সাজ্জাদ আলম খান    |    
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মন্দা কাটাতে সৌদি আরবে সামাজিক সংস্কার
‘যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে/সহসা শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে,/যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়/পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।/সর্বজন সর্বক্ষণ চলে যেই পথে/ তৃণগুল্ম সেথা নাহি জন্মে কোনোমতে,/যে জাতি চলে না কভু তারি পথ-‘পরে/তন্ত্র-মন্ত্র-সংহিতায় চরণ না সরে।’ সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে বহতা নদীর সাদৃশ্য সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়, বৃত্তবন্দি অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে, তা যেন সংকুচিত হয়ে পড়ে। সৌদি আরবের অর্থনীতি ও সমাজ বেশ অনেক দিন ধরেই একটা গণ্ডিতে বন্দি হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে উত্তরণে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। আর রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। অর্থনীতির প্রভাব তো সব সময় যাপিত জীবনে পড়ে; সেটা হতে পারে সুদূরপ্রসারীও। তা স্পষ্ট হয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে। সৌদি অর্থনীতিকে মন্দা দশা থেকে কাটিয়ে তুলতে এখন চলছে সামাজিক উদ্যোগ। মৌলিক অধিকারবঞ্চিত সৌদি নারীর জীবনযাত্রায় যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে নানা সুবিধা। এতে অর্থনীতির প্রবাহে সংযোগ হবে স্পন্দন। কর্মসংস্থান, উদোগ, বিনিয়োগ আর ভাবনার জগতে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কিন্তু এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও রয়েছে যথেষ্ট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছে সৌদি সরকারকে।
সংস্কার বেশ কঠিন বিষয়। নানা ধরনের ঘাত-প্রতিঘাত এড়িয়ে পৌঁছাতে হয় কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। সংকুচিত হয়ে আসা রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বিকল্প জ্বালানির উপস্থিতি, তেলের দরপতন, রাষ্ট্রের খরচে লাগাম টানা- এসব কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে সৌদি আরব। এসব জটিল সমস্যার মধ্য দিয়েই সৌদি আরবকে ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচন করার পথটি মসৃণ করতে হয়েছে। সংস্কার ছাড়া সৌদি আরবের অর্থনীতি ধরে রাখা বেশ কষ্টকর, তা নতুন নেতৃত্বও বিশ্বাস করে। প্রত্যাশা পূরণে দেশটির সামাজিক চিন্তায় বিবর্তন আনার বিষয়টি নতুন নেতৃত্ব অনুধাবন করেছে। সংস্কারের বিষয়টি সৌদির তরুণ প্রজন্মকে অনেকটা আশাবাদী করে তুলেছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই তরুণ। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে। এর জন্য সৌদি প্রশাসন কতটুকু প্রস্তুত? প্রশ্ন উঠেছে, কট্টর ধর্মীয় অনুশাসন এসব পরিবর্তন মেনে নেবে কিনা? অর্থনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, আবশ্যকীয় বিষয় হচ্ছে বাইরের বিনিয়োগ। আর এজন্য কট্টর থেকে উদাররূপে এগোতে হবে দেশটিকে। খরচের বড় একটি খাত হল সৌদি নাগরিকের প্রবাস ভ্রমণ। ক্রাউন প্রিন্স দেশের ভেতরেই বিনোদন ব্যবস্থার আয়োজন করতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সিনেমা হলসহ নানান বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প খুব দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। ইরান, কাতার, আরব আমিরাতের মতো দেশ খনিজসম্পদের সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও আধুনিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে সৌদি আরব কট্টর রক্ষণশীলতা মানতে গিয়ে পিছিয়েছে।
নারীর অধিকারের প্রশ্নে রক্ষণশীল সৌদি আরব এখন অনেকটা উদার পথে হাঁটছে। ২০১৫ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো নারীদের প্রার্থী ও ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৮৭তম বার্ষিকীতে স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো নারীদের প্রবেশ করতে দিয়েছে সৌদি আরব। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এবারই জাতীয় একটি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন নারীরা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নজিরবিহীন এ আয়োজনে ছিল কনসার্টসহ বর্ণাঢ্য কর্মসূচি। গত তিন দশকের মধ্যে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্রথমবারের মতো নারী শিল্পীর কনসার্ট প্রচার করেছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন ‘আল তাকাফিয়া’। টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইনেও ওই নারী শিল্পীর গান লাইভ শোনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। জনপ্রিয় সৌদি শিল্পী আবদুল মাজিদ আবদুল্লাহ তার টুইটার পেজে বলেছেন, আগামী মাসে জেদ্দায় তিনি একটি কনসার্ট করবেন, যেখানে পুরো পরিবার নিয়ে মানুষ আসতে পারবেন অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত করছেন নারীদের আসতেও কোনো বাধা নেই। সৌদির শাসকরা একসময় ধর্মীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা শিক্ষা ও আইনি ব্যবস্থায়ও সংস্কার আনতে শুরু করেছেন। এছাড়া জাতীয় পরিচয়ের বিষয়গুলোকেও উৎসাহ দিচ্ছেন। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তনগুলো নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো।
এখন নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতিসংক্রান্ত আদেশ জারি করেছেন সৌদি বাদশাহ। যদিও আদেশটি ২০১৮ সালের জুনে কার্যকর হবে। এককালে পেট্রো ডলারে পুষ্ট অর্থনীতি ক্ষীয়মাণ এখন। বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নিয়ে আর কতদিন চলবে? তাদের টনক নড়ছে। তারা শুধু আমদানি নয়, নিজ দেশে বিদেশি বিনিয়োগের ওপরও জোর দিচ্ছেন। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অটোমোবাইল খাত। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বেঁচে যাবে যদি দেশটিতে ১৪ লাখ চালককে তাদের কর্ম থেকে অব্যাহতি দেয়া যায়। গাড়ি কিনলে বীমা করতে হয়। এ দুই খাতই বিকশিত হবে। এর পাশাপাশি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্যকরণের ছাপও পড়বে। দেশটিতে ১৪ লাখ চালকের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার বাংলাদেশি চালক রয়েছে। তবে কত সংখ্যক সৌদি নারী গাড়ি চালাবেন সে নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে এবং অনেক সৌদি পরিবারে একাধিক চালক কাজ করছেন। মূলত, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতেই নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। ফলে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়বে। দেশটিতে বৈধভাবে ১৪ লাখ বিদেশি চালক গড়ে ৫০০ মার্কিন ডলার বেতন ও থাকা-খাওয়ার সুবিধা পেয়ে থাকেন। দেশটিতে গাড়ি চালকরা বছরে ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। সৌদি আরবের জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এফজিই বলছে, অন্তত ১০ ভাগ নারী গাড়ি চালাতে রাস্তায় নামবেন এবং এর ফলে প্রতিদিন ৬০ হাজার ব্যারেল গ্যাসোলিন বিক্রি হবে। সৌদি নারীদের গাড়ি চালানোর ঘোষণা আসার পর গাড়ি বিক্রি ও বীমা প্রতিষ্ঠান সৌদি অটোমোটিভের শেয়ারমূল্য দেড় ভাগেরও বেশি বেড়েছে। আর গাড়ি লিজিং প্রতিষ্ঠান বাজেট সৌদি আরাবিয়ার শেয়ার দরে উল্লম্ফন হয়েছে ৪ ভাগ।
গেল বছরের জুনে জ্বালানিনির্ভরতা থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা প্রকাশ করে সৌদি আরব। এ পরিকল্পনাটি ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ। আগামী ১৫ বছরে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে সৌদি আরবের তেলপ্রধান অর্থনীতিকে বহুমুখী সম্পদভিত্তিক করার ভিশন এটি। এর অন্যতম লক্ষ্য হল, ২০২০ সালের মধ্যে দেশে ৪ লাখ ৫০ হাজার বেসরকারি কর্মসংস্থান তৈরি করা। ৫০০টিরও বেশি ছোট-বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৭২ বিলিয়ন ডলার ব্যক্তি খাত থেকে আনা। আর সরকারি সম্পত্তি ৩ ট্রিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ৫ ট্রিলিয়ন রিয়েলে নিয়ে আসা। সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বৃহৎ তেল কোম্পানি আরামকোর ৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করা হবে, যার মূল্য আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার। নতুন ভিসা প্রথা চালু করা হবে, যার মধ্য দিয়ে মুসলমানরা দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে পারবেন। কাজের ক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ বাড়বে। খনি এবং সমরাস্ত্র প্রস্তুত খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় সৌদি সরকার। আইএমএফ সৌদি আরবের এ পরিকল্পনাকে উচ্চাভিলাষী এবং ব্যাপক উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছে। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলেও সতর্ক করেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে চলতি মাসেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশটির অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে মন্দার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে। এতে ব্যয়সংকোচন পদক্ষেপ গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে। বাধাগ্রস্ত হতে পারে বেসরকারি বিনিয়োগও। অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী মন্দা জনমতকে সংস্কারের বিপক্ষে নিয়ে যেতে পারে। গত বছর দেশটির ৭০ ভাগেরও বেশি আয় তেল রফতানি থেকে হয়েছে; কিন্তু মূল্য পড়ে যাওয়ায় আয় কমছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক সৌদি আরব বাজেট ঘাটতিতে পড়েছে। এ ঘাটতি মেটাতে গত ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছে দেশটি
সাজ্জাদ আলম খান : সাংবাদিক
[email protected]




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত