ঘরেবাইরে প্রতিবেদক    |    
প্রকাশ : ২৫ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পারিবারিক
পরিবারের বয়স্কদের প্রতি যত্নবান হতে হবে

আজকের বয়োজ্যেষ্ঠরা কেমন আছে? বয়োজ্যেষ্ঠ মানে বৃদ্ধ বাবা-মা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচিসহ সব আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজের সব বয়স্কদের সঙ্গে আমরা কেমন আচরণ করছি? তাদের সুখ-দুঃখ, চিন্তা-ভাবনা, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আমরা কতটুকু ভাবছি? বাবা-মা দু’জনের একজন মারা গেলে অপরজন যে কতটা অসহায়, কতটা একা, তা কি আমরা গভীরভাবে ভাবি? অনেকেই হয়তো বাবা-মা’র জন্য অনেক কিছু করেন। তাদের মুবারকবাদ দেই। তারা তো ভাগ্যবান। তারা নবী করিম (সা.) যাদের ধ্বংস কামনা করেছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। কিন্তু সবাই কি?

নাটক-উপন্যাসে প্রায়ই দেখা যায়, বাবা-মাকে সংসারের ঝামেলা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। তাদের দুঃখ কষ্ট বঞ্চনার কথা অনেকে জানে। কিন্তু যেসব বৃদ্ধ নিজগৃহে পরবাসী তাদের কথা ভাবুন। তাদের খোঁজ কয়জনে রাখে। সারা জীবনে তিলে তিলে গড়ে তোলা তার নিজস্ব ঘরেই তো তার অধিকার সীমিত। ছেলে, বউদের দয়ায় কোনো রকমে বেঁচে আছে। সংসারে সে অপাঙ্ক্তেয়, অচল। সে ব্যাক ডেটেড, তার মতামতের কি মূল্য আছে। তাদের সময় দেয়ার সময় কোথায় অন্যদের। অনেক বৃদ্ধকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, সারা জীবনের সঞ্চয় রিটায়ারমেন্ট বেনিফিটের টাকা পাওয়ার পরপরই ছেলেমেয়েরা যে যার প্রয়োজন দেখিয়ে সব টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে তার আবার টাকার প্রয়োজন কি? সে এখন কপর্দকহীন। তার এখন আয়ের উৎস নেই, তাই সে মূল্যহীন। অথচ কিছুদিন আগে তার উপার্জনেই সবকিছু চলতো।

অনেকেই মা-বাবার জন্য করেন বা করার চেষ্টা করেন। কিছু একটা করতে পেরে তৃপ্তি বোধও করেন। আসলে কতটা করি? মনে পড়ে ছোট বেলায় পড়া সেই পঙ্ক্তিমালা যা ভাব-সম্প্রসারণ করতাম ‘শৈবাল দীঘিরে কহে, উচ্চ করি শির, লিখে রেখো, এক বিন্দু দিলাম শিশির’। আমাদের মা-বাবা দীঘির মতন। আমরা তার উপরেই বেঁচে থাকা ক্ষুদ্র শৈবাল মাত্র। আর যা কিছু তাদের জন্য করি তা ওই শিশির বিন্দুর মতই ক্ষুদ্র।

মা-বাবা সন্তানের জন্য যা কিছু করেন তা নিঃস্বার্থভাবেই করেন। কোনো লাভ-লোকসানের হিসাব করে করেন না। কিন্তু সন্তান যখন করে তখন মা-বাবার জন্য এই করলাম, সেই করলাম, এরকম একটা ভাব থাকে। অর্থাৎ যা করেন তার হিসাব আছে। খরচ হিসেবে বিবেচিত হয়। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকেই আক্ষেপ করেন, বেঁচে থাকতে মা-বাবার মর্ম বুঝিনি। আবার যদি পেতাম। সেই আবার তো আর সম্ভব নয়। তবে যাদের মা-বাবা বা অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় জীবিত আছেন তাদের কিন্তু সে সুযোগ আছে। কীভাবে? আসলে ভালোবাসা বা দায়িত্ব বোধের বিষয়ে কোনো টিপস দেয়া যায় না। এটা উপলব্ধির বা দায়িত্ববোধের বিষয়। তারপরও আমাদের বাবা-মা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য কি করা উচিত সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যায়।

* সর্বপ্রথমে এবং প্রধানতম কাজ হচ্ছে তাদের ভালোবাসা। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা সন্তানের কাছে ভালোবাসার কাঙ্গাল। তারা শিশুর মতো হয়ে যায়। শিশুরা সৌভাগ্যবান, তারা না চাইতেই অফুরন্ত ভালোবাসা পায়। আর বৃদ্ধরা সেই সন্তানের কাছে চেয়েও তা পায় না।

* কর্মস্থলে যাওয়ার আগে তাদের কাছে বলে যান। ছোট বেলায় আপনি যেমন কোথাও যাওয়ার আগে বলে যেতেন। বাবা-মা যেন মনে করে ছেলে বড় হলেও শুধু বউকে না, বাবা-মাকে না বলেও কোথাও যায় না।

* একসঙ্গে খেতে বসুন। এটা সেটা খাবার উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। গল্প গুজব করুন। সে কথা বললে মনোযোগ দিন।

* মাঝে মাঝে তাদের নিয়ে বেড়াতে বের হন। কোথাও দাওয়াতে গেলে সঙ্গে নেয়ার চেষ্টা করুন। তারা যাক বা না যাক, আপনি বলুন।

* কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো আপনিই নেবেন। তবুও তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এতে তারা মনে করবে সন্তানের কাছে তার এখনও গুরুত্ব আছে। আর একটা কথা ভুললে চলবে না, তার বয়স কিন্তু আপনার চেয়ে অনেক বেশি। বয়স মানে অভিজ্ঞতা, আর অভিজ্ঞতার অপর নাম জ্ঞান। এই জ্ঞান কিন্তু আপনার চেয়ে তার বেশি, তা আপনি যত শিক্ষিত হউন না কেন।

* মাঝে মাঝেই তার শরীরের খোঁজ খবর নিন। কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করুন। সম্ভব হলে সময়ে সময়ে বা প্রয়োজন মতো শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা নিন।

* টাকা পয়সা এমন একটা জিনিস যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার প্রয়োজন আছে। আপাতত দৃষ্টিতে মনে না হলেও বৃদ্ধদেরও কিন্তু টাকার প্রয়োজন। তাদের দান-খয়রাত, বাচ্চাদের বা নিজের জন্য কিছু কেনা বা মসজিদ-মাদ্রাসা ইত্যাদি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছে করে। সুতরাং প্রতি মাসে তাদের কিছু পকেট মানি দিন।

* ঈদ বা কোনো অনুষ্ঠানে তারা যেন ছোটদের সালামি বা উপহার দিতে পারে সে ব্যবস্থা করুন।

* প্রতিবেশী বা সমাজের সর্বত্রই বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান দিন, ভালো আচরণ করুন। ভাববেন এই বয়োজ্যেষ্ঠরা কিন্তু আপনার বাবা-মায়ের মতো।

পরিবারে প্রায়শই বয়স্ক লোকদের বোঝা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের সমস্যাকে আমলে নেয়া হয় না। তা সে শারীরিক সমস্যা হোক বা মানসিক সমস্যাই হোক। ধরেই নেয়া হয় বয়স বেড়ে গেছে এমন একটু আটটু হতেই পারে। বয়স বাড়লে শারীরিক ও রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে একজন বয়স্ক মানুষের চলাফেরা বা চিন্তা চেতনায় অনেক পরিবর্তন হয়, যা আমরা অনেক সময়ে রোগ ভেবে ভুল করে থাকি। আবার অনেক সময় দেখা যায় সত্যিই কোনো রোগ তাকে পেয়ে বসলেও বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে প্রকৃত অসুস্থতাকেও আমরা আমলে নিতে চাই না। এ ধরনের উন্মাসিকতা অনেক সময় বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটির জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই বয়স্কদের বিষয়ে সচেতন ও যতœশীল হতে হবে।

বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য আপনার সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখুন। মনে রাখতে হবে এই রকম বয়স এবং অবস্থা সবারই হবে। সবাই বলে সংসারে মুরুব্বিরা মাথার ওপর ছাদ। কিন্তু এই ছাদের আমরা কতটুকু যতœ নেই। এই ছাদ যখন মাথার ওপর থেকে সরে যাবে তখন আর আক্ষেপ করে লাভ কি।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত