প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১৫:৫৮:২০ প্রিন্ট
চমক নয়, যৌক্তিকতাই সার কথা
ড. মাহবুব উল্লাহ

দরিদ্র দেশগুলো কেন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না তা নিয়ে উন্নয়ন অর্থনীতিতে বহু মশহুর তত্ত্ব আছে। তবে এসব তত্ত্বের মধ্যে দুটি তত্ত্ব আমার কাছে খুবই বাস্তবধর্মী মনে হয়। এর একটি তত্ত্ব দিয়েছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ র‌্যাগনার নার্কসে। তার ব্যাখ্যা হল- অনুন্নত দরিদ্র দেশে মাথাপিছু আয় কম। কাজেই মাথাপিছু সঞ্চয়ও কম, এর ফলে মাথাপিছু বিনিয়োগও কম, ফলত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মাত্রাও কম। চক্রাবর্তের মতো দারিদ্র্য পরিস্থিতি দারিদ্র্যকেই বহাল রাখে।
দ্বিতীয় তত্ত্বটি প্রখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল এ বারানের। তার মতে, বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ আসে উদ্বৃত্ত থেকে। অর্থাৎ আয় থেকে ব্যয়ের পর কিছু অর্থ বা সম্পদ অবশিষ্ট থাকলে সেটি অধিকতর উৎপাদনের জন্য বা অধিকতর আয়ের জন্য বিনিয়োগ করে কাজে লাগানো যায়। বারানের মতে, উদ্বৃত্ত দু’রকম। প্রকৃত উদ্বৃত্ত এবং সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত। অনুন্নত দেশগুলোতে প্রকৃত উদ্বৃত্তের তুলনায় সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত অনেক বেশি। প্রকৃত উদ্বৃত্ত ও সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের মধ্যে পার্থক্যটি কী? প্রকৃত উদ্বৃত্ত হল, ব্যয় যেভাবেই করা হোক না কেন, তারপর যা উদ্বৃত্ত থাকে সেটিই। অন্যদিকে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত পরিমাপ করতে ব্যয়ের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়। যদি বিলাস ব্যসন ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনে প্রাপ্ত অর্থ সম্পদ ব্যয় করা হয় তাহলে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত কমে যায়। বলা যেতে পারে, এই ধরনের ব্যয় অনুৎপাদনশীল। অনুন্নত দেশের ধনীরা বিশেষ করে জমিদার ও পুঁজিপতি শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ তাদের বিশাল আয়ের একটি বড় অংশ ভোগবিলাস, আরাম-আয়েশ ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাত্রা বজায় রাখার জন্য ব্যয় করতে অভ্যস্ত। অথচ এই অর্থ সম্পদ যদি অধিকতর উৎপাদনের কাজে ব্যয় করা হতো তাহলে দেশের দারিদ্র্য হ্রাসে গতি সঞ্চার হতো, মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত এবং দেশটিও অনুন্নয়ন ও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে পারত। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, দুটি তত্ত্বের মধ্যে এক জায়গায় মিল রয়েছে। দুটি তত্ত্বেই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রথম তত্ত্বটিতে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের পরিমাণ কম কেন তার ব্যাখ্যা হিসেবে নিু আয়ের স্তরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু নিু আয়ের স্তর সত্ত্বেও তার মধ্যে যে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য রয়েছে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। যারা বিত্তশালী তাদের পক্ষে যে বেশি করে সঞ্চয় করা সম্ভব সেই সম্ভাবনা সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি। যদি দরিদ্র দেশের ধনীরা ভোগবিলাসের পেছনে অর্থ ব্যয় না করে তা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করত, তাহলে দেশের চেহারা দ্রুত পাল্টে যেতে পারত এবং দেশটিও অনুন্নত অবস্থা থেকে উন্নত অবস্থার দিকে যেতে পারত।

পাকিস্তান আমলের শেষদিকে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে সম্পদ কীভাবে অল্পসংখ্যক পরিবারের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছিল সেই সম্পর্কে একটি হিসাব করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের নামকরা অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল হক। ইনিই সেই অর্থনীতিবিদ যিনি পরবর্তীকালে হয়েছিলেন মানব উন্নয়ন সূচকের (Human Development Index বা HDI) প্রবক্তা। তিনি প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টাও ছিলেন। মূলত আইয়ুব আমলের উন্নয়ন দর্শনের রচয়িতাও ছিলেন তিনি। এই মানুষটি আইয়ুব শাসনের শেষদিকে ১৯৬৮ সালে হিসাব কষে দেখতে পেলেন ২২টি পরিবার পাকিস্তানের শিল্প পুঁজির ৬৬ শতাংশ, ইন্স্যুরেন্সের ৭০ শতাংশ এবং ব্যাংকিংয়ের ৮০ শতাংশের মালিক হয়ে বসেছে। এই তথ্যটি এক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কনভেনশনে পরিবেশন করেছিলেন ড. মাহবুব উল হক। তিনি তখন পাকিস্তান সরকারের প্রধান পরিকল্পনা অর্থনীতিবিদ। এই মাহবুব উল হকেরই রচিত গ্রন্থ আমাদের পড়তে হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে। ড. হক এই গ্রন্থে বলেছিলেন, গরিবদের তুলনায় ধনীদের প্রান্তিক সঞ্চয়ের পরিমাণ বেশি। তাই তাদের পক্ষে বেশি করে বিনিয়োগ করাও সম্ভব। সুতরাং পাকিস্তানকে এমন এক উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করতে হবে যে কৌশলের ফলে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়বে এবং ধনীরা তাদের বর্ধিত আয় বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে। বোঝা যাচ্ছে, ড. হক ১৯৬৮ সালে এসে তার প্রাথমিক অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন। পাকিস্তানের অর্থ সম্পদ ২২ পরিবারের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার তথ্য পরিবেশন করে তিনি আইয়ুবের উন্নয়নের বেলুন ফুটো করে দেন। সেই সময়ে পাকিস্তানে আইয়ুবের ‘উন্নয়ন দশক’ পালিত হচ্ছিল। ড. হকের তথ্য আইয়ুবের উন্নয়নের দাবির প্রতি বোম্বশেলের মতো আঘাত হেনেছিল। আইয়ুব খানের ওপর যারা গ্রন্থ রচনা করেছেন তারা এই বিষয়টিকে আইয়ুবের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ড. মাহবুব উল হক পরবর্তীকালে নিছক প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়নের ব্যাপারে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং উন্নয়নের বহুমাত্রিক সূচক হিসেবে মানব উন্নয়ন সূচক উপস্থাপন করেন। এই সূচকটি উন্নয়ন অর্থনীতি পাঠের অবিচ্ছেদ্য বিষয়ে পরিণত হয়। কয়েকদিন আগে মানব উন্নয়ন রিপোর্ট ২০১৫ প্রকাশিত হয়েছে। এই রিপোর্টে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন সূচক এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আরও উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই।
উন্নয়ন এখন নিছক জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, তার চেয়েও ব্যাপক কিছু। একথা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছেন, তবে উন্নয়নের জন্য প্রবৃদ্ধি অর্জন অবশ্যই করতে হবে। এখন প্রশ্ন উঠছে প্রবৃদ্ধির গুণগত মান কী? এই প্রবৃদ্ধির ফলে শিক্ষার হার বাড়ছে কিনা, মানুষের বেশিদিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ছে কিনা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারিত হচ্ছে কিনা, পরিবেশের উন্নয়ন হচ্ছে কিনা এবং সর্বোপরি আয় বণ্টনে সু-সাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কিনা।
জাতীয় আয়ের সিংহভাগ যদি মুষ্টিমেয় ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে পুঞ্জীভূত হয় এবং তা যদি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কাজে ব্যয়িত না হয় তাহলে উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে এক ধরনের উচ্ছ্বাস সরকারি ও বেসরকারি মহলের মধ্যে লক্ষ করা যায়। আয় বণ্টনে বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। কিন্তু ড. মাহবুব উল হক যে রকম সুস্পষ্ট তথ্য দিয়ে ২২টি পরিবারের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার তথ্য তুলে ধরেছিলেন সে রকম প্রয়াস এখনও বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশে যে একটি বিত্তশালী ধনিক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে সেটি খালি চোখেও ধরা পড়ে। ঢাকার রাস্তায় আমরা তিন কোটি টাকার মোটরযান চলতে দেখি, বিয়ে-শাদিতে ১৫-২০ হাজার লোককে ভূরিভোজন করাতে দেখি, ধনী লোকদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হেলিকপ্টারে চলাফেরা করতে দেখি, অনেক ধনী ব্যক্তির বাগানবাড়ির জৌলুস দেখি, মর্মর পাথরের তৈরি অনেক ধনীর বাসাবাড়ি ও ফ্ল্যাট দেখি, বিদেশে অবকাশ যাপনের অনেক কাহিনী শুনি, অনেক ধনী ব্যক্তিকে হাজার হাজার ডলার দামের স্যুট ও পোশাক-আশাক পরতে দেখি, ধনীরা তাদের সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে, মামুলি অসুস্থতায় ধনীরা সিঙ্গাপুর, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নিতে যায়, পাঁচতারকা হোটেলে ধনীদের নানা অজুহাতে ভোজসভার আয়োজন করে, পার্টি কালচারও এখন কালচারের অংশ হয়ে গেছে- এসবের পাশাপাশি দরিদ্র ও দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করা মানুষের করুণ দুর্দশাও আমরা প্রত্যক্ষ করি। ভোগবিলাসের যে তালিকা দেয়া হল তা ছাড়াও আরও বহু ধরনের ভোগবিলাস আছে, যেগুলো সাদা চোখে ধরা পড়ে না। এক কথায় বলা যায়, উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রকৃত উদ্বৃত্ত সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশ যদি তার সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের পুরোটাই কাজে লাগাতে পারত তাহলে অনুমান করা যায় প্রবৃদ্ধির হার আরও ২-৪ শতাংশ বেশি হতে পারত।
বাংলাদেশে ভোগবিলাস ও জৌলুসে যে অর্থ ব্যয় হয় তার একটি বড় অংশ আসে দুর্নীতি থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্নীতি হ্রাস করতে পারলে বাংলাদেশ আরও দুই শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারত। কিন্তু সে ব্যাপারে কোনো বাস্তবধর্মী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আমরা লক্ষ্য করি না। দুর্নীতি দমন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কমিশন দুর্নীতিবাজদের ধোপ-দুরস্ত করার ব্যাপারেই বেশি উৎসাহী। এমনটি চলতে থাকলে হারিয়ে যাওয়া দুই শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি আমরা কখনোই পাব না। দেশে শত-সহস্র কোটি টাকা ব্যয়ে অনেক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। অথবা এ ধরনের প্রকল্প নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে বা হবে তার যৌক্তিকতা স্বচ্ছ হওয়া বাঞ্ছনীয়। যদি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের চেয়ে বেশি ব্যয় করা হয়, তাহলে ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। গোড়াতেই উন্নয়নের জন্য সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের কথা বলা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে যদি যৌক্তিক ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় দেখানো হয় তাহলে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত অপচয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এরকম পরিস্থিতি ধনী-দরিদ্র কোনো দেশের জন্যই কাম্য হতে পারে না। বরং ব্যয় যৌক্তিকসীমার মধ্যে রাখা গেলে আরও বাড়তি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। অনেক সময় শুধু দুর্নীতির কারণেই অধিকতর ব্যয় হয় না, প্রকল্প বাস্তবায়নে অযোগ্যতা এবং অদক্ষতাও অধিক ব্যয়ের একটি কারণ। অবশ্য প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং গুণগত মানের দিক থেকে খারাপ হওয়া মূলত দুর্নীতির জন্য প্রণোদনা থেকেই উদ্ভূত হয়।
২২ ডিসেম্বর অর্থনীতিবিষয়ক দৈনিক ‘বণিক বার্তা’ একটি লিড স্টোরি করেছে। এই স্টোরিটির শিরোনাম হল ‘টানেল নির্মাণে চীন-ভারতের চেয়ে বেশি ব্যয় বাংলাদেশে’। এই স্টোরিতে স্তম্ভচিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে টানেল নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ভারতে ১২০০ কোটি টাকা, চীনে ১৩০০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশে ২৪৯০ কোটি টাকা। অবিশ্বাস্যই বটে। এই স্টোরিতে তুলনামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘ভারতের সর্ববৃহৎ রেল টানেল উদ্বোধন করা হয় ২০১৩ সালে। জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ টানেলের নাম পীর পাঞ্জাল টানেল। এটি নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি রুপি বা ২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২২৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
এছাড়া শ্রীলংকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল ও সমুদ্র সেতু (সি ব্রিজ) নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার বা ২৮ হাজার কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্পটির অর্থায়নে সম্মত হয়েছে। সেতুসহ টানেলটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ১ হাজার ২৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
চীনেও টানেল নির্মাণ ব্যয় প্রায় একই রকম। দেশটির হলুদ (ইয়েলো) নদীর তলদেশে ৫৮৫ মিটার দীর্ঘ টানেল নির্মাণ করা হয় ২০১৩ সালে। এতে ব্যয় করা হয় ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৭৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটার হিসাবে ব্যয় ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা।
বিশ্বের দীর্ঘতম টানেলটিও নির্মাণ করা হচ্ছে চীনে। গত বছর কাজ শুরু হওয়া টানেলটিতে দ্রুতগতির ট্রেন ও গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা থাকছে। ১২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ টানেলের ৯০ কিলোমিটারই সমুদ্রের নিচে। চীনের লিয়াওডং পেনিনসুলার ডালিয়ান থেকে শ্যানডং পেনিনসুলার ইয়ানতাই পর্যন্ত টানেলটি নির্মাণে ১০ বছর সময় লাগবে। ডালিয়ান-ইয়ানতাই টানেল নামে পরিচিত এ প্রকল্পে সড়ক-রেল ও পরিষেবা সংযোগ লাইনের জন্য তিনটি পৃথক টিউব থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার বা ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা। তবে পরিষেবা সংযোগ টিউবটি বাদ দিলে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী সড়ক টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৬৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ২ হাজার ৪৯০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। যদিও টানেল নির্মাণে বিশ্বব্যাপী একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
পুরো বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। এটা সত্য যে, টানেল নির্মাণে বাংলাদেশের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যেহেতু টানেল নির্মাণ প্রযুক্তি পৃথিবীর সব দেশেই প্রায় একই ধরনের, সেহেতু ব্যয়ে হেরফের ঘটতে পারে প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত শ্রমিকের মজুরির ব্যয়ে তারতম্যের ফলে, দ্বিতীয়ত প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতায় তারতম্যের ফলে। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের প্রস্তাবনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের উচিত হবে ব্যয়ের বিষয়টিকে খুবই যতেœর সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা, যাতে কোনো প্রশ্ন উঠতে না পারে। গরিব দেশের মানুষের করের অর্থে যে প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে তা যেন দেশের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে। সর্বোপরি ব্যয় ও উপযোগের নিরিখে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা বিচার করতে হবে। অর্থনীতি শাস্ত্রের পাঠ থেকে আমরা জানি, প্রকল্পের ব্যয় যদি বেশি হয় তাহলে প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত উপযোগ সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা দেয় না। বাংলাদেশে শুধু কর্ণফুলী টানেল নয়, এমন ধরনের আরও বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়ার প্রয়োজন আছে। যমুনা সেতুর আয়ু কমে আসছে, তাহলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যমুনা নদীর নিচে আরেকটি টানেল তৈরি করার কথাও ভাবা যেতে পারে। কর্ণফুলী টানেলের ব্যয় কিলোমিটারপ্রতি চীন বা ভারতের পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হলে যমুনা টানেলের কথাও আমরা ভাবতে পারি। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় হ্রাস করে অন্য আরেকটি প্রকল্পও নেয়া যায়। অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের যৌক্তিক ব্যবহারই আমাদের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে পারে। যমুনা টানেল না করলে আমরা সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য সুচিন্তিত প্রকল্প হাতে নিতে পারি। আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। অগ্র-পশ্চাৎ চিন্তা না করে শুধু প্রকল্পের চমক দেখানো সুস্থ উন্নয়নের পথ হতে পারে না।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত