মো. জাভেদ হাকিম    |    
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:৫৭:১২ প্রিন্ট
ছুটির দিনে বন-বাদাড়ে

ঢাকা থেকে বেশি দূরে নয়, অথচ জানেন না অনেকেই। যেখানে হাজার হাজার গাছের দৃষ্টিনন্দন সৃজনে রাবার বাগান আর বন্য বানরের লুকোচুরি। হ্যাঁ বলছি সন্তোষপুর রাবার বাগানেরই কথা। ভালোলাগা এই বনটির অবস্থান ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার নাওগাঁও ইউনিয়নের সন্তোষপুরে।

সাংবাদিক সোমেল সরকার আমাকে যাওয়ার জন্য ফেসবুক মেসেঞ্জারে, সেই বনের নানা স্থিরচিত্র আর বানরের বাঁদরামির ছবি পাঠান। ছবিগুলো দেখে আমি বেশ অবাক হই। তাকে বিভিন্ন উৎসাহব্যঞ্জক প্রশ্ন করি। মানুষের সাহচার্যে বন্য বানর।

 ব্যাপারটা বেশ কাকতালীয় মনে হয়। তার গ্রামের বাড়িও সেখানে। তাই পথঘাট চেনারও ঝামেলা নেই। ঝটপট করেই দে-ছুট, ভ্রমণ সংঘের বন্ধুদের সঙ্গে প্ল্যান করি। নিজ নিজ গাড়িতেই সবাই যাব।

জ্যামের ভয়ে ভোর চারটায় গাড়ি ছাড়ি। কপাল মন্দ, আশুলিয়া থেকেই মহাজটে পড়ে সকাল ৭টা বাজে টঙ্গী। ফেসবুকে কষ্টের কথা শেয়ার করতেই- লাইক কমেন্টের ফুলঝুরি। বুঝা গেল যানজটের যন্ত্রণায় সবাই কম বেশি ত্রাহী ত্রাহী। মাওনা পার হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি। এক টানে বেলা সাড়ে এগারোটায়, ফুলবাড়ীয়ার কান্দনিয়া গ্রামে পৌঁছি। সোমেল জানালেন বানর দেখতে হলে বিকালটা মোক্ষম সময়।

তাই পূর্ব অনুমতি নিয়ে ঢুঁ মারি দুলমা গ্রামের দিপ্তি অর্কিডস্ বাগানে। প্রধান ফটক পেরিয়ে বাগানে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। শক্ত পাতার আবরণে লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনি রঙের নানা ফুল ফুটে আছে।

বিশাল এলাকা- প্রায় ২৬ একর জায়গাজুড়ে অর্কিড বাগান। আরও রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের বৃক্ষরাজি। বাগানজুড়ে পাখির কলতান। বেশ ভালোলাগা একটা সময় পার করে যাই জুমার নামাজে।

নামাজ শেষে হেঁটেই চলে যাই টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার গুপ্তবৃন্দাবন গ্রামে। পাঠক নিশ্চই ভাবছেন লেখক সম্ভবত চাপাবাজি করছে । হাঁ হাঁ হাঁ- মোটেও না। জায়গটা ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল জেলার সীমানা। সেখানে রয়েছে একটি অনেক পুরনো তমাল বৃক্ষ। গাছটির সঠিক বয়স কত তা কেউই সঠিক বলতে পারেন না।

তবে শত বছর ছাড়িয়েছে এটা নিশ্চিত। স্থানীয় এক পুরোহিত জানালেন, তমাল গাছটি নাকি একবার মারা যাওয়ার পর আবার প্রায় ১২ বছর পর নতুন করে ডাল-পালা-পাতা গজিয়েছে। গাছটি দেখতেও বেশ অদ্ভুত। অনেকখানি জায়গাজুড়ে এর বিস্তৃতি। প্রকৃতি ও বৃক্ষপ্রেমী মির্জা রাসেল জানালেন ভিন্ন কথা। তিনি বললেন, এটা তমাল নয় বিরল প্রজাতির কোনো বৃক্ষ।

গাছের নাম যাই হোক না কেন, বর্তমানে তমাল বৃক্ষটিকে ঘিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা আর্চনা চলে। পর্যটকদের জন্যও এটা বেশ আকর্ষণীয়। প্রতিবছর চাঁদের হিসেবে দূরদূরান্ত থেকে আগত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মিলনমেলাও বসে। গাছ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে করতে ঘড়ির কাঁটায় তিনটা ছুঁই ছুঁই। আর টাইম নেই।

এবার ছুটি সন্তোষপুর রাবার বাগানের পথে। সুনসান নিরিবিলি গ্রাম্য পথে গাড়ি চলে হাঁকিয়ে। দু’পাশে পথের নৈসর্গিক দৃশ্য, পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ শেষ সিজনের রসালো পাকা আনারসের সু-ঘ্রাণ শুকতে শুকতে, কখন যে ঘণ্টাখানেকের পথ পাড়ি দিয়ে সন্তোষপুর পৌঁছে গিয়েছিলাম তা তেমন কোনো টেরই পাইনিই।

গাড়ি গিয়ে থামে বনের ভেতর রাবার প্রক্রিয়াকরণ ফ্যাক্টরির সদর দরজায়। ভেতরে ঢুকে খানিকটা সময় পর্যবেক্ষণ করি। গাছ থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষণ করা কষ দিয়েই তৈরি করা হয় রাবার।

যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা হয়। এবার বনের ভেতর দিয়ে মেঠো পথ ধরে, বনবিট অফিসের দিকে হাঁটতে থাকি। নয়নাভিরাম সন্তোষপুর বনাঞ্চল, মোট একশ’ ছয় একর পাহাড়ি জমিতে বিস্তৃত। এই বনে রয়েছে শাল, গজারিসহ নানা জাতের বৃক্ষ। আরও আছে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে রোপিত রাবার বাগান।

বুনো ঘ্রাণ আর শেষ বিকালে ঘরে ফেরা নানা পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে শুনতে পৌঁছে যাই বনবিট অফিসের সামনে। সেখানে পৌঁছেই চোখ চড়কগাছ। এ পাশটায় যেন বানরের সভা মিলেছে। নানা বয়স আর সাইজের বানরের হুলুস্থুল।

দোকানিদের কাছ থেকে কলা, বাদাম কিনে আমরাও বানরের বাঁদরামির সঙ্গে অংশ নিই। আশ্চর্যের বিষয় বানরগুলো আমাদের কোলে, কাঁধে একেবারে নির্ভয়ে এসে ওঠে। মনেই হয় না যে, বানরগুলো বন্য।

বরং বানরের আচরণে বোঝা যায়, আমরা যেন ওদের কত চেনা-পরিচিত। কোনো কারণে যদি আপনাকে ভয়ও দেখায় কিন্তু আঘাত করবে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বনে বিরল প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় পাঁচশ’ বানর রয়েছে। আগে আরও অনেক ধরনের বন্যপ্রাণীর দেখা মিলত। কিন্তু প্রাকৃতিক বনের বুক চিরে আশির দশকে রাবার বাগান সৃজন আর মানুষের উৎপাতে এখন শুধু বানরকুলই কোনোরকম টিকে আছে।

বন বিভাগ থেকে বানরের জন্য খাবার বরাদ্দ থাকলেও তা অপ্রতুল। তাই বনে আসা ভ্রমণপিপাসুরাই এখন ওদের ভরসা। স্থানীয়রা এদের সামাজিক বানর হিসেবেই আখ্যায়িত করে। কারণ দোকানিরা নানা খাবারের পসরা মেলেছে কিন্তু কোনো উৎপাত নেই। আগত দর্শনার্থীদের কেউ যদি খাবার না দেয় তা হলে খুব অসহায়ভাবে তার কাঁধে বা কোলে বসে থাকবে।

অগত্যা হাড়কিপ্টে মানুষের হৃদয়ও, আবেগতাড়িত হয়ে বানরের জন্য কিছু টাকা খরচে বাধ্য হবে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ আর বানরের অভূতপূর্ব মিলনের মাঝেই দিনের আলো মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে বানরের সভাও ভাঙতে থাকে।

সময়ের অভাবে দুপুরে খাবার না খাওয়ায় আমাদের পেটেও টান পড়ল। বানর ছুটল বনের ভেতর আর ‘দে-ছুট’ ছুটল রান্নার আয়োজনে। ফ্যাক্টরির পাশে মসজিদের আঙ্গিনায় জম্পেশ চুড়–ইভাতি শেষে, আপন নীড়ের পথ ধরি।

যাবেন কীভাবে

নিজস্ব গাড়ি বা রেন্ট-এ কার নিয়ে গেলে ঘুরে বেড়াতে সুবিধা হবে বেশি। তবে ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া নেবে জনপ্রতি ২২০ টাকা। গাড়ি থেকে নেমে যেতে হবে ময়মনসিংহের আগেই ফুলবাড়ীয়া বাসস্ট্যান্ড।

সেখান থেকে অটো-সিএনজিতে অর্কিড বাগান। ইচ্ছা করলে সারা দিনের জন্য ভাড়া নিয়ে একেবারে সন্তোষপুর রাবার বাগানসহ আরও আশপাশ ঘুরে আসতে পারবেন। আর যারা শুধু সন্তোষপুর বানর পল্লী যাবেন, তারা ফুলবাড়ীয়া উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে সিএনজিতে জনপ্রতি ৭০-১০০ টাকা করে সরাসরি চলে যেতে পারেন।

সতর্কীকরণ

বানরদের আক্রমণ করার চেষ্টা করবেন না। যথাসম্ভব বানরদের কিছু খাবার দিন। বানর যখন কোলে, কাঁধে উঠবে তখন কোনো ভয় পাবেন না। এ বনের বানরগুলো অত্যন্ত পর্যটকবান্ধব। বনের পাঁচ প্রজাতি বানরের মধ্যে যে কোনো এক প্রজাতির বানর কিছুটা উগ্র। তাই বানরদের খাবার দেয়ার সময় কিছু বিলিয়ে আবার কিছু হাতে মুঠ করে রাখবেন না।

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

[email protected]


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত