logo
চৈত্রের তাপে পুড়ছে দেশ
পহেলা বৈশাখেও থাকবে দাবদাহ
    |    
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল, ২০১৬ ০৮:৪৮:৫৮
চৈত্রের তাপে পুড়ছে দেশ। জনজীবন হয়ে উঠছে ওষ্ঠাগত। দেশের বেশির ভাগ এলাকায় এখন বইছে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ।

রোববার কুষ্টিয়া অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। সোমবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাবনা ও যশোর অঞ্চল। অন্য অঞ্চলেও মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কাল বাদে পরশু পহেলা বৈশাখ। আবহমানকাল ধরে বাঙালি এই দিনটি মহাধুমধামে উদযাপন করে থাকে।

অনেকেই নববর্ষের অনুষ্ঠানাদিতে যান। কিন্তু দিনটি সামনে রেখে আবহাওয়াবিদদের পক্ষ থেকে কোনো সুখবর নেই। তারা বলছেন, চলমান তাপপ্রবাহ পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত চলতে পারে। আবহাওয়া অধিদফতরের (বিএমডি) তথ্য অনুযায়ী, মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়, যা মানুষের মনে আশা জাগিয়েছিল। এখন রেকর্ড বলছে, গেল এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে তাপমাত্রা বাড়ছে।

গত ৫ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র সাত দিনে তাপমাত্রা বেড়েছে ৬.৪ ডিগ্রি। এই সাত দিনে রাজধানী ঢাকায়ও তাপমাত্রা বাড়ে ৫ ডিগ্রির বেশি। এ সময় বৃষ্টিপাত একেবারে হয়নি বললেই চলে। বিশেষ করে ঢাকায় মানুষ বৃষ্টি-মেঘের দেখা পায়নি। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তাপপ্রবাহ। বাতাসে জলীয়বাষ্পের প্রভাব বেশি। সূর্যের কিরণ অতিপ্রখর। সব মিলিয়ে বেড়েছে গরমের অনুভূতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উত্তাপ বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। বিশিষ্ট পরিবেশবিজ্ঞানী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত যুগান্তরকে বলেন, ‘চৈত্রে পিচগলা রোদ্দুর থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। বর্তমানে যে তাপানুভূতি, তা অ্যাবসোলিউটলি নরমাল (পুরোপুরি স্বাভাবিক)।’

এ প্রসঙ্গে অবশ্য বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত চৈত্রে গরম একটু বেশি থাকবে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে যে তাপমাত্রা লক্ষ করা গেছে, বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গায় ৪০.৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা, যা স্বাভাবিক তাপমাত্রা নয়। এটা নির্ঘাত বেশি। তবে এটাও ঠিক, দু’একদিনের বাড়তি তাপমাত্রা দিয়ে একটা সময়কালের গড় তাপমাত্রা বের করা যাবে না।’

বিশেষজ্ঞরা যাই বলুন না কেন, এক সপ্তাহের তাপপ্রবাহে বদলে গেছে মানুষের জীবনচিত্র। অসহনীয় গরমে অনেকটাই থমকে গেছে জনজীবন। প্রকৃতি অনেকটাই পাগলা হাতির মতো অস্থির। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। গরমের কারণে অনেক স্থানে স্কুল-কলেজে কম ক্লাস নিয়ে আগেই ছুটি দেয়া হচ্ছে। ঢাকার বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। অফিস-আদালতের জন্য অনেককেই রাস্তায় বের হতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে খেটে খাওয়া মানুষেরও দুর্গতি চরমে। এককথায়, অসহ্য গরমে প্রায় সবারই হাঁসফাঁস অবস্থা। এ অবস্থার মধ্যে সোমবার সন্ধ্যা ৬টার পর বিএমডির প্রকাশিত আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগ ছাড়া দেশের কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। পাবনা, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ঢাকা ও রংপুর বিভাগ এবং রাজশাহী, বগুড়া, খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে।

বিএমডির এপ্রিলের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে এ মাসে। দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি এবং অন্যত্র ১ থেকে ২টি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাবে। এতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠবে। পাশাপাশি এ মাসে বঙ্গোপসাগরে ১-২টি নিুচাপের আশংকাও আছে। এর মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এমনকি টর্নেডোও হতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা হতে পারে। বিএমডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ১০০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর রাজধানীর তাপমাত্রা বেড়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের উত্তরাঞ্চল, রাঙ্গামাটি ও শ্রীমঙ্গল এলাকায় ভৌগোলিক কারণে তাপমাত্রা বেশি। কিন্তু মানুষসৃষ্ট কারণেই ঢাকা শহরে তাপমাত্রা বাড়ছে।

বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানান, বিগত ৩০ বছরের আবহাওয়ার রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে দশমিক ৭৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বাড়তি জনসংখ্যা, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিব্যবহার ইত্যাদি কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দেশে নগরায়ণ ঠেকানো যাবে না। কিন্তু এটা পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। ভবনগুলো কেমন হবে, সেটা ঠিক করে দিতে হবে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে শহরে এত লোক থাকবে কিনা। না রাখতে চাইলে সেভাবে সার্বিক পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে।