সাইফুল ইসলাম খান    |    
প্রকাশ : ২৫ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব অনেক অনাসৃষ্টির কারণ
শত প্রেমের জন্ম বিয়ের কল্পনায়। বিয়ের মাধ্যমেই প্রেমকে স্বীকৃতি দেয় সমাজ। সূচনা হয় একটি নতুন সংসারের পরিবারের পছন্দে বিয়ে করার হার এখন কমে এসেছে। আগে পরিবারের পছন্দে বিয়ে করে পরবর্তীতে নিজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার অভিযোগে ঘর ভাঙত। বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে তৈরি হচ্ছে একক পরিবার। পরিবারের পছন্দের পরিবর্তে নিজেদের পছন্দেই বিয়ে করছেন বেশিরভাগ দম্পতি। বিয়ের আগে অনেকেই বিয়ে এবং বিয়েপরবর্তী পছন্দের মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানোকে রূপকথার গল্পের মতো কল্পনা করেন। কিন্তু রূপকথার গল্প কল্পনায়ই থেকে যায়, বাস্তবে তা কখনও প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে আশা ভঙ্গের হতাশায় ভোগেন অনেকেই। এমন অবস্থায় যারা নতুন বিয়ে করছেন, তাদের মধ্যে মানিয়ে নেয়ার প্রবণতাও কমে আসে। ফলে ভাঙছে বহু ঘর।
আগে সমাজে নারীরা পিছিয়ে ছিল নানা দিক থেকে। এখন নারীরা স্বাবলম্বী হয়েছেন, সমাজে তাদের অধিকার আগের তুলনায় বহুগুণে বাড়ছে। তারা শিক্ষা গ্রহণ করছেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাচ্ছেন, চাকরি করার সুযোগ পাচ্ছেন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাচ্ছেন। আগে নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ করার কোনো সুযোগ ছিল না। বর্তমানে নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের জরিপে দেখা গেছে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে ডিভোর্স দেয়ার হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। অর্থাৎ নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সঙ্গে সংসার ভাঙার হারও বেড়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে জরিপের এমন ফলাফলকে প্রগতিবিরোধী মনে হলেও সমাজবিজ্ঞানী এবং জেন্ডার বিষেশজ্ঞরা বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
ডিভোর্সের হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম মনে করেন, বিয়ের আগে অনেক তরুণ-তরুণী যে কল্পসংসার আঁকেন, বিয়ের পরে সেই কল্পনার কোনো বাস্তবতা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। এখন প্রায় সবাই নিজের পছন্দে বিয়ে করেন। একজন আরেকজনকে কখনোই বিয়ের আগে পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়। যেমন ধরুন, রাতের বেলা ঘুমানোর সময় দেখা গেল স্বামী বা স্ত্রী নাক ডাকেন। অথবা, স্বামী বা স্ত্রীর আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে স্ত্রী বা স্বামীর স্ট্যাটাস এক ধরনের না হওয়া। একে অপরের আত্মীয় স্বজনকে নিচু মনে করা। আবার পেশার ভিন্নতার কারণেও সংসার ভাঙছে। যেমন, স্ত্রী যদি চাকরিজীবী এবং স্বামী যদি ব্যবসায়ী হন তবে দুজনের মধ্যেই সময় দিতে না পারা বা সময় না পাওয়ায় দূরত্ব তৈরি হয়। আর পরকীয়ায় জড়িয়ে সংসার ভাঙার ঘটনা তো অহরহ। স্বামী বাইরে কি করেন স্ত্রীর তা দেখার বিষয় না- এ ধারণা এখন পাল্টে গেছে। স্ত্রীরা এখন মুখ বুজে সহ্য করার পরিবর্তে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইছেন। ফলে নারীদের ডিভোর্স দেয়ার হার বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হকও মনে করেন নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্সের হার বাড়ছে। আগে সমাজে নারীর অবস্থান ছিল খুবই দুর্বল। স্বামী শত নির্যাতন করলেও স্ত্রীকে মুখ বুজে সহ্য করে থাকতে হতো। নারীর কোনো কল ব্যাক পজিশন ছিল না। স্বামীর ঘর ছাড়লে বাপের বাড়িতেও কোনো স্থান হতো না। ফলে নারীরা ছিল অসহায়, নিরুপায়। এখন সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আগে স্বামীরাই স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে পারত, এখন নারীরাও ডিভোর্স দেয়ার অধিকার পেয়েছে। মোট কথা নারীর ক্ষমতায়নের ফলে নারী এখন প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। ফলে ডিভোর্সের হার বাড়ছে। নারী কর্তৃক ডিভোর্সের হার বৃদ্ধির জন্য সবাই নারীকে দায়ী করলেও বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। কারণ পুরুষের মধ্যে যে পরুষতান্ত্রিক মনোভাব তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুরুষ এখনও নিজেকে প্রভু ভাবে। আর এখানেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
তানিয়া হক বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। ফলে নারী এখন আগের মতো পুরুষের অপমান-নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করছে না। পুরুষ নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিচ্ছে না। অর্থাৎ সমাজে নারীর অবস্থাজনিত পরিবর্তন এসেছে ঠিকই কিন্তু পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসেনি। যদি পুরুষের মাঝে নারীকে সম্মান করার মানসিকতা না আসে তবে এ হার কমবে না। তাই পরিবারে স্বামী নিজেকে প্রভু না ভেবে স্ত্রীকে সমকক্ষ ভাবলে এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা বা বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে উভয়ে উভয়ের সম্মানের দিকে লক্ষ্য রাখলে বিবাহ বিচ্ছেদের হার কমে আসবে।
জেন্ডার বিশেষজ্ঞ তানিয়া হক জানান, যৌতুক সমস্যা এবং স্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনা এখনও সমাজে বিদ্যমান। নিন্মবিত্ত পরিবারে যৌতুক সরাসরি দাবি করা হয়। আর উচ্চবিত্ত পরিবারে যৌতুককে বলা হয় ‘গিফট’। জামাইর ফ্ল্যাট সাজিয়ে দিতে হয় স্বেচ্ছায়। এটা এক ধরনের যৌতুক। মেয়ের প্রেগনেন্ট থাকাকালীন সময়ে মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে মেয়ের পরিবারের ওপর খরচ চাপানোও এক ধরনের যৌতুক। গিফটের নামে স্বেচ্ছায় ফ্ল্যাট সাজিয়ে দেয়াটা এখন কালচারে পরিণত হয়েছে। কোনো পরিবার স্বেচ্ছায় এটা না করলে তা নিয়ে শ্বশুড় বাড়ির লোকজন অসন্তুষ্ট হয় এবং তা থেকে স্ত্রীর সঙ্গে বাজে ব্যবহারের ফলে সংসার ভাঙে। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তির ফলে একে অপরের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারছে। যা নারী-পরুষকে পরকীয়া করতে সাহায্য করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, বিয়ের পরে দুজনের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এ সময় অনেকেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। আর এতে সংসার ভাঙছে। শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা বর্তমানে অনেকটা কমে এলেও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে গেছে বহু গুণে। সমাজে পুরুষ এখনও কর্তৃত্বে থাকায় নারীরা পুরুষ কর্তৃক মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ফলে নারীদের ডিভোর্স দেয়ার ঘটনা বাড়ছে। আবার অনেক নারীও স্বামীকে ভয়াবহ মানসিক নির্যাতনে রাখেন। সম্মানের ভয়ে সংসার করার অভিনয় চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত এ ধরনের সম্পর্ক আর টিকে থাকে না।
অন্যদিকে স্ত্রী সুন্দরী নন এমন মানসিকতা থেকেও বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করলেও বিয়ের পরে নারীদের শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। এতে স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেয়া গয়না স্বর্ণের না হওয়ায় স্বামীর পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে^ জড়িয়েও ঘর ভাঙার ঘটনা ঘটছে। আগে বাপের বাড়িতে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটত, এখন কাটে অভাবে, নিজের সাজগোজের টাকা স্বামী বহন করতে পারছে না এ নিয়েও সংসার ভাঙার খবর পাওয়া যায়। সর্বপরি, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা দিন দিন কমে যাওয়ায় ডিভোর্সের ঘটনা বাড়ছে।




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত