ড. কুদরাত-ই- খুদা বাবু    |    
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশের দিন আজ

আজ ২৯ জানুয়ারি। ১৭৮০ সালের এই দিনে ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্র নামক জ্ঞানভাণ্ডারের যিনি শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি হলেন জেমস অগাস্টাস হিকি। ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’-এর সম্পাদক, প্রকাশক তথা ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের শুভ সূচনাকারী হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। সংবাদপত্রে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন, নির্ভীক, নিরপেক্ষ, সাহসী ও সংগ্রামী এক পুরুষ।

হিকি ছিলেন জাতিতে ইংরেজ। ১৭৭৪ সালে তিনি ভাগ্যান্বেষণে ইংল্যান্ডের বাকিংহাম থেকে ভারতের হিজলিতে আসেন। কর্মজীবনের প্রথমে তিনি জাহাজের ব্যবসা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত এ ব্যবসাতে বড় ধরনের মার খেয়ে খবরের কাগজ বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই সিদ্ধান্তের ফসল হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’। ট্যাবলয়েড সাইজের দুই পাতাবিশিষ্ট ইংরেজি ভাষার প্রকাশনা সাপ্তাহিক এ পত্রিকাটি হিকি কর্তৃক প্রকাশিত ও সম্পাদিত হতো বলে জনসাধারণের কাছে তা ‘হিকির গেজেট’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিল।

হিকির গেজেটে বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও সাহসী সংবাদ প্রকাশের ফলে হিকির গুণগ্রাহীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার শত্রুও বাড়তে থাকে। সরকারের অপকার্যের কঠোর সমালোচনা করার জন্য হিকিকে জব্দ করার জাল যতই বিস্তৃত হতে থাকল, হিকিও ততই মরিয়া ও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। বিশেষ করে গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস আর সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি ইলিজা ইম্পে প্রচণ্ডভাবে ক্ষেপে যান হিকির ওপর এবং তাকে জব্দ করার উপযুক্ত সময়টুকুর জন্য তারা অপেক্ষা করতে থাকেন।

হিকি তার গেজেটের ৪৩তম সংখ্যাতে লিখলেন, ‘কলকাতার ইংরেজরা দেশের মঙ্গলের জন্য এ ধরনের সংস্থা গড়ে তোলায় হেস্টিংস ভয় পেয়েছেন। তার আশংকা, এতে তার (হেস্টিংসের) নাম কলংকিত হবে’। এ খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পরই হেস্টিংস ভারতবর্ষের প্রথম খবরের কাগজটির ওপর সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারের কাছ থেকে পত্রিকাটি যেসব সুযোগ-সুবিধা পেত তা প্রত্যাহার করে নিলেন। ‘কাউন্সিল অব বেঙ্গল’কে দিয়ে ১৭৮০ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি পাস করিয়ে নিলেন- জেনারেল পোস্ট অফিসের মাধ্যমে হিকি আর তার কাগজ পাঠাতে পারবেন না গ্রাহকদের কাছে। এ ঘটনার পর হিকি তার গেজেটে ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তাকে হোমারের মতো ছোট ছোট গাথা রচনা করে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি করে বেড়াতে হয়, তবুও তিনি সরকারের অন্যায় কাজের বিরোধিতা করা বন্ধ করবেন না।’

এরপর শুধু হেস্টিংস নয়, হেস্টিংস পত্নীর বিরুদ্ধেও হিকি তার গেজেটে তুলেন সমালোচনারা ঝড়। হেস্টিংস পত্নী সম্পর্কে হিকি লিখলেন, ‘সেই সহৃদয়া মহিলার কথা যা শুনেছি, তাতে তার প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলছি, তার উদার স্বভাবের সুযোগ নিয়ে যদি তার স্বামীকে প্রভাবিত করে আমাকে কোনো সুযোগ দিতে বলি এবং তার স্বামীও স্ত্রীর প্রতি অসন্দিগ্ধ ভালোবাসায় অভিভূত হয়ে তার অন্যায় অনুরোধ মেনে নেন- তবে সেটা খুব সুখের হবে না।’ কলকাতার মানুষ ১৭৮০ সালের অক্টোবর সংখ্যায় হিকির গেজেটে খবরের এ অংশটা দেখে টানটান হয়ে বসল। স্ত্রীর প্রতি এ আক্রমণে হেস্টিংস যখন আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ, হিকি তখন নাটকীয়ভাবে তার গেজেটের প্রথম বছরের ৪৩তম সংখ্যায় লিখলেন, ‘কাগজের জন্য তার এখন তিনটি জিনিস হারানোর আছে। সে তিনটি জিনিস হল তার সম্মান, তার স্বাধীনতা এবং তার জীবন। প্রথমটির জন্য তিনি পরের দুটি হারাতে রাজি আছেন। তাকে অন্যায়ভাবে আটক রেখেও তার ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করে, সন্ত্রাস, অত্যাচার চালিয়েও তাকে নিরস্ত করা যাবে না। তার যে সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষমতা আছে, তা কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা তার প্রভু সম্রাট ও তার হাত থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। কোম্পানি বা তার কর্মচারীদের এমন ক্ষমতা দেয়াটা ব্রিটিশ সম্রাটের অভিপ্রেতও নয়।’ হিকি তার গেজেটে এরপর থেকেই হেস্টিংস, কর্নেল পিয়ার্স, সিমন ড্রোজ প্রমুখের বিরুদ্ধে সরাসরি লিখতে থাকলেন। তার আক্রমণের আঘাতটা বেশি করে পড়তে থাকল হেস্টিংস পত্নীর ওপর। আর তাতেই কিছুটা পত্নীপ্রেমেবশংবদ হেস্টিংস মামলা আনলেন হিকির নামে। মামলায় দু’দফা অভিযোগের জন্য ৪০ হাজার করে মোট ৮০ হাজার টাকার জামিন দেয়া হল তাকে। টাকা দিতে না পারায় তাকে জেলেই থাকতে হল গভর্নর হেস্টিংসের করা মামলায়। জেল থেকেই হিকি চালাতে থাকলেন তার কাগজ। আক্রমণের ধার তাতে হল আরও তীক্ষ্ণ। জেল থেকে এক সময় হিকি ছাড়া পেলেও হেস্টিংস তার এ পরম সমালোচকটির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য এবার হিকির বিরুদ্ধে করলেন ক্ষতিপূরণের মামলা। আর বিচারপতি ইম্পেকে দিয়ে (যে ইম্পেকে দিয়ে হেস্টিংস একদিন নন্দকুমারকে জালিয়াত প্রমাণিত করে ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ জারি করেছিলেন) হেস্টিংস কৌশল খাটিয়ে বিচার করালেন হিকির বিরুদ্ধে। শত্রুর মুখ বন্ধ করার জন্য হেস্টিংসের ইঙ্গিতেই ১৭৮২ সালের মার্চ মাসে প্রধান বিচারপতি ইম্পে বাজেয়াপ্ত করালেন হিকির প্রেস, ছাপার কাগজ, যন্ত্রপাতি সবকিছু। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হিকিকে তারা করে দিলেন একেবারে নিঃস্ব। পরবর্তীকালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবারও হিকি তার সংবাদপত্রকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন; কিন্তু টাকার অভাবে সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আর এভাবেই অস্তমিত হয়ে গিয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্রের রক্তিম সূর্য। এক সময় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে নিজ মাতৃভূমি ব্রিটেনে যাওয়ার অর্থ সংগ্রহের জন্য চীনের উদ্দেশে জাহাজে যাত্রা করেন জাগ্রত বিবেক জেমস অগাস্টাস হিকি। কিন্তু তার আর চীনে যাওয়া হল না। তার আগেই সাড়া জাগানো বহু খবরের সাংবাদিক হিকি নিজেই হয়ে গেলেন সংবাদ। ১৮০২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ প্রকাশিত হল ছোট্ট একটি খবর- ‘চীনে যাওয়ার পথে সমুদ্রে জাহাজের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন জেমস অগাস্টাস হিকি।’

ভারতবর্ষের সর্বপ্রথম এ সংবাদপত্রটির অতিমাত্রায় স্পষ্টবাদিতা, বস্তুনিষ্ঠতা আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ একে বেশি দিন টিকতে দেয়নি একথা সত্যি; তবে এর চেয়ে আরও বেশি সত্যি হল, হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ ভারতীয় উপমহাদেশে এমন এক সংবাদ বিপ্লবের শুভ সূচনা করে দিয়েছিল, যার ঢেউ ক্রমান্বয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের (বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) সংবাদপত্রগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সংবাদের পরিবেশক এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জেমস অগাস্টাস হিকি আজ আর কেবল একটি নাম-ই নয়, এক ইতিহাসও বটে। আজ ২৯ জানুয়ারি হিকির বেঙ্গল গেজেট প্রকাশের ২৩৬ বছরপূর্তিতে তাকে স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে।

ড.কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

[email protected]


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত