মোনায়েম সরকার    |    
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
শামস কিবরিয়া নিরন্তর প্রেরণা

কিবরিয়া ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হতো না এমন দিনের কথা আমার মনে পড়ে না। দেখাও হতো ঘনঘন। সেই ১৯৯১ সাল থেকে তার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ক্রমে বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছিল। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে দেশের শত শত বিশিষ্টজনের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। কই, কারও সঙ্গে তো এত অল্প সময়ে এত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। নিজ গুণে তিনি তার পরিবারের একজন সদস্যও করে নিয়েছিলেন আমাকে।

তারপরও ‘মোনায়েম’ বলে ডাকতে পারতেন আমাকে, ‘তুমি’ও বলতে পারতেন বয়সের কারণে। কিন্তু আমাকে তিনি বরাবরই বলতেন ‘মোনায়েম সাহেব’। খুব যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন কিবরিয়া ভাই। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনতেন। সব কাজ করতেন গুছিয়ে। আমি কিছুটা অগোছালো, আবেগপ্রবণ। কিবরিয়া ভাই মাঝে মাঝে ঠাট্টা করতেন সংসার করিনি বলে। ভুল-ত্র“টি মার্জনা করতেন। আমিও ভেতরে ভেতরে তার আশ্রয় ও স্নেহের কাঙাল হয়ে পড়েছিলাম।

কিবরিয়া ভাই আদর্শ ও লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। কী দেশে, কী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার মেধা, প্রজ্ঞা ও গুণের কথা কারও অবিদিত নয়। কর্তব্যনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ এই ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সব বোদ্ধা নারী-পুরুষের মনে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। উত্তর আকাশের উত্তর মেরুবিন্দুর নিকটতম নক্ষত্র ধ্র“বতারার মতো তার স্থির অবস্থান। সমাজ ও মানুষকুলের জন্য এক অনন্য প্রেরণা। অথৈ সমুদ্রে দিকহারা নাবিক অথবা গভীর অরণ্যে পথহারা পথিক যেমন ধ্রুবতারার অবস্থান দেখে সঠিক দিক নির্ণয় করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, তেমনি ধ্রুবতারাসম কিবরিয়া ভাইয়ের লক্ষ্য ও আদর্শ আমাদের নিরন্তর প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল আমার উদ্যোগে ও কিবরিয়া ভাইয়ের নেতৃত্বে। তার ইচ্ছায় আমি ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদের দায়িত্ব নিই। ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার ১০ বছরে অসংখ্য সেমিনার করেছি কিবরিয়া ভাইয়ের নেতৃত্বে।

সফল আমলা জীবন শেষে ১৯৯১-এ তার আওয়ামী লীগে যোগদানের পেছনে আমারও যৎসামান্য ভূমিকা ছিল। শেখ হাসিনা তাকে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করতে দ্বিধা করেননি। তিনি সভানেত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা পদের দায়িত্বে আসীন হন তার মেধা ও প্রজ্ঞার গুণে। ১৯৯৬ ও ২০০১-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় দলের পক্ষ থেকে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আমিও নির্বাচন-পরিচালনা কাজে যুক্ত ছিলাম। সেই সময় রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে অধিকাংশ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তার নেতৃত্বেই আমরা গিয়েছি। প্রেস মিট করেছি কতবার। দেখেছি তার বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, বলার ও বোঝানোর ক্ষমতা। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসে আওয়ামী লীগ তাকে অর্থমন্ত্রী বানিয়ে যে ভুল করেনি, গোটা জাতি এখন তা স্বীকার করে। আমি অর্থনীতি ভালো বুঝি না। কিন্তু কিবরিয়া ভাই যখন বলতেন, পার্লামেন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতেন কিংবা মৃদুভাষণে বসে বিভুরঞ্জন বা হাসান মামুনকে ব্রিফ করতেন, আমার কাছে খুব সহজবোধ্য মনে হতো।

কিবরিয়া ভাইয়ের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। দেশে ও বিদেশে তার চিকিৎসা চলছিল। আমাদের উৎকণ্ঠা ছিল। আবারও নির্বাচনে দাঁড়ানোর দৃঢ় মনোভাব ছিল তার। আমি কিবরিয়া ভাইকে বলেছিলাম, নির্বাচন না করে ’৯৬ সালের মতো অর্থমন্ত্রী হতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সরকার সাহেব, এমপি না হয়ে মন্ত্রী হলে অন্যরা করুণার দৃষ্টিতে দেখে।’ দেশ নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা ছিল তার। বলতেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার না হলে জনগণ চাইলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারবে না। হরতালে তার ব্যক্তিগত আপত্তি ছিল, তারপরও তিনি বলতেন, ওরা যা করছে তাতে হরতাল ছাড়া করবেনটা কী। বেগম জিয়ার সরকারকে তিনি বলতেন, ‘টেফ্লন সরকার’। বলতেন, এর গায়ে কোনো কিছুই যেন লাগছে না, সব পিছলে যাচ্ছে। দেশে মৌলবাদী উত্থানের শংকা তার মনে ছিল পুরোপুরি। বলতেন, মোনায়েম সাহেব, আপনি তো গ্রামে যান না। তাই বুঝতে পারছেন না ভেতরে ভেতরে কী সর্বনাশ হয়ে চলেছে। গ্রামগঞ্জে সন্ত্রাসী মৌলবাদীরা মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। ক্ষমতায় গেলেও আমরা এই নেতিবাচক পরিবর্তনের ধারা ঠেকাতে পারব কিনা কে জানে। মাঝে মাঝে খুব হতাশও হয়ে পড়তেন। বলতেন, চলেন দেশ-টেশ ছেড়ে চলে যাই। ওরাই থাকুক এদেশে। ১৭ আগস্ট বোমা হামলায় কিবরিয়া ভাইয়ের সতর্কবাণীর কথা স্মরণ হল।

এসবই বলতেন, কিন্তু তার কাজকর্মে হতাশার কোনো ছাপ দেখতাম না। দারুণ প্রত্যয়ী হয়ে তিনি লিখতেন, বক্তৃতা করতেন। হবিগঞ্জে জীবনের শেষ যে বক্তৃতা করেছেন, তাতেও রয়েছে সেই প্রত্যয়ী মনোভাব। ‘বাংলাদেশের সামাজিক বিবর্তন কি পশ্চাতমুখী?’ শিরোনামে তার শেষ যে অসমাপ্ত লেখাটি পাওয়া গেছে, তা পড়লে বোঝা যাবে তার উৎকণ্ঠা। দেশের মানুষও তো উৎকণ্ঠিত। মৃদুভাষণ লিখেছে, ‘উদ্বিগ্ন মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। তাকে বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়া হল না।’

২৭ জানুয়ারি রাতে যখন তার ওপর বোমা হামলার দুঃসংবাদ এলো, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। তার তো হবিগঞ্জ থেকে ফিরে শুক্রবার সকালে আমাকে নিয়ে অফিসে বসে ‘মৃদুভাষণে’র কভার ডিজাইন ফাইনাল করার কথা। কিন্তু তা আর হল না।

অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও কিবরিয়া সাহেবের মতো এমন অসামান্য মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্য অর্থমন্ত্রী বাংলার ইতিহাসে আর হবে কিনা এ নিয়ে আমার মনে এখনও সংশয় আছে।

মোনায়েম সরকার : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ




 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত