সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন    |    
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৩:০১:৪৮ প্রিন্ট
মুসলিম বিশ্বের প্রাণ জেরুজালেম

মুসলিমদের পবিত্র স্থান জেরুজালেমের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ যা বায়তুল মোকাদ্দাস নামে খ্যাত। এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল। কাবা শরিফ কিবলা হওয়ার আগে রাসূল (সা.)সহ মুসলমানরা আল আকসা মসজিদের দিকে ১৭ মাস মুখ করে নামাজ আদায় করেছিলেন।

এ পবিত্র স্থানটি অসংখ্য নবী-রাসূলের ইবাদত ও প্রচার কেন্দ্র ছিল। এখানে বনি ইসরাইলের অসংখ্য নবী-রাসূলের মাজার ও সমাধি রয়েছে। হিজরতের আগের বছর ২৭ রজব রাসূল (সা.) বাইতুল আকসার বাইরে বোরাক বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন।

এ মসজিদের পাশেই রয়েছে সাখারা পাথর, যেখান থেকে রাসূল (সা.) মিরাজের রাতে ঊর্ধ্বাকাশ সফর শুরু করেছিলেন। জেরুজালেম শহরকে বরকতময় ও পবিত্র ঘোষণা করে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য’ (সূরা-বনি ইসরাইল, আয়াত-১)। রাসূল (সা.) মিরাজ শেষে আবার মসজিদুল আকসায় ফেরেন এবং ইমাম হয়ে সব নবী-রাসূলদের নিয়ে সেখানে নামাজ আদায় করেন। এরকম অসংখ্য কারণে দুনিয়ার মুসলিমদের কাছে আল-আকসা মসজিদ প্রিয় স্থান।

পবিত্র কোরআনে ২টি মসজিদের নাম উল্লেখ হয়েছে। মসজিদে হারাম (মক্কা) ও মসজিদে আকসা। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে তিনটি মসজিদে ইবাদতের নিয়তে সফরের অনুমতি আছে তা হল আল আকসা, মসজিদে হারাম (মক্কা) ও মসজিদে নববী (মদিনা)। (বুখারি ও মুসলিম শরিফ) এর গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘ঘরে নামাজ পড়লে এক গুণ, মসজিদে ২৫ গুণ, মসজিদে নববী ও আকসায় ৫০ হাজার গুণ, মসজিদে হারামে একলাখ গুণ সাওয়াব’ (ইবনে মাজাহ)।

অনেকে মনে করেন হজরত সুলাইমান (আ.) মসজিদে আকসা তৈরি করেছেন, অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুল। ইবরাহিম (আ.)ই প্রথম আল আকসা তৈরি করেন। ইবরাহিম (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর সময়ের ব্যবধান হচ্ছে ১ হাজার বছর। রাসূল (সা.) বলেছেন, মসজিদে হারামের ৪০ বছর পর আকসা তৈরি হয়েছে। ইবনুল যাওজী (রা.) বলেন, ইবরাহিম (আ.) যেমন কাবার প্রতিষ্ঠাতা নন, তেমনি সুলাইমান (আ.)ও মসজিদে আকসার প্রতিষ্ঠাতা নন। বরং উভয়েই পুনঃনির্মাণকারী। কাবার মূল প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন হজরত আদম (আ.)। আর আল আকসার মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)।

৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৫০০ বছর জেরুজালেম শহর মুসলমানদের অধীনে ছিল। ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা নামধারী মুসলিম শাসকদের সহায়তায় সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে। এরপর তারা ১০৯৯ সালের ৭ জুন বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গির্জায় পরিণত করে। তারা মসজিদের গম্বুজের ওপর ক্রুশ স্থাপন করে এর নাম রাখে ‘সুলাইমানি উপাসনালয়’।

খ্রিস্টানদের দখলে ৮৮ বছর থাকার পর ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুজালেম শহর মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত হওয়ার পর সেখানকার মুসলিমরা ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছিল। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুজালেম অধিকার করার পর আগের নকশা অনুযায়ী আল আকসা মসজিদ পুণর্নির্মাণ করেন।
বর্তমানে ইহুদিবাদী ইসরাইল ঐতিহাসিক মসজিদটি দখল করে রেখেছে।

ইঙ্গ-মার্কিন-রুশ অক্ষ শক্তির ষড়যন্ত্রের ফসল মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল। আল্লাহর অনেক নবী-রাসূলকে হত্যাকারী অভিশপ্ত জাতি ইহুদিদের এনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আর্থার জেমস বেলফোর আরব বিশ্বের বুকে এ বিষফোঁড়ার জন্ম দেন। ১৯৪৮ সালের আগে পৃথিবীতে ইসরাইল নামে কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না।

ডেভিড বেনগুরিয়ন ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর ইসরাইলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদ্রেগ্রোমিকো ১৫ নভেম্বর এ স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি ও অনুমোদন দেয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানালে আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইংল্যান্ডসহ ৩৩টি দেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের ৭৮ শতাংশ ভূখণ্ড ইহুদিরা দখল করে। দখলদারদের জুলুম-নির্যাতনে ৪০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুভিটা হারিয়ে পাশের আরব দেশগুলোয় চলে যেতে বাধ্য হন। এরপর ১১ লাখ ইহুদি ফিলিস্তিনে এসে বসতি গড়ে। ১৯৬৯ সালে তারা আল আকসা মসজিদে অগ্নিসংযোগও করেছিল। তারা আল আকসা মসজিদ ও গম্বুজে সাখারা ধ্বংস করে সেখানে তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী নিজেদের কথিত ইবাদতখানা ৩য় টেম্পল তথা ‘হাইকালে সুলাইমানি’ বা সুলাইমান (আ.)-এর তৈরি ইবাদত গৃহ নির্মাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেরুজালেম শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেম শহরে স্থানান্তরের ঘোষণায় আরব দুনিয়া, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘসহ আন্তজার্তিক সব মহলেও সমালোচিত হচ্ছে ট্রাম্পের জেরুজালেম নীতি। ভূত-ভবিষ্যৎ বিবেচনা ছাড়াই হঠকারী ঘোষণার মাধ্যমে মুসলিম অন্তরে ছাইচাপা আগুন উসকে দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর থেকে মুসলিম বিশ্বের সব দেশেই ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। একইসঙ্গে গাজা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

মুসলিম বিশ্ব ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত ইসরাইলিদের দখলকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। ওআইসির চেয়ারম্যান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান ইসরাইল ও ওয়াশিংটনের কড়া সমালোচনা করেছেন এবং ১৩ ডিসেম্বর ইস্তাম্বুলে ওআইসির বিশেষ সম্মেলনে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা দিয়েছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইসরাইল একটি দখলদার রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালাচ্ছে। তিনি তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

দখল, আগ্রাসন, যুদ্ধ মানুষের জীবনহানি, দুর্দশা-কষ্ট বাড়ায়, সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারে না। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের উচিত হবে আগ্রাসী বক্তব্য প্রত্যাহার করে ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং জেরুজালেম শহর ফিলিস্তিনের অধিকারে ফিরিয়ে দিয়ে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া। যাতে পবিত্র এ শহরে আর রক্তক্ষরণ না হয়, সব ধর্মের মানুষ যেন শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারে এটাই সবার প্রত্যাশা।

 লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ
[email protected]
 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত