• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
দাঁতের ক্ষয়রোগ প্রতিরোধে চাই সচেতনতা
আজ বিশ্ব ‘দাঁতের ক্ষয়মুক্ত ভবিষ্যৎ’ দিবস। ২০১৬ সালে ১৪ অক্টোবর সর্বপ্রথম ‘অ্যালায়ান্স ফর এ ক্যাভিটি-ফ্রি ফিউচার’ (ACFF)-এর উদ্যোগে সারা বিশ্বে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘দাঁতের ক্ষয় রোধে মোরা এক সঙ্গে, সুস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে।’ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ওরাল হেলথ প্রমোশন অ্যান্ড ডিজিজ প্রিভেনশন-এর উদ্যোগে আজ স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ডেন্টাল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে।

মুখে ঘা অবহেলা নয়

অধ্যাপক ডা. জেবুন নেছা

প্রেসিডেন্ট

মুখগহ্বরে ক্ষত বা ঘা (oral ulcer) অতি সাধারণ সমস্যা। এর সঙ্গে মুখের ক্যান্সারের সম্পর্ক আছে।

নানা কারণে এ ঘা হয়। তাই এদের চরিত্রও বিভিন্ন ধরনের। আঘাত থেকে শুরু করে অনেক গুরুতর সমস্যায় (যেমন- মুখের ক্যান্সার, পেম্ফিগাস ভালগারিস) মুখে ক্ষত হতে পারে। তবে আঘাতজনিত কারণই বেশি দায়ী। ত্রুটিযুক্ত বাঁধানো দাঁত, ধারালো দাঁত, দন্তক্ষয়, অদক্ষ হাতে ফিনিশিং করা ফিলিং, এমনকি দাঁতের আঁকাবাঁকা বা এলোমেলো অবস্থানের জন্যও মুখে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। অবহেলায় এ সাধারণ ক্ষতই ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।

এ পরিস্থিতি পরিহার করতে হলে প্রতি ছয় মাস অন্তর ডাক্তারের কাছে দাঁত ও মুখ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এর ফলে মুখে কোনো ক্ষত থাকলে তা সময়মতো শনাক্ত করা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে তা তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

রিকারেন্ট অ্যাফথাস আলসার, হার্পিস ভাইরাস গ্রুপ ইনফেকশন, লাইকেন প্ল্যানাস, পেম্ফিগাস ভালগারিস- এ ধরনের মুখের ঘা শুধু স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা এবং মুখ ও দাঁতের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে অনেকটাই পরিহার করা সম্ভব।

কিছু সিস্টেমিক ইনফেকশন আছে (যেমন- যক্ষ্মা, এইচআইভি সংক্রমণ), এর লক্ষণ হিসেবে মুখে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে মূল রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে।



দাঁত থেকে শরীরের রোগ

অধ্যাপক ডা. শাহানা দস্তগীর

মহাসচিব

ডায়াবেটিসের সঙ্গে মাড়ির রোগের সম্পর্ক এখন প্রতিষ্ঠিত। দেহে রক্ত প্রবাহের কাজ হচ্ছে কোষে অক্সিজেন ও অন্যান্য উপকরণ বহন করা এবং বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়া। ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালিগুলো সরু হতে থাকে। ফলে দেহে রক্তের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। সেই সঙ্গে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। এই সময় মাড়িতে কোনো আঘাত লাগলে প্রদাহ দেখা দেয়। কোনো মাড়ির রোগ থাকলে মাড়ির সংক্রমণ আরও বেড়ে যায়। ডায়াবেটিক রোগী যদি মাড়ির কোনো রোগে ভোগেন, তবে খুব তাড়াতাড়ি দাঁত নড়ে পড়ে যায়।

আমাদের দেশে হার্ট অ্যাটাক ও মস্তিষ্কের স্ট্রোক সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়ে গেছে। এর নানাবিধ কারণ রয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মাড়ির রোগ এই দুটি রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। মাড়ির রোগ যেসব জীবাণু দ্বারা সংঘটিত হয়, সেসব জীবাণু ও তাদের নিঃসৃত ক্ষতিকর পদার্থ রক্তনালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ফলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।



মুখগহ্বর সুস্বাস্থ্যের প্রবেশদ্বার

অধ্যাপক ডা. আফজাল হোসেন বাচ্চু

ভাইস প্রেসিডেন্ট

মুখগহ্বর হচ্ছে স্বাস্থ্যের প্রবেশ পথ। তাই মুখগহ্বর এর যত্ন নিলে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা যায়।

মুখগহ্বরের সাধারণ রোগগুলো হচ্ছে-

* দাঁতের ক্ষয়রোগ

* মাড়ির রোগ

* মুখে ক্ষত ও ক্যান্সার

* দাঁত ও চোয়ালের অসামঞ্জস্যতা

এ রোগগুলোর মধ্যে জন্মগত ত্রুটিজনিত সমস্যা ছাড়া সবগুলো রোগই প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য জ্ঞান, ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ধরন, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিছন্নতার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।

চোয়ালের ত্রুটিপূর্ণ গঠন : দাঁত, চোয়াল এবং ঠোঁটের অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবয়বের কারণে মুখমণ্ডল সৌন্দর্য ব্যহত হয়। শব্দ উচ্চারণ, কথাবার্তায় জড়তা ও অস্পষ্টতা এবং খাদ্য চর্বণেও নানাবিধ অসুবিধা হয়। এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে বংশগত কিংবা জন্মগত ত্রুটি, গর্ভকালীন মায়ের পুষ্টিহীনতা, শিশু বয়সে আঙ্গুল চোষার অভ্যাস এবং নির্ধারিত সময়ের আগে অথবা পরে শিশুর দাঁত ফেলে দেয়ার জন্য দাঁত, চোয়াল ও ঠোঁটের গঠনের সমস্যা হয়।

এই সমস্যা সংশোধনের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে যা ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। প্রাথমিক অবস্থায় কৃত্রিম ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে, আঙ্গুল চোষাসহ কিছু বদঅভ্যাস পরিহার এবং শিশু অবস্থায় পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকাংশ এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।



দাঁত শিনশিন করা

ডা. শামীম সুলতানা রুমা

জয়েন্ট সেক্রেটারি

সাধারণত ব্যাকটেরিয়া দিয়ে ক্যারিজ বা দাঁত ক্ষয় হয়। দাঁতের এনামেল শরীরের সবচেয়ে শক্ত পদার্থ দিয়ে তৈরি হলেও কিছু কারণে সেটা ক্ষয় হতে পারে।

যে কোনো কারণে দাঁতের আবরণ ক্ষয় হলেই দাঁত শিনশিন করতে পারে, যেমন অভ্যাসজনিত কারণে দাঁতে দাঁত ঘষা, জোরে জোরে দাঁত ব্রাশ করা, অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি থেকে পেটের এসিড মুখে চলে আসা, দাঁতকে সাদা করতে অনুমোদনহীন পদার্থ ব্যবহার, দাঁত দিয়ে সুতা কাটা, ক্লিপ খোলা বা আঘাতজনিত কারণে দাঁত ক্ষয় হতে পারে।

দাঁত শিনশিন করা নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই, রেজিস্টার্ড ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শমত কারণ চিহ্নিত করে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অসংবেদনশীল টুথপেস্ট যেমন দেশীয় তৈরি মেডিপ্লাস টুথপেস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ক্ষয়ের মাত্রা বা গভীরতা বাড়লে ফিলিং অথবা ক্ষেত্র বিশেষে এন্ডোডন্টিক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

ডেন্টাল ক্যারিজ বা জীবাণু দ্বারা দাঁত ক্ষয় প্রতিরোধে গর্ভাবস্থার ছয় সপ্তাহ থেকে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভস্থ শিশুর দাঁতের সঠিক গঠনে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি প্রচুর ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খেতে হবে। মায়ের বুকের দুধে দাঁত মজবুত করার অগণিত উপাদান রয়েছে, সুতরাং ফিডারের পরিবর্তে বুকের দুধ খাওয়ানোকে উৎসাহ দিতে হবে। দাঁত উঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে ও সকালে নাস্তার পর দাঁত ও মুখ পরিষ্কারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

চিকিৎসকের পরামর্শমত ডেন্টাল ফ্লস ও মাউথওয়াস ব্যবহার করা যেতে পারে। মিষ্টি জাতীয় খাদ্যের পরিবর্তে শাকসবজি, দেশীয় ফলমুল, দুধ, ছোট মাছ, দই, পনির ও প্রচুর পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ছয় মাস পরপর ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।



দাঁতের সুস্থতায় কী করবেন

ডা. এনাম আহমেদ

ট্রেজারার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের শতকরা ৬০-৯০ ভাগ স্কুলগামী শিশু এবং প্রায় শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দাঁতের ক্ষয়রোগের কারণে অস্বস্তি ও দাঁতের ব্যথায় ভুগে যা জীবনমানে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর ফলে স্কুল বা পেশাগত কাজে অনিয়মিত থাকা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। দাঁতক্ষয়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বের সব সম্প্রদায়ের মানুষ এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে সক্ষম নীতিনির্ধারকদের নিয়ে দাঁতের ক্ষয়ের প্রকোপ কমানো প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে ‘দাঁতের ক্ষয়মুক্ত ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার প্রয়োজনে দিনে দুইবার টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাস করা, দুই দাঁতের সংযোগস্থলে ডেন্টাল ফ্লসিং, চিনিযুক্ত খাবারের মাত্রা কমানো এবং ৬ মাস অন্তর বিএমডিসি রেজিস্টার্ড ডেন্টিস্টের কাছে চেকআপ ও পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে মুখগহ্বরের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার এখনই সময়।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত