রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, শ্রীপুর    |    
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
শ্রীপুরে শিশুদের বাড়ির শিক্ষক মিনারা
বিদ্যালয় থেকে শিক্ষকদের দেয়া শিশুদের বাড়ির কাজ তৈরি করে দেন। গত এক যুগ ধরে তিনি শিক্ষিত বাবা-মায়ের কাজটি করছেন। অনেক পরিবারে এমন রয়েছেন যারা পড়াশোনা একেবারেই জানেন না। এমন বাবা-মায়ের কোমলমতি শিশুরাই তার কাছে পড়েন। বাড়ির কাজের এ শিক্ষকের নাম মিনারা বেগম (৫৫)।
শুধু শিশু শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তার কাছে পাঠ গ্রহণ করে থাকে। সারাদিন গড়ে ৪০ জন শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করে। তিনি তার বাড়ির বারান্দা ও উঠানে শিক্ষার্থীদের পড়ান। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনয়িনের কর্নপুর চৌরাস্তার পাশে মৃত তাজউদ্দিন বেপারীর দ্বিতীয় স্ত্রী মিনারা বেগম। ১২ বছর আগে তার স্বামী মারা যান। ছোট বেলা থেকে নিজেই তার সন্তানদের হাতে-কলমে পড়াশোনা করিয়েছেন। তার সন্তানরা শ্রেণীতে প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থানের মধ্যে থাকত। তার সন্তানদের সাফল্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রচার হতে থাকে বিদ্যালয় থেকে দেয়া বাড়ির কাজ মিনারা বেগম তার সন্তানদের দেখিয়ে দেন, ভালো পড়ান, যতœ করে পড়ান ইত্যাদি।
মিনারা বেগম বলেন, সন্তানদের পড়ানোর প্রচারণা তার স্বামী মৃত্যুর পর প্রকাশ পেয়েছে। স্বামী মৃত্যুর পর মানসিক কষ্ট তাকে পীড়া দেয়। অনেকদিন পর্যন্ত এ কষ্ট ভুলতে পারেননি। স্বামী নেই কিন্তু এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার চিন্তা তার মাথায় আসে। তবে বড় কিছু করার সার্মথ্য নেই। এ সময় এলাকার সহজ সরল শিক্ষাহীন পরিবারের মানুষজন তাদের সন্তানদের পড়ানোর জন্য তাগিদ দেয়। একে একে অনেক অভিভাবক ভিড় জমাতে থাকে। তাদের আর্থিক অবস্থা দেখে কোনো বিনিময় চাওয়ার ভাবনাও আসেনি তার মনে। বিনা পারিশ্রমিকেই শুরু করেন পড়ানো।
তিনি বলেন, শিক্ষা বিলানো একটি মহৎ কাজ। এ কাজটি করার মানসিকতা থেকে শিশুদের পড়ানো শুরু করি। কেউ পারিশ্রমিক দেয় আবার কেউ দেয় না। কেউ আবার যা পারে তাই দেয়। কারও কাছে আমার কোনো দাবি নেই। আমি শিশুদের শিক্ষা দিই এতেই আমার তৃপ্তি।
কর্নপুর স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী শারমীন আক্তার। তার বাবা গিয়াস উদ্দিন রিকশাচালক, মা কুলসুম আক্তার পোশাক কারখানার শ্রমিক। শারমীনের নানি রমিজা খাতুন বলেন, তার বাবা-মা কেউই পড়াশোনা জানেন না। বিদ্যালয় থেকে বাড়ির কাজ দিলে শারমীন একা করতে পারে না। তাই তাকে প্রতিদিন মিনারা বুবুর এখানে নিয়ে আসি। গরিব মানুষ মাসিক বেতন দিতে পারি না। বুবুও দাবি করেন না। আমি ও আমার পরিবার তার প্রতি কৃতজ্ঞ।
কর্নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ও ইব্রাহীমের ছেলে ইসমাইল হোসেন জানায়, বিদ্যালয় থেকে দেয়া বাড়ির কাজ দাদু ভালো করে বুঝিয়ে দেন। পরদিন ক্লাসে গিয়ে স্যারদের কাছে তা উপস্থাপন করি। স্যারেরাও বাহ্বা দেন।
পাঁচুলটিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বেপারীর কন্যা চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আফসানা সুলতানা জানায়, দাদু একবার পড়ালে খুব সহজেই বুঝে ফেলি। সিটপাড়া গ্রামের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাকিব, সিফাত, আক্তার হোসেন ও সালমা জানায়, দাদুর কাছে পড়তে যেমনি ইংরেজি ভালো লাগে, তেমনি গণিতও।
মিনারা বেগমকে তার শিক্ষার্থীরা কেউ দাদু, কেউ বুবু, কেউ বড় মা আবার কেউ কাকি মা বলে ডাকেন। মিনারা বেগম বলেন, যারা তার কাছে পাঠ নেন তারা একই এলাকার। কোনো না কোনো উপায়ে তারা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। এজন্যই একেকজনের সম্বোধনের উপাধি একেকরকম। মিনারা বেগমের শিক্ষা জীবন মাধ্যমিকের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। তার দুই ছেলে। একজন হাফেজ মান্জুরুল ইসলাম ও আরেকজন স্থানীয় শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছেন।
কর্নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, মিনারা বেগমের কাছে যেসব শিক্ষার্থী পড়েন তাদের পারফরমেন্স শ্রেণীতে ভালো। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা তার কাছে পড়েন। কিন্তু তার পড়ানো দরিদ্র নয়।
একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সামসুন্নাহার বলেন, মিনারা বেগমের কাছে যারা পড়ে তাদের বেশিরভাগই আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন মিনারা বেগম নিজে বিদ্যালয়ে চলে আসেন। তার শিক্ষার্থীদের ফলাফল জানতে প্রবল আগ্রহ থাকে তার মধ্যে। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী মানুষ।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, প্রতিটি এলাকায় এরকম উদ্যোগী মানুষ থাকলে বাংলাদেশ নিরক্ষরমুক্ত হতে সময় লাগবে না। মিনারা বেগম অতি মহৎ কাজ করছেন, যা জাতির জন্য গৌরবের।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত