সাইফুর রহমান সাগর    |    
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২০:৩০:০২ প্রিন্ট
ধ্বংস প্রায় লালমাই পাহাড়

কুমিল্লা কেন বিখ্যাত-এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে উত্তর আসবে আর তা হলো, লালমাই ময়নামতি পাহাড়। যদিও লালমাই পাহাড় বলতে আমরা পাহাড়ের মতো দেখতে আকারে ছোট টিলাকেই পাহাড় বলি।

প্রকৃতপক্ষে এগুলো পাহাড় নয়। কারণ, পাহাড়ের আয়তন হয়ে থাকে বিশালাকার ও সুউচ্চ। আমাদের দেশে পাহাড়ি অঞ্চল আছে অনেক, যার মধ্যে পার্বত্য অঞ্চল উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ে জনমানবের চলাচল অনেকটাই সীমিত থাকে। পাহাড়ি দুর্গমতার কারণে, নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক অনিরাপদ অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই বিশ্বের বেশির ভাগ পাহাড়ি অঞ্চলে বিশেষ করে পাহাড়ের উপরিভাগ মানবশূন্য থাকে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের নেশা এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, সবুজের গন্ধ মানবগোষ্ঠীকে বারবার টেনে নিয়ে যায় পাহাড়ের কাছে। মানবকূলের প্রিয়তম জায়গাগুলির মাঝে সমুদ্র এবং পাহাড়ি প্রকৃতি সর্বাগ্রে অবস্থান করে আছে মানুষের প্রাণে।

মানসিক আনন্দদায়ক প্রাকৃতিক রূপে ভরা মুগ্ধকর পরিবেশ আছে পাহাড় থেকে কিছুটা ছোট, যাকে আমরা টিলা বলে চিনি। যেখানে মানুষের আহরণ সহজতর পাহাড়ের চাইতেও। পৃথিবীতে পাহাড়ের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও টিলার সংখ্যা অনেক কম। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই আকাশচুম্বী পাহাড়কে কেটে টিলা বা ছোট পাহাড়ের মতো বানাতে শত শত বছর লেগে যায়।

শুধুমাত্র মানুষের সাময়িক অবকাশ মেটানোর জন্য তৈরি করা হয় এইসব পর্যটক আকর্ষণীয় ছোট পাহাড়। তবে সবার আগে পরিবেশের ক্ষতি এবং ভারসাম্য সঠিক রেখেই এই ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়।
সৌভাগ্যবশত আমাদের দেশে মানবআরোহণ ও নিরাপদ উচ্চতার টিলা একমাত্র কুমিল্লার লালমাইতে আছে। শত শত টিলার এক অপরূপ সন্নিবেশন লালমাই ময়নামতিতে। নিরাপদ ভোগোলিক অবস্থানের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসে এখানে অবকাশকালীন সময় কাটাতে।

কিন্তু এখানকার পরিবেশ পাহাড়কে ধরণীধর বলা হয়, মানে হলো ধরণীকে যে ধরে রাখে। সৃষ্টির এই বিশালাকার ধরণীর স্তম্ভ হলো পাহাড় বা পর্বত প্রকৃতির নিষ্ঠুর ভূকম্পন থেকে রক্ষা করে থাকে এ পাহাড় ও টিলা। বিজ্ঞানীরা অনেকভাবে প্রমাণ করেছে, ভূ-পৃষ্ঠকে ধরে রাখার পেছনে পাহাড়ের অবদান অপরিসীম।

বাংলাদেশে খুব কমসংখক এলাকা জুড়ে রয়েছে পাহাড়। দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানে প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশ হিসেবে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যে কোনো বড় ধরণের জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিকম্পে তলিয়ে যাবে আমাদের এ অঞ্চল । এমন পূর্বাভাস অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার দিয়ে যাচ্ছে।

পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে যেখানে কোটি কোটি ডলারের প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে সেখানে আমাদের দেশে প্রকৃতির লীলাভূমি ও ভূ-পৃষ্ঠ রক্ষাকারী পাহাড়কে নিয়মিত নিঃশেষ করা হচ্ছে।

পাহাড়ে ভূমিদস্যুদের ধ্বংসযজ্ঞ: ছোট পাহাড়ের অঞ্চল কুমিল্লা লালমাই ময়নামতি পাহাড় ঘেরা এ অঞ্চলটিকে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয় শুধুমাত্র পাহাড়ের জন্য। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এই পাহাড় এবং টিলা কেটে টুকরা টুকরা করে চলেছে মাটি বিক্রেতারা। পাহাড় কেটে সমান্তরাল করে আবার সেই জমি বিক্রি করছে সেখানকার ভূমিদস্যুরা।

পাহাড়ের প্রয়োজনীয়তা না জানার কারণে হাজার হাজার একর পাহাড়ি উচুঁ এলাকা প্রতিনিয়ত কেটে কেটে সমান্তরাল করছে স্বার্থান্বেষী মহল।

রক্ষকই যেন ভক্ষক: রাজনৈতিক আশীর্বাদে যারা এ সম্পদ দেখার দায়িত্বে রয়েছেন তারাই ভোগ করছে এ অপকর্মের আর্থিক সুবিধা। প্রশাসনিকভাবে আদালত থেকে পাহাড় না কাটার নির্দেশনা থাকলেও মানছে না কেউই।

পাহাড়ে আশ্রিত মানুষ সেই পাহাড়কে কেটে তার বুকে তৈরি করছে বাড়িঘর। এভাবে চলতে থাকলে খুব নিকট ভবিষ্যতে আমরা পুরো লালমাই পাহাড়ের সমাধিস্থল দেখতে পাব।

পাহাড় রক্ষায় কিছু পরামর্শ:  একদল স্থানীয় ও চিহ্নিত পাহাড় দস্যুদের যদি এখনই বাধা না দেয়া হয় তাহলে অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে লালমাইয়ের বাকিটুকু পাহাড়ি অঞ্চল। সরকারের সুদৃষ্টি না দেয়া হলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে আরো বেশি হুমকির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি এই এলাকাটিকে সরকারের বনবিভাগের আওতাধীন এনে বিশাল বনায়নের সম্ভাবনাময়ী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। লালমাটির বিলুপ্তপ্রায় অঞ্চলটিকে রক্ষা করা সরকারের নৈতিক ও প্রাকৃতিক দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।

বিশ্ব জলবায়ু শর্তানুযায়ী, লালমাইকে বন ও পরিবেশ রক্ষার আওতাধীন এনে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা এই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করছে, তাদের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তারা যদি উপলদ্ধি করতে পারে যে, এ এলাকাকে ধ্বংস করা মানে নিজের প্রজন্মকে ধ্বংস করা।

শুধুমাত্র  সামান্য অর্থের লোভে যে কাজটি করা হচ্ছে, তা কখনো হাজার গুণ অর্থব্যয় করেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

পাহাড় দস্যুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখে কঠিনভাবে আইন প্রনয়ন এখন সময়ের দাবি।

তাই আসুন সবাই মিলে আমাদের লালমাইকে সবদিক থেকে রক্ষা করি। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ পাহাড়ঘেরা লীলাভুমি রেখে যাই।
সবুজ বেঁচে থাকুক আমাদের শিশুদের মাঝে।

লেখক: সাইফুর রহমান সাগর
সাংবাদিক ও লেখক


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত