প্রিন্ট সংস্করণ    |    
প্রকাশ : ১০ জুলাই, ২০১৬ ০৯:৪২:৪৫ প্রিন্ট
আগস্টে বড় বন্যার আশংকা
পাহাড়ি ঢলে উত্তরাঞ্চলে বন্যা, লাখো মানুষ পানিবন্দি

উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। সরকারের বন্যা সতর্কীকরণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধলেশ্বরী ও কংস নদীর পানি তিন দিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিকে বইছে।

এসব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। কুশিয়ারা, সুরমাসহ অন্যান্য নদীর পানিও বাড়ছে। এ কারণে ওইসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে অতিবর্ষণের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। সেখানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বড় ধরনের বন্যার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে লা-নিনোর প্রভাবে আগস্টে এমন পরিস্থিতির আশংকা করছেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এল-নিনো ও লা-নিনোর (প্রশান্ত মহাসাগরে পানির উষ্ণায়ন থেকে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতি) প্রভাবে সাধারণত বন্যা হওয়া ও না-হওয়া নির্ভর করে।

২০১৪ সালে এল-নিনো শুরু হয়েছে। এর প্রভাবে ইতিমধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও চীনে বন্যা হয়েছে। এল-নিনোর প্রভাবে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে সাধারণত বন্যা হয়ে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে; লা-নিনোর প্রভাবেও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হয়। চলতি বছর লা-নিনো আসতে পারে এবং সারা দেশে বন্যাও হতে পারে।

কারণ চলতি বছর প্রকৃতিতে কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। এবার এপ্রিলে প্রচণ্ড দাবদাহ হয়েছে, স্মরণকালের ভয়াবহ বজ পাত এবং ফ্লাশ ফ্লাডও হয়েছে। চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ বৃষ্টি বেশি হতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশে জুলাইয়ের শেষে ও আগস্টের শুরুতে সাধারণত বন্যা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এবার বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।

এফএফডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কুড়িগ্রামের চিলমারী পয়েন্টে ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। যমুনার পানিও বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার ও বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বিপদসীমার ওপরে আছে। টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার এলাসিনে ধলেশ্বরীর পানি এক সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনার জারিয়াজঞ্জাইল পয়েন্টে কংস নদীর পানি বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া নাটোরের গুর নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, বুয়েটের বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। আর এটি হলে আগস্টে দেশে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।

এফএফডব্লিউসির বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর অবস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদ, সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। কিন্তু যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মার পানি বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টা পর যমুনা নদীর পানি কমতে পারে। ব্রহ্মপুত্র নদের বর্তমান অবস্থা ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অপরদিকে যমুনা নদী বাহাদুরাবাদ এবং সারিয়াকান্দি পয়েন্টে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বিপদসীমার নিচে নেমে আসতে পারে। গঙ্গা-পদ্মার পানি সমতলে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও জানান এ প্রকৌশলী।

যুগান্তরের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আসা পানিতে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক দ্বীপচর ও চরগ্রামের নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জামালপুর প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে যমুনার পানি বেড়ে জেলার ইসলামপুর উপজেলার ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আবদুল মান্নান জানান, উপজেলার পাথর্শী, নোয়ারপাড়া, কুলকান্দি, সাপধরি, চিনাডুলি ও বেলগাছা ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেলগাছা ইউনিয়নের ঘোনাপাড়া, চিনাডুলির গুঠাইল ও শিংভাঙা পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঘোনাপাড়া গ্রামের অন্তত ৫০টি বাড়ি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে এর আগে আবহাওয়া অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এমনকি জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমওর রিপোর্টেও চলতি বছর বাংলাদেশে বন্যার আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ৮ বছর পর বড় ধরনের বন্যার আশংকা থাকে। তবে ২০০৭ সালের পর এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বন্যা দেখা যায়নি বাংলাদেশে। চলতি বছর বড় আকারের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বড় বন্যা হলে দেশের ৪০টি জেলা আক্রান্ত হতে পারে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২২ জুন এমন আগাম তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বিএমডির সাবেক পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ শাহ আলম বলেন, এখনও পুরোপুরি বলা না গেলেও টানা বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে মনে হচ্ছে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নায়লা আহমেদ। বন্যার ঝুঁকি মোকাবেলা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ৮ বছর পর পর বড় ধরনের বন্যার আশংকা থাকে। ২০০৭ সালের পর বড় ধরনের বন্যা দেখা যায়নি। ফলে চলতি বছর বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।

হংকংয়ের আবহাওয়া পূর্বাভাসবিষয়ক সংস্থা হংকং অবজারভেটরির এক রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৪ সালের মে’তে এল-নিনো শুরু হয়েছে। চলবে ২২ মাস। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালের নভেম্বরে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই এল-নিনো ২০১৬ সালের পুরো সময়টাই থাকবে। ৩ এপ্রিল দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে আবহাওয়া অধিদফতরের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি বিশেষ বৈঠক করে। সেখানে জানানো হয়, এপ্রিল মাসে তীব্র দাবদাহ থাকবে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যার আশংকা রয়েছে।

জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমওর রিপোর্টে বলা হয়, এল-নিনোর প্রভাবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশসহ ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় প্রচণ্ড খরা ও বন্যা দেখা দিতে পারে। আর বাংলাদেশের নিচের কিছু অংশ ক্রান্তীয় এবং বাকি অংশ উপক্রান্তীয় অঞ্চলে পড়ায় এল-নিনোর বিরূপ প্রভাব পুরোপুরিই বাংলাদেশে পড়ার আশংকা রয়েছে।

চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। যে কারণে এ বছরের এল-নিনো হবে ১৯৫০ সালের পর চতুর্থ শক্তিশালী। এর আগের শক্তিশালী এল-নিনোগুলো ছিল ১৯৭২-৭৩, ’৮২-’৮৩ ও ’৯৭-’৯৮ সালে।


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত