তাইসির মাহমুদ    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ভালো নেই লন্ডন
সকালে ঘুম থেকে জেগে মোবাইল ফোন হাতে নিতে ভয় হয়। কারণ হোয়াটস-অ্যাপ কিংবা ফেসবুক খুললে যে কোনো একটি দুঃসংবাদ পাওয়া যাবেই। বাসার আশপাশে কোথাও এসিড অ্যাটাকের ঘটনা ঘটেছে। এসিডে ঝলসে যাওয়া ব্যক্তির বীভৎস ছবি দেখতে হবে। অথবা শোনা যাবে কোথাও আগুন ধরেছে। এক ব্যক্তি চারতলার ওপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মর্মান্তিকভাবে মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অনেকেই। দশ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। অথবা দশজন পথচারীর ওপর গাড়ি তুলে দিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়েছে। হতাহত ব্যক্তিরা হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
কোন শহরের কথা বলছি? কোথায় ঘটছে এসব ঘটনা? নাহ, তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে নয়। এসব ঘটছে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ শহর লন্ডনে। যে শহরের মানুষরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যে শহরে কেউ কাউকে ফুল দিয়েও ঢিল মারার চেষ্টা করে না। এই শহরেই ঘটছে এসব ঘটনা।
বর্ণনা শুনে অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। বিশেষ করে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যারা লন্ডনে আসতে চান তাদের কাছে এই শহরের বর্তমান হাল শুনে অবাক লাগবে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়েও অবস্থা আরও খারাপ।
ঘর থেকে বের হতে ভয় হয়। একা বের হতে তো ভয় হয়ই, সপরিবারে বের হলে ভয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। কারণ বাইরে যদি কেউ এসিড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দরজা খুলে বের হতেই যদি এসিড ছুড়ে মারে তাহলে কী হবে? ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে গেলে আপাতত নিরাপদ মনে হয়। কিন্তু নাহ, গাড়িতে উঠে উইন্ডো বন্ধ করে ভালোভাবে লক করার আগ পর্যন্ত কিছুতেই নিরাপদ নয়। কারণ খোলা উইন্ডো দিয়ে এসিড ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটছে অহরহ। শুধু এসিড সন্ত্রাসই নয়। ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে আটকেপড়া গাড়ি রড দিয়ে আঘাত করে ভেঙে দেয়া হচ্ছে। ভুলবশত গাড়ির উইন্ডো খোলা থাকলে রড দিয়ে আঘাত করে চালক ও যাত্রীর হাত-পা ভেঙে দেয়া হচ্ছে। তাই গাড়ির ভেতরেও নিরাপত্তা নেই। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটার সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। কে, কোন দিক থেকে আসবে? উপরে গাড়ি তুলে দিবে। দূর থেকে ছুড়ে দিবে এসিড।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, লন্ডনে ১৩ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে মাত্র ৯০ মিনিটের মধ্যে পাঁচটি এসিড অ্যাটাকের ঘটনা ঘটেছে। তাও অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। নর্থ লন্ডনে গ্রেনফিল টাওয়ার ট্র্যাজেডির পর কমপক্ষে ১০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে আরও এক বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা ক্যামডেনে। একটি মার্কেটে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার খবর আছেই।
সম্প্রতি লন্ডন মুসলিম সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল পুলিশের টাওয়ার হ্যামলেটস বারা কমান্ডার স্যু উইলিয়ামের সঙ্গে। তার কাছে এসিড অ্যাটাক ও অগ্নিদুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়েছিলাম। প্রশ্নটি শুনে তার মুখে কিছুটা বিরক্তির ছাপ লক্ষ্য করলাম। বললেন, এসিড অ্যাটাকের ঘটনাগুলো ঘটছে বিভিন্ন কারণে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহ, মাদক ব্যবসা, ডাকাতি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে। হেইট ক্রাইমের (ঘৃণাজনিত অপরাধ) কারণে এসিড অ্যাটাকের ঘটনা ঘটছে খুব কম। আর অগ্নিকাণ্ড বৃদ্ধির বিষয়টিও তার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বললেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা হামেশাই ঘটে। এখন বেশি মনে হচ্ছে কারণ, গ্রেনফিল টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। কোথাও ছোট একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। সারাক্ষণ মাতামাতি চলছে। তাই মনে হচ্ছে বেশি বেশি আগুনের ঘটনা ঘটছে। আসলে এসব স্বাভাবিক।
পুলিশ কমান্ডারের বক্তব্য শুনে নিজেকে কিছুটা বেআক্কেলই মনে হল। এই লন্ডনে কি একেবারেই নতুন এলাম। এক দু’বছর করে তো চৌদ্দ বছর কাটিয়ে দিলাম। এসেছিলাম একা। এখন স্ত্রীসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার। গত চৌদ্দ বছর লন্ডন শহরকে তো কাছে থেকে দেখলাম। পারিবারিক কলহ, ডাকাতি, কি আগে ছিল না? ছিল, কিন্তু এভাবে মাত্র ৯০ মিনিটে পাঁচটি এসিড অ্যাটাকের ঘটনা তো কখনও ঘটেনি। সারা বছরে হয়তোবা দু’চারটি ঘটনা ঘটেছে। তাও সব পূর্ব লন্ডনে নয়। কিন্তু এখন পূর্ব লন্ডন তো দুর্ঘটনার অকুস্থলে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ কমান্ডার যা বলেছেন তা সরকারি বক্তব্য। তবে বেসরকারি খবরে এই ঘটনাগুলোকে হেইট ক্রাইমই বলা হচ্ছে। মুসলমান হওয়ার কারণে ঘৃণা করে হামলা করাই হেইট ক্রাইম। শরীরের চামড়ার রং সাদা না হয়ে কালো বা বাদামি হওয়ার কারণে হামলা চালানোই হেইট ক্রাইম। আসলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। পুলিশ কমান্ডারও ঢাকতে পারছেন না।
হেইট ক্রাইমের ঘটনাগুলো ঘটছে ইসলাম বিদ্বেষ থেকে। মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ সবসময়ই কিছু না কিছু ছিল। তবে এগুলো আলোচনায় তেমন উঠে আসেনি। কিন্তু গত কয় মাস ধরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ম্যানচেস্টার ও লন্ডন ব্রিজ হামলার পর মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ আকারে। নর্থ লন্ডনের ফিন্সবারি পার্কে নিহত মকরম আলীর কথা আমাদের সবারই জানা। তারাবির নামাজ শেষ করে পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি তিনি। শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর গাড়িচাপায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে দশজন। ঘটনার পর বেশ কয়েকটি মসজিদে উড়ো চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে মসজিদ পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। মকরম আলী নিহত হওয়ার পর ফিন্সবারি পার্ক মসজিদেও উড়ো চিঠি এসেছে। এতে বলা হয়েছে, গাড়িচাপা দেয়ার ঘটনা একটি সতর্কতা মাত্র। খুব শিগগিরই মসজিদে রক্ত গঙ্গা বইয়ে দেয়া হবে। এসব উড়ো চিঠির খবর পুলিশকে জানানোর পরও মসজিদগুলোর নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে মিডিয়ায় খবর এসেছে। সংশ্লিষ্ট মসজিদগুলোর মুসল্লিরা চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।
আমাদের পূর্বপুরুষরা ষাট ও সত্তর দশকে যখন ব্রিটেন আসেন তখন ইসলামোফোবিয়া (ইসলাম বিদ্বেষ) ছিল না। ছিল বর্ণবাদ। তারা রাস্তায় একা হাঁটাচলা করতে পারতেন না। দলবেঁধে চলাফেরা করতে হতো। নতুবা যখন-তখন বর্ণবাদীরা অভিবাসী মানুষের ওপর হামলে পড়ত। সিলেটের আলতাব আলীকে তো বর্ণবাদীদের হাতে প্রাণ দিতে হল। এখন সান্ত্বনা এই যে, হোয়াইট চ্যাপেলে তার নামে একটি পার্ক আছে। আলতাব আলী পার্ক। এই আলতাব আলীর মতো মানুষের রক্তের বিনিময়েই পূর্ব লন্ডন থেকে বর্ণবাদ বিদায় নিয়েছিল। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ আবাস পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে বর্ণবাদ। আগে শরীরের চামড়া কালো হওয়ার কারণে বাঙালিরা হামলা ও নির্যাতনের শিকার হতেন। আর এখন নির্যাতিত হতে হচ্ছে মুসলিম হওয়ার কারণে, পোশাকের কারণে। মুসলিম হওয়াটা যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন এলে আমাদের জনপ্রতিনিধিদের চারপাশে গুনগুন করতে দেখি। টিভি ক্যামেরার সামনে চেহারা দেখানোর জন্য তারা ঘুরঘুর করেন। ‘ওয়ান কমিউনিটি’র কথা বলে বাগাড়ম্বর করেন। তারা আজ কোথায়? অগ্নিদুর্ঘটনা, এসিড অ্যাটাক আর গাড়িচাপার পর তো কিছু করতে দেখি না। এই দুঃসময়ে তাদের কি কোনো দায়দায়িত্ব নেই?
তাইসির মাহমুদ : সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ, লন্ডন




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত