প্রকাশ : ২৫ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটনার ঘনঘটা
সমাজের চালিকাশক্তি হল পরিবার। আর পরিবার গঠনের অন্যতম শর্ত হল বিবাহবন্ধন। সুখে-দুঃখে দু’জন-দু’জনার পাশে থেকে জীবন কাটানোর অঙ্গিকারই হল বিয়ে। সংসার উজালা করে পরিবারে আগমন ঘটে নতুন অতিথি সন্তানদের। কিন্তু কখনও কখনও সামান্য ভুল বোঝাবুঝির পথ ধরে কালো মেঘ এসে ছিন্নভিন্ন করে দেয় সংসার নামের প্রতিষ্ঠানটিকে। সারা জীবন একসঙ্গে একই ছাদের নিচে কাটানোর স্বপ্ন দেখা মানুষ দুটিই হাঁটেন উল্টো পথে, পরবর্তীতে বিচ্ছেদ। সাম্প্রতিককালে দেশে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বিবাহ বিচ্ছেদের নানাদিক নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদনটি লিখেছেন- যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ

প্রতিদিন ভাঙছে ১৫টি সংসার

নানা কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েই চলছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য মতে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিগত ৬ বছরে রাজধানীতে ৩০ হাজার ৮৫৫টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার (উত্তর ও দক্ষিণ) দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্যানুযায়ী মোট তালাকের ৬৮ দশমিক ১৯ শতাংশ স্ত্রী এবং ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ স্বামী তালাক দিচ্ছেন। সে হিসাবে প্রতিদিন রাজধানীতে ১৫ দম্পতির মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

৬ বছরে দুই সিটি কর্পোরেশনে বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ পড়েছে ৩৬ হাজার ৩৭১টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৩০ হাজার ৮৫৫টি। স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে তালাকের নোটিশ পড়েছে ২৪ হাজার ৮০৩ এবং স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ ১২ হাজার ১৮টি। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি, মাসে ৪২৯ এবং বছরে ৫ হাজার ১৪৩টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

কেবল ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো বিচ্ছেদের আবেদন জমা হচ্ছে। প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় বাড়ছে সংখ্যাটি। বর্তমানে রাজধানীতেই নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে প্রায় ৫০ হাজার বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন। শুধু শহরে নয় সারা দেশেই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দক্ষিণ ও উত্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ৬ হাজার, ২০১৫ সালে ৯ হাজার, ২০১৪ সালে ৮ হাজার ২১৫টি, ২০১৩ সালে ৮ হাজার ২১৪, ২০১২ সালে ৭ হাজার ৯৯৫, ২০১১ সালে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে ৫ হাজার ৩২২ এবং ২০১০ সালে সাড়ে ৫ হাজার বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।



যেসব কারণে বিচ্ছেদ বাড়ছে

দুই সিটি কর্পোরেশনের বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, সন্দেহপ্রবণতা সৃষ্টি, স্বামীর কাছে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া, মাদকাসক্ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা ও শারীরিক সম্পর্কে অক্ষমতার কারণেই মূলত অধিকাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি সমাজে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইমেইলসহ নানা প্রযুক্তির বিকৃত ব্যবহার, অতিরিক্ত লোভ বা চাহিদা, অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা, একে অপরকে প্রয়োজনীয় সময় না দেয়া ও উদাসীনতা, পারিবারিক মূলবোধের অভাব, বিদেশি অপসংস্কৃতির প্রভাব, আত্মতুষ্টি না থাকা, বোঝাপড়ার অভাব বা ধৈর্যচ্যুতি, পারিবারিক শিক্ষার অভাবের কারণে বিচ্ছেদের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে।



পারিবারিক সহিংসতা

বিবাহ বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল বলেন, আমি মনে করি পারিবারিক সহিংসতা বাড়ার কারণে সংসার ভাঙছে। প্রশ্ন হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা কেন বাড়ছে? বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, কমিউনিকেশন গ্যাপ বাড়ছে। যদিও তারা একই ছাদের নিচে বসবাস করছেন তারপরও তারা কোয়ালিটি টাইম কাটাচ্ছে না, ইমোশন লেনদেন করছে না। ছোটখাটো বিষয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। মেলামেশায় আন্তরিকতা কমে গিয়ে তাদের মধ্যে আস্তে আস্তে ফাটল তৈরি হচ্ছে। এক পর্যায়ে অন্য পুরুষ বা নারীর প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। অথবা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল বা মোবাইলের মাধ্যমে সহজেই অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে। অপরিচিতদের সঙ্গে নিজের নেতিবাচক জিনিসগুলো শেয়ার করে অন্যের ফাঁদে পড়ে যায় এবং সেই ফাঁদটা যদি কোনো খারাপ পাত্র হয় তাহলে বিষয়টি আরও বিপজ্জনক হয়।

তিনি বলেন, ফেসবুক বা মোবাইল কালচারের কুপ্রভাব, অন্যের ঘাটতিগুলো বেশি দেখা, গুণগুলো না দেখা আমাদের বিপদগামী করে। এসব করতে গিয়ে কষ্টগুলো বেড়ে যায়, হতাশা বেড়ে যায়। তবে আমার মনে হয়, কমিউনিকেশন গ্যাপ না বাড়িয়ে এসব বিষয় নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা উচিত। মোহিত কামাল বলেন, বিয়ের ফলে একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে আপন করে। সেই মানুষের দোষও আছে গুণও আছে। দোষ-গুণ মিলিয়েই মানুষ। আমাদের এসব মেনে নিতে হবে। কিন্তু আমরা দোষটা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করি, বারবার এসব নিয়ে কথা বলতে থাকি। নিজেরও যে দোষ আছে সেটা না দেখে একে অন্যেরটা দেখি। ফলে অ্যাডজাস্টমেন্টে সমস্যা হয়। শুরু হয় পারিবারিক অশান্তি। যার চূড়ান্ত পর্যায় বিবাহ বিচ্ছেদ।



মাদকের ভয়াল থাবা

সংসারে অশান্তির অন্যতম একটি কারণ মাদক। মাদক গ্রহণের ফলে ছেলেরা হিতাহিদ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, বিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলে। ছোটখাটো বিষয়ে রেগে গিয়ে স্ত্রীকে পেটায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি অমানুষে পরিণত হয়। এ ধরনের অমানুষের সঙ্গে সংসার করা দুরূহ ব্যাপার। মাদকাসক্ত পুরুষ দ্বারা স্বামী নির্যাতনের হারটা অনেক বেশি। তবে ইদানীং নারীদেরও মাদকাসক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে তবে সেই সংখ্যাটা অনেক কম। বিশ্লেষকরা বলেন, স্ত্রীকে নির্যাতনকারী স্বামীদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। আর অন্যদিকে মাদকাসক্ত নারীরা একাধিক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক বজায় রাখে।



অন্যতম কারণ পরকীয়া

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে পরকীয়া আসক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিবাহ ও বিচ্ছেদ নিয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কাজ করছে ১৯৯৫ সাল থেকে। সিটি কর্পোরেশনের গবেষণা মতে, যেসব আবেদন ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে তার ৮৭ শতাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে কেবলমাত্র পরকীয়ার জের ধরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম্পত্য কলহ, যৌন জীবনে অসুখী হওয়া, নতুন-পুরনো সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের তারতম্য, স্ত্রীকে রেখে স্বামীর বিদেশ গমন, একাকিত্ব, একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় না দেয়াসহ অনেক সময় কৌতূহলের কারণেও পরপুরুষ বা নারীর প্রতি আগ্রহ জন্মায়। অনেক নারীই নিজের সংসারে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হন। নীরবে নির্যাতন সহ্য করতে করতে এক সময় সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। সংসারের এই বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অনেক নারীই জড়িয়ে যান পরকীয়ার নিষিদ্ধ সম্পর্কে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার কারণে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে একঘেয়েমিতা চলে আসে। তখন নতুন একজনের সঙ্গ পেলে ভালোলাগার অনুভূতি তৈরি হয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরকীয়ার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদসহ খুনের ঘটনা বাড়ছে। মনোচিকিৎসকরা বলছেন, পিতামাতার পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মধ্যে মানসিক বিষণœতা ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়।



একাকিত্ব থেকে হতাশা

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বাবা-মায়ের পছন্দের ছেলের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন ফেরদৌসী আরা শিউলি। ছোট্ট জেলা শহর ছেড়ে রাজধানীতে এসে স্বামীর সঙ্গে ঘর বেধেছেন। স্বামী শিপন চাকরি করেন বড় একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অফিস। কিন্তু অফিসের ব্যস্ততা শুরু হয় সকাল ৭টা থেকে চলে রাত ৮/৯টা পর্যন্ত। আবার যেহেতু সকালে অফিসে যেতে হবে তাই রাতে ঘুমাতে হয় ১১টার মধ্যে। এদিকে সারাদিন বাসাতে একাই থাকতে হয় শিউলিকে। স্বামীও কেমন যেন একটু বেরসিক। হয়তো ব্যস্ততার কারণেই স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরে আসা, রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়ার সময় করতে পারেন না শিপন। এভাবেই কয়েক বছর ধরে চলছে শিউলি-শিপনের সংসার। সারাদিনের একাকিত্ব আর স্বামীর টাইমের অভাব যেন জেঁকে ধরেছে শিউলিকে। দিনের পর দিন বাসায় একা থাকতে থাকতে যেন বিষণœতা ভর করেছে তাকে। ইদানীং কিছু ভালো লাগছে না তার।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইক্লোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহজাবিন হক যুগান্তরকে বলেন, একাকিত্ব মানসিক বিষণœতা সৃষ্টির অনেক বড় একটা কারণ। অনেক সংসারেই স্বামীরা বুঝতে পারেন না তার কাজের ব্যস্ততার কারণে স্ত্রীকে একদম সময় দেয়া হচ্ছে না। এজন্য অফিসে গেলে মাঝে মাঝে স্ত্রীকে ফোন দিতে হবে। মাঝে মাঝে কি করছে না করছে সেটির খোঁজ নিতে হবে। অফিস থেকে আসতে দেরি হলে বাসায় জানাতে হবে। নিজের ব্যস্ততার বিষয়টি স্ত্রীকে বোঝাতে হবে। আবার স্ত্রীকেও স্বামীর ব্যস্ততা বুঝতে হবে। ব্যস্ততার মাঝেও সপ্তাহে অন্তত একটা দিন স্ত্রীকে নিয়ে বিনোদনের জন্য পার্ক বা দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। কোনো কারণে স্ত্রী যদি বুঝতে পারে তার স্বামী তাকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন না। তাহলে তাদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টিই হবে। একাকিত্বের ফাঁদে পড়ে মেয়েরা অনৈতিক কোনো সম্পর্ক বা মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

সমাজ বিজ্ঞানী ড. সাদেকা হালিম বলেন, পারিবারিক জীবনে দুজন-দুজনকে সময় দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে পরস্পরের পাশে থাকতে হবে। ম্যারেজ ডে, জন্মদিন, ভালোবাসা দিবসসহ ছোট ছোট দিবসগুলোতে প্রিয়জনের পাশে থাকতে হবে। নিজের ভালোবাসার কথা সঙ্গীকে জানাতে হবে।



ছাড় দেয়ার মন-মানসিকতা নেই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সমাজে বিচ্ছেদের বিষয়টি আদিকাল থেকেই আছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার অনেকটাই বেড়ে গেছে। আগে যখন কোনো বিয়ে হতো সেই সম্পর্কের দায়ভার দুই পরিবারসহ অভিভাবকরা নিত। বর্তমানে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অনেক মাধ্যম হয়েছে ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েরা নিজেই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পরিবার এসব বিয়েতে সম্মতি দিলেও দায়ভার নিচ্ছে না। ফলে পারিবারিক অশান্তি বা স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড় করাতে হচ্ছে ছেলে-মেয়েকে। এসবের কারণে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পারিবারিক অনুশাসন মানার প্রবণতা কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের মেয়েরা অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। কর্মক্ষেত্রের সর্বস্তরে মেয়েরা তাদের সাফল্যের পদধূলি রেখেছে। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক পুরুষ মেয়েদের কাজ করার বিষয়টি মেনে নেয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়নি। মেয়েরা যখন প্রেমিকা থাকে তখন তাদের প্রেমিকদের অনেক কিছুই মেনে নেয়। যেমন, ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করছে তুমি কার সঙ্গে খেতে যাচ্ছ, কি পড়ছ, এর সঙ্গে মিশবা, ওর সঙ্গে মিশবা না। মেয়েটি ভাবছে এটা হয়তো কেয়ারিং বা ভালোবাসারই একটা অংশ। কিন্তু এটাও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ। ছেলেটা যখন একই কাজ বিয়ের পর করছে তখন আর মেয়েটি মেনে নিতে পারে না। কর্মজীবী মেয়েরা অনেক সময় এসবের প্রতিবাদ করে। আর যারা পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল বা কিছুক্ষেত্রে ছেলেরাও সমাজ-লোকলজ্জার ভয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আপস করেই একই ছাদের নিচে বসবাস করে।

সাদেকা হালিম বলেন, সংসার জীবনে অনেক ধরনের উত্থান-পতন থাকতে পারে। অভাব-অনটন থাকতে পারে। প্রত্যেকের ছোট ছোট ভুল থাকতে পারে। এসব ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দিয়ে পথ চলতে হয়। কিন্তু বর্তমানে আমাদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, আমাদের অনেক বেশি চাহিদা। বিয়ের আগে মেয়েরা ছেলেদের অর্থ সম্পদের বিষয়টি খেয়াল করে। এটি ছেলেদের ওপর একটি চাপ। বাড়তি চাহিদার জন্য অনেকে অনৈতিক কার্যকলাপেও জড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মূল্যবোধ কমে গেছে।

বাংলাদেশের আইনে কাজী অফিসে তালাকের আবেদনের মধ্য দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর সিটি কর্পোরেশন ৩ মাস সময় দেয় উভয়পক্ষকে সমঝোতার জন্য। যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে তালাকের আবেদনের দিন থেকেই তা কার্যকর হয়। তালাকের আবেদন করা হলে, শালিসের মাধ্যমে সংসার টিকছে এমন হার অনেক কম। সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, বিচ্ছেদের আবেদন পাওয়ার পর দুই পক্ষকে প্রতি মাসে শুনানির জন্য ডাকা হলেও ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই এ শুনানিতে কোনো পক্ষই সিটি কর্পোরেশন অফিসে যায় না। ফলে অবধারিতভাবেই ভাঙছে সংসার।



অতৃপ্ত যৌন জীবন

বিয়ে বা সাংসারিক জীবনে কোনোভাবেই যৌনতাকে বাদ দেয়া যাবে না। বরং যৌনতাকে ঘিরেই দাম্পত্য জীবনে গতি আসে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো সংসারে অভাব-অনটন থাকলে যতটা অশান্তি হবে তার চেয়ে ভয়াবহ অশান্তি হবে যদি কোনো দম্পতির যৌন জীবন সুখের না হয়। পরকীয়া বা বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে আদিম কারণ শারীরিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা।

মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি, হতাশা বা দূরত্ব বাড়ার অন্যতম একটি কারণ হল শারীরিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা। আমাদের দেশের অধিকাংশ ছেলে জানে না, একটা মেয়েকে কীভাবে শারীরিকভাবে সুখী করতে হয়। অনেকেই জানেন না, আদিম এই খেলায় ছেলের পাশাপাশি মেয়েরও পরিপূর্ণতা বা সন্তুষ্ট হওয়ার একটা ব্যাপার আছে। মেয়েদের অর্গাজম ঘটানোর ব্যাপারেও উদাসীন ছেলেরা। ছেলেদের যৌনজ্ঞানের অভাব মেয়েদেরকে চরামানন্দ থেকে বঞ্চিত করে। এভাবে দিনের পর দিন মেয়েরা বঞ্চিত হতে হতে একটা সময় তাদের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা বা হতাশার সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশের ছেলেরা মনে করে মেয়েরা শুধু ভোগের বস্তু। বিছানায় নিজের সন্তুষ্টি অর্জন হলেই সব শেষ। সঙ্গীর জৈবিক চাহিদার ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা নেই। এ রকম ঘটনা যে শুধু ছেলেদের ক্ষেত্রেই ঘটে সেটি নয়। অনেক মেয়েও তার সঙ্গীর শারীরিক চাহিদা পূরণে সচেতন, কিংবা আগ্রহী নন। এই শারীরিক অপূর্ণতাই পর-পুরুষ বা পর নারীতে আগ্রহের সৃষ্টি করে। কাজেই শারীরিক চাহিদা পূরণের ব্যাপারে উভয়কে সচেতন হতে হবে।



ভালোবাসাবাসির নয়া সংজ্ঞা

বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন ফারজানা (ছদ্মনাম)। রূপে-গুণে ফারজানা অতুলনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অগণিত ভক্ত, ফ্যান-ফলোয়ার। এদিকে এই রূপের জালকে কাজে লাগিয়ে ফারজানা একটার পর একটা প্রেম করেছেন। শুধু তাই নয় একসঙ্গে কয়েকটি প্রেম করছেন অনায়াসেই। তার সঙ্গে প্রেম করা ছেলেদের অনেকেই ফারজানার চরিত্রের বিষয়টি বুঝে বা না বুঝে শারীরিক সঙ্গ লাভের আশায় তার রূপের জালে জড়াচ্ছেন। আমাদের আশপাশে একটু খেয়াল করলেই ফারজানা বা তার মতো রোমিওদের দেখা পাওয়া খুব একটা কঠিন হবে না। সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সৃষ্টির শুরু থেকেই পৃথিবীতে প্রেম-ভালোবাসা ছিল। লাইলি-মজনু বা শিরি-ফরহাদের গল্পের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এসব ভালোবাসাবাসির সংজ্ঞা বদলে গেছে। বহু প্রেমে জড়াচ্ছেন অনেকেই। তরুণ-তরুণীদের একটা বড় অংশ একাধিক প্রেমে আসক্ত। আর বর্তমানে প্রেম মানেই অবাধে যৌন মেলামেশা। এই অবাধ যৌনাচার পরবর্তী সংসার জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কোনো কারণে স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হলে কিংবা শারীরিকভাবে সন্তুষ্ট হতে না পারলে পুরনো সঙ্গীদের সরণাপন্ন হন। অনেকে আবার অভ্যাগত ভাবেই এসব অনৈতিক কাজে প্রলুব্ধ হন। কিন্তু এই বহুগামীতার ফলাফল আসলে ভালো নয়। বহুগামীতার ফলে কোনো নারী বা পুরুষ প্রকৃত ভালোবাসা বঞ্চিত হয়ে পড়েন। সাময়িকভাবে এসব কাজে মজা পাওয়া গেলেও শেষ বয়সে গিয়ে একাকিত্বে ভুগতে হতে পারে। কাজেই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে জীবন পরিচালনা করা উচিত। নিজেদের মূল্যবোধ বাড়াতে হবে। সঠিক সঙ্গী নির্বাচন করে একমুখী হতে হবে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত