প্রকাশ : ০৯ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি

আমি খুব রাগী ও একঘেয়ে ছিলাম, কিছু বললে কড়া কথা বলে দিতাম। কারো বেশি ধার ধারতাম না। আমাকে যে কাজ দেয়া হতো আমি নিষ্ঠার সঙ্গে সে কাজ করতাম। কোনো দিন ফাঁকি দিতাম না। ভীষণভাবে পরিশ্রম করতে পারতাম। সেজন্য আমি কড়া কথা বললেও কেউ আমাকে কিছুই বলত না। ছাত্রদের আপদে-বিপদে আমি তাদের পাশে দাঁড়াতাম। কোন ছাত্রের কী অসুবিধা হচ্ছে, কোন ছাত্র হোস্টেলে জায়গা পায় না, কার ফ্রি সিট দরকার, আমাকে বললেই প্রিন্সিপাল ড. জুবেরী সাহেবের কাছে হাজির হতাম। আমি অন্যায় আবদার করতাম না। তাই শিক্ষকরা আমার কথা শুনতেন। ছাত্ররাও আমায় ভালোবাসত।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে এভাবেই তুলে ধরেছেন কলকাতার তালতলার স্মিথ লেনে অবস্থিত সরকারি বেকার হোস্টেলের কথা। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবাষির্কী উপলক্ষে স্মৃতিধন্য স্থান বেকার হোস্টেল ঘুরে এসে লিখেছেন সুমন্ত গুপ্ত

১৯৪২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কলকাতার ওয়েলেসলি স্কয়ারের ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজ) মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। কলকাতার তালতলার স্মিথ লেনে অবস্থিত সরকারি বেকার হোস্টেলে ২৪ নম্বর রুমের আবাসিক ছাত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৬ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে অনার্সসহ ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন।

কলকাতা ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন আমাদের গন্তব্য ছিল জাতির পিতার স্মৃতিধন্য স্থান সেই বেকার হোস্টেল। সকাল সাতটায় বের হয়ে গেলাম। ঢাকা শহরের মতোই সবাই কর্ম ব্যস্ত। কলকাতা নিউমার্কেট পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। প্রায় দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর এসে পৌঁছলাম তালতলায়। এর কিছুদূর যাওয়ার পরই চোখে পড়ল বেকার হোস্টেলের বিরাট সাইনবোর্ড। সামনে এগোতেই সবুজ রঙের লোহার গেট পার হলেই ভেতরে বেশ পুরনো স্থাপনা। অনেক জায়গাজুড়ে ছাত্রাবাস। তিনতলা দালান, লম্বা লম্বা জানালা-দরজা। দূর থেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। সামনে গিয়ে কাঠের সিঁড়ি দেখতে পেলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই দেখা মিলল বেকার হোস্টেলের কর্মী শেখ গোলাম গাউসের।

আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন জাতির পিতার স্মৃতিবিজড়িত ২৩ ও ২৪ নাম্বার রুমে। আমরা ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলছি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়া সেই কক্ষের দিকে। তৃতীয় তালায় উঠতেই চোখে পড়ল বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কারাজীবন পাথরে খোদাই করে লিপিবদ্ধ করা। আমরা দাঁড়িয়ে তার জীবন ও কারাজীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পড়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। সামনে গিয়ে দেখা মিলল চোখে চশমা, মুজিব কোট পরিহিত শ্বেতপাথরে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বরের সঙ্গে ২৩ নম্বর কক্ষটিকে যুক্ত করে বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষ গড়ার উদ্যোগ নেন। পরে ওই বছরের ৩১ জুলাই বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সত্যসাধন চক্রবর্তী। বঙ্গবন্ধুকে জানার জন্য প্রতিদিনই কেউ না কেউ এখানে আসেন। বাঙালি জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক এসেছে স্মৃতিবিজড়িত রুম দেখতে। ২৪ নং কক্ষে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর পড়ার চেয়ার-টেবিল, একটি কাঠের আলমারি ও খাট। পরে আমরা পাশের কক্ষে গেলাম। এ কক্ষে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর একটি আলোকচিত্র আর বেশ কিছু বইপুস্তক। স্মৃতিকক্ষ দেখতে আসা পর্যটক ও বঙ্গবন্ধুর ভক্তদের বেকার হোস্টেলের কর্মী শেখ গোলাম গাউস সহযোগিতা করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ছাত্র জীবনের গল্প শোনান। তিনি বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু ২৩ নং রুমে লেখাপড়া করেছেন। আর ২৪ নং রুমে রাতে ঘুমিয়েছেন।’ সরকারি এ বেকার হোস্টেলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শেখ ফরিদ গোলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকক্ষ দেখার জন্য বাংলাদেশ থেকে অনেকে এখানে আসেন। ভারতের জনগণও আসেন।

আমি খুঁজতে এসেছি, আমার চেতনার শেকড়।

আমি মনে মনে বললাম, ঘড়ির কাঁটায় সময় এগিয়ে চলছে। আমাদের বিদায় নেয়ার সময় হয়ে এলো। আমরা পেছনে ফেলে এলাম ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়া জাতির জনকের স্মৃতিময় বেকার হোস্টেল।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত