পুরুষ মহিলা আলাদা আলাদা করার জন্য। সেন্টার টি চুনকাম করাই।
 
প্রতিদিন যেতে কিছুটা দেরি হতো কিন্তু গ্রামের অসহায় মানুষগুলো দেরি করত না। তারা সকালে এসেই সিরিয়াল নিত।
 
রন্টু মালাকার নামের একটা ছেলে রাখি রোগীদের সিরিয়াল মেনটেইন করা আর রাতে সেন্টার পাহারা দেয়ার জন্য। সেই ছেলেটি এখনও আছে।
 
বেশিরভাগ রোগী গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের। ওরা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ওদের ভালোবাসার মায়ার জালে আমি বন্দি হয়ে যাই। আর বলা যায় ওদের ভালোবাসার টানেই আমি প্রতিদিন যেতে শুরু করি। 
 
আমার ষাটোর্ধ ১০-১৫ জন ‘ছেলেমেয়ে’ ছিল। আমার ছেলেমেয়ে মানে ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা যাঁরা আমাকে ‘আব্বাজান’ বা ‘বাজান’ বলে ডাকতেন। 
 
আমার ট্রেন আসার হুইসেল শুনলেই তারা বলতেন ‘আমাগো বাজানের ট্রেন আইয়া পড়ছে জলদি লাইনে খাড়াও’। 
 
আমি এসে দেখতাম লোকগুলো ধীর স্থিরভাবে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের কারো হাতে পাকা পেঁপে, কারো হাতে নিজের ফলানো সবজি, কেউবা নিজের পুকুরের বড় মাছ।  এগুলো সব ভালোবাসার দান।
একবার এক নবজাতক নিয়ে বেশকিছু লোক হাজির। তিন দিন বয়সী শিশুটির চুল ছাঁচছিলেন মা। এ সময় আরেকটি বাচ্চা এসে পড়ে যায় হাতের উপর।  ধারালো ব্লেডে নরম মাথার চামড়া এফোঁড়ওফোঁড়। সারা গা রক্তে লাল। 
 
সেই সাত গ্রাম পেরিয়ে এসে বাচ্চা সহ সবাই আমার সাব সেন্টারে। পাশাপাশি আরো পঞ্চাশেক উৎসুক আকাইম্মা। 
 
সদর হাসপাতাল সে তো আরো তিন ঘন্টা। কিন্তু ওরা যাবে না। সবার এক কথা মরলে আমার হাতেই মরবে বাচ্চা। কী আর করা! রন্টুকে বললাম লাগা কেটগাট (এটা দিয়ে পাতলা চামড়া সেলাই করা হয়)। ডাক হোসেন সাহেব আর ইসমাইল সাহেবকে। কিছু সুচার মেটেরিয়েল (চাকু) আমার সঙ্গে রাখতাম। 
 
ঢাকা মেডিকেলে ইন্টার্নি করার সময় স্যাররা উপদেশ দিতেন। উপদেশ কাজে আসে। দপাদপ ১০/১২টা সুচার। ব্লিডিং এরেস্ট ছিল। যাও কিছু ব্যবহৃত ছিল তা-ও বন্ধ। 
 
শিশুর মাকে বললাম ধুমাইয়া বুকের দুধ খাওয়ান। বাচ্চাটি ধীরে ধীরে সেরে উঠে। দশ গ্রামে নাম রটে আমার সাব সেন্টারের। এলকা রটে গেল ‘নতুন ডাক্তার কাটা মাথা জোড়া দিয়ে দেয়’।
 
সেই শিশু মেয়েটিকে নিয়ে কয়েকদিন আগে তার মা আসে আমার শহরের বাসায়। আমি প্রথমে চিনিনি। বড় হয়ে গেছে বেশ। কাছে টেনে নিয়ে মাথার চুল সরিয়ে নিয়ে তার সেই জায়গাটা হাত বুলালাম। একটা ছবি তুলে রাখলাম।
 
দুই.
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ইয়ামিস আলী লাঠি ভর দিয়ে প্রতিদিন আসতেন। আমি জানতে চাইতাম, চাচা আপনি প্রতিদিন কেন আসেন?
 
তিনি বলতেন, বাবা আপনাকে আর আমাদের হাসপাতালটাকে দেখতে আসি। আমাদের ছোটবেলায় এই হাসপাতালে অনেক নামিদামী ডাক্তার আসতে দেখতাম। অনেক ভিড় থাকত। এখন দেখি দিন দিন সে রকমই হয়ে যাচ্ছে!
 
ইয়ামিস আলি এখনো সময় পেলে আমার বাসায় আসেন। সেদিন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের তার একটি কাগজ সত্যায়িত করতে বাসায় আসেন।
 
তিন.
হঠাৎ একদিন এক পত্রিকাওয়ালা হাজির আমার সাব সেন্টারে। আপনার নামে নিউজ আসছে পত্রিকায়। আমি একটু চমকে গেলাম। আমার নামে নিউজ কেনো। নিয়মিত যাওয়াতে যদিও স্থানীয় কিছু পল্লী চিকিৎসকদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছিল। কিন্তু তাদেরতো এমন দুঃসাহস হবে না আমার বিরুদ্ধে পত্রিকায় কিছু উল্টো পাল্টা নিউজ করানোর।
 
পত্রিকা হাতে নিলাম। একটি জাতীয় দৈনিক। দেশের নিউজের অংশে আমার সাব সেন্টারকে নিয়ে বিশাল নিউজ। নেগেটিভ নয়, পজেটিভ। নিউজটি করেন আমার এক সময়ের শিক্ষক ও উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সুশীল সেন গুপ্ত স্যার। 
 
এটি করার কারণ প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বললেন,  হাসপাতালের উন্নতি প্রয়োজনে এটি সাহায্য করবে।’
 
পরে পত্রিকার নিউজ পড়ে ফোন দেন লন্ডনে নিযুক্ত তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। তিনি উৎসাহ দেন। আমি সেন্টারের জমি সংক্রান্ত কিছু সমস্যা তুলে ধরলে তিনি বলেন আগামী মাসে আমি দুেই সপ্তাহের ছুটিতে আসবো, তখন তোমার সেন্টার ভিজিট করবো আর আপাতত আমি ডিসিকে বলে দিচ্ছি। তুমি ওর সঙ্গে দেখা করবা।
 
আমি অবশ্য আমার সিভিল সার্জন স্যারের অনুমতি নিয়ে ডিসি মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।
 
কিন্তু সমস্যাটি ছিল সাব সেন্টারের আওতাধীন কিছু জমি নিয়ে। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এ দখলের পায়তারা করছিলেন। কিন্তু আমি অনঢ় থাকায় সুবিধা করতে পারছিলেন না তিনি। 
 
প্রায় ১৭ মাস ছিলাম ওখানে। পোস্ট গ্রাজুয়েশনে চান্স পেয়ে যাই। ডেপুটেশনের অর্ডারও হয়। চলে আসি মেডিকেল কলেজে।

চার.
আমার বিদায় ছিল আবেগ মিশ্রিত, কান্নাজড়িত। গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আমায় আসতে দেবে না। তারা কাঁদতে কাঁদতে আমার টিএইচও স্যারের কাছে যায় বদলি বাতিল করতে। আমার টিএইচও স্যার ওদের বুঝিয়ে বলেন, ওতো বড় ডাক্তার হতে চায়। গ্রামে থেকে বড় ডাক্তার হওয়া যায় না। ও বড় হয়ে,স্পেশালিস্ট ডাক্তার হয়ে আবার ফিরে আসবে। 
 
সেদিন আমিও কেঁদেছিলাম। ফ্রম ঢাকা মেডিকেল টু মনু উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র। আমার একটুও খারাপ লাগেনি দিনগুলো; বরং এনজয় করেছি। ঝড়, বাদল সাপ বিচ্ছু আমার সেন্টারেও ছিল। আমি দমে যায়নি। অসহায় অবহেলিত গ্রামবাসীদের ভালোবাসার কাছে এসবের হার মানতে হয়েছে। আমি এখনো সুযোগ পেলে ওই এলাকায় যাই। 
 
দেখে আসি আমার বুড়ো বুড়ো ছেলেমেয়ে রহিমুদ্দিন, সলিমুদ্দিন, নারায়ণ আর দীপিকাদের। 
 
ওরা এখনো আমাকে ‘বাজান’ বলেই ডাকে। 
 
নতুন ডাক্তারদের প্রতি আহ্বান: নতুন এ বছর যারা যোগদান করছো বা করবে অনুজদের প্রতি আহ্বান, ভয় আর সব প্রতিবন্ধকতাকে পায়ে দলে তোমরাও এগিয়ে যাও আমাদের মতো সব সময়।
 
স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের অর্জনকে এগিয়ে নিয়ে যাও আরও  অনেক দূর। 
 
লেখক: ডা. সাঈদ এনাম (ডিএমসি, কে -৫২), সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যান্ড ইউ.এইচ.এফ.পি.ও সিলেট।

আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত