• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯
সাজ্জাদ আলম খান    |    
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বাজারে অদৃশ্য হাতের কেরামতি ও প্রতিযোগিতা কমিশন
সহকর্মীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম- কোন হাত শক্তিশালী? উত্তর মিলল- কেন, ডান হাত! অবশ্য কারও কারও বাম হাতে জোর বেশি; তারা নানা কাজে বাম হাত ব্যবহার করে থাকেন। তবে বাংলায় হাত শব্দের বিভিন্ন প্রকার ব্যবহার আছে। এতে শব্দের মানেও পরিবর্তন হয়ে যায়। ধরুন, বাঁ-হাতের ব্যাপার, হাতটানের অভ্যাস, হাত তোলা ইত্যাদি। তবে বাম-ডান হাতের বাইরেও আছে অশরীরী আরও এক হাত। সেই অদৃশ্য হাতের দাপটে অস্থিরতা তৈরি হয় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে। অনেক সময় অদৃশ্য এ হাত সরকারকে পর্যন্ত নাকানি-চুবানি খাইয়ে দেয়। জনগণের পকেট কাটতে এদের অভিজ্ঞতার অন্ত নেই। অনুভবেই এদের অস্তিত্ব মেলে; অর্থ দিয়ে তা জীবনে যুক্ত করতে হয়। এ অদৃশ্য হাতের কেরামতি থেকে রক্ষা পেতে কত না তৎপরতা! গবেষণা চলছে অবিরাম; বিশ্লেষণ করে গলদঘর্ম হচ্ছেন নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা। তবুও অপ্রতিরোধ্য এ হাত, নানাভাবে অস্থিরতা তৈরি করছে যাপিত জীবনে; যা শুধু অস্বস্তি বাড়ায় সাধারণের মাঝে। তবে কারও কাছে এ হাত সমৃদ্ধির প্রতীক! তাদের কাছে বড় বেশি আরাধ্য এ হাতের কারসাজি। এ হাতের ছাপে অনেকে হয়ে পড়েন অঢেল অর্থবিত্তের মালিক। নিয়ন্ত্রণ করেন আমলাতন্ত্রের অসাধু কর্তা, অসৎ রাজনীতিক আর সমাজের দুষ্টচক্র। এদের যোগাযোগও অনেকটা দিগন্ত বিস্তৃত; আর প্রভাব অপরিসীম।
তবে এদের শায়েস্তা করার দায়িত্ব সরকারের। জনজীবনে স্বস্তি ধরে রাখা নীতিনির্ধারকদের প্রধান কাজ। ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন পাস করে। আর এর চার বছরের মাথায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। তবে জনবল সংকটে এটি এখনও সক্রিয় হতে পারেনি। আইন বলছে, ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি, জোটবদ্ধতা ইত্যাদির মাধ্যমে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা বন্ধ করতে কাজ করবে এ কমিশন। বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী অনুশীলন নির্মূলে কমিশন থাকবে সজাগ। প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করাও কমিশনের কাজ। অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাবিরোধী সব চুক্তি, কর্তৃত্বময় অবস্থান এবং অনুশীলনের তদন্ত করতে পারবে কমিশন। প্রায় এক দশক ধরে আলোচনা, প্রস্তাব ও বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিযোগিতা আইন তৈরি হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কাদের স্বার্থে এ আইনের অধীনে গঠিত কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে? কমিশন কাজ না করলে লাভবান হয় কারা- এ প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি।
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ একশ’র বেশি দেশে এ ধরনের আইন চালু রয়েছে। সেখানকার নাগরিকরা এ আইনটির সুফল ভোগ করছেন। এখন থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে অসম প্রতিযোগিতা রুখে দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ন্যায্য বাণিজ্য আন্দোলন চলছে। এ আইন অনুসারে পণ্য বা সেবার বাজারে প্রভাব ফেলে বা প্রতিযোগিতায় বিঘœ ঘটাতে পারে, এমন জোট গঠন নিষিদ্ধ। কোনো ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে দামে প্রভাব ফেললে শাস্তির বিধানও জুড়ে দেয়া হয়েছে। জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মুনাফার তিন গুণ অথবা বিগত তিন অর্থবছরের লেনদেনের ১০ শতাংশ- এ দুটির মধ্যে যেটি বেশি, তা জরিমানা হিসেবে আদায় করা হবে। বাজারে সিন্ডিকেট করে বা জোটবদ্ধ হয়ে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের ঘটনা প্রমাণিত হলে এক বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে আইনে। প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে কানাডা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে তা সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে সহায়তা করবে। আইনটি ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় সহায়ক হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন সম্পর্কে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের সারিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অসম প্রতিযোগিতা হ্রাস করে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রয়োজন। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সাধারণ মানুষের পণ্য ও সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং পণ্যে সর্বোচ্চ উপযোগ পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনে উদ্ভাবন আনয়নের জন্য বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা অপরিহার্য। প্রতিযোগিতা কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে, অর্থনীতিতে টেকসই প্রতিযোগিতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারে সমতা আনা, ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা এবং বাজারে বেস্ট প্র্যাকটিস নিশ্চিত করা। এ ধরনের অঙ্গীকারবদ্ধ সংস্থা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন; তবে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। নানা ধরনের আর্থসামাজিক জটিল সমীকরণ চলার পথকে করে তোলে বন্ধুর। আর পরিস্থিতি উত্তরণে প্রয়োজন হয় দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান আর দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক। অদৃশ্য হাতের কর্মপরিবেশ কারা তৈরি করে দেয়, এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়- তথ্য বিভ্রান্তি, বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা, অন্তঃসারশূন্য গবেষণাকর্ম, অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতিমালা, বাজারে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অনৈতিক আস্ফালনে ভর করে এগিয়ে চলে এ অদৃশ্য হাত। আর এর উপরি কাঠামোতে থাকে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চক্রের আশীর্বাদ। শুরুতে ক্ষুদ্র পরিসরে বাজারে বাড়তে থাকে অদৃশ্য হাতের অংশীদারিত্ব। এরপর একটু একটু চ্যালেঞ্জ করতে থাকে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম। এক সময় তাদের করায়ত্তে এসে যায় পুরো পরিস্থিতি।
দেশে বছরজুড়ে গাজর-টমেটোর মতো সবজি পাওয়া যায়। উচ্চফলনশীল জাতের বীজ আসায় উৎপাদন বেড়েছে। বিপর্যয় না ঘটলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তবে পণ্য নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। ধানের সময় দেখা যায়, ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠানোই বড় দায়। এবার আলু চাষীরা বিপাকে পড়েছেন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উৎপাদন হয়েছে, কিন্তু বাজারে দাম নেই; লোকসান গুনতে হচ্ছে। বেশ কয়েক বছর আগে সবজি উৎপাদকদেরও একই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতায় ওই সময় সবজি সরবরাহ করা যায়নি। ফলে কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। দেশে সবজি ও মৌসুমি ফল সংরক্ষণের অভাবে তা নষ্ট হচ্ছে। আমরা দেখছি, উদ্বৃত্ত উৎপাদন সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় না। এ ক্ষেত্রে সরকার অনেকটা উদাসীন ভূমিকা পালন করে থাকে। এমনকি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা আসে না উপযুক্ত সময়ে। রোপণের সময়ই যদি কৃষক জানতে পারেন, খাদ্যশস্য সংগ্রহের সরকারি ক্রয়মূল্য, তাহলে তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরিও সহজ হয়। আর এখন তো দেখা যাচ্ছে অন্য উপসর্গ; বর্তমান ন্যায্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিযোগিতামূলক খাদ্যশস্য সংগ্রহ করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয় না। এবার চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে যা হল- সরকারি দর বাজারকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তাই চাল সংগ্রহের অভিযান শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। ৯ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা করা গেছে মাত্র ২ লাখ ৬০ হাজার টন। এর কারণ খোলাবাজারে দাম বেড়ে যাওয়া। সরকারের নির্ধারিত ৩২ টাকা কেজিতে মিলাররা চাল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরবরাহ করেনি। যদিও সরকারের খাদ্য মজুদের ক্ষমতা ১৯ লাখ টন। পরবর্তী সময়ে বেশি দামে আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হলেও তাতে তেমন সুবিধা হয়নি। রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায় মোটা চালের দর। অংশীজনদের উপস্থিতিতে খাদ্যশস্য সংগ্রহ পদ্ধতির স্বচ্ছতা আনা এখন সময়ের দাবি। ওজন পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক জায়গায় হারিয়েছে। সে ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বস্তুত বিপণন ব্যবস্থাপনা ত্রুটিমুক্ত করার সময় এসেছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত বাস্তবতার নিরিখে, যাতে চাহিদা আর জোগানের ফারাক দ্রুত বোঝা যায়। পর্যালোচনায় রাখতে হবে বিশ্ববাজার পরিস্থিতিও। পরিসংখ্যান বিভ্রান্তি নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে থাকা যায়, কিন্তু সংকটমোচন হয় না। গণমুখী পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধও সময়ের দাবি। এতে দল ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়, সাধারণের আস্থা ধরে রাখা বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। গণমুখী বাজার ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। তাহলেই অদৃশ্য হাতের কারসাজি রোধ করা সম্ভব।
সাজ্জাদ আলম খান : সাংবাদিক
[email protected]




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত