প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বানভাসি হাওরের দুঃসাহসিক নারীদের কথা
বন্যার পানি উঠেছে ঘরে, পানিবন্দি মাসের পর মাস। অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার। এরপরও ভাঙ্গেনি তাদের মনোবল। স্বামী সন্তান পরিবার-পরিজনসহ এ দুর্যোগের মোকাবেলা করছেন অসীম ধৈর্য আর মনোবল নিয়ে। লিখেছেন- আজিজুল ইসলাম

মৌলভীবাজারের হাওর হাকালুকি তীরের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম বেলাগাঁও গ্রাম। ঘর থেকে পানি কিছুটা নামলেও উঠানে পানি। এই পানির মধ্যে স্বামী কাজল মিয়া, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে মজিদা বেগম চার মাস কাটাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে মজিদা বেগম (৩২) বলেন, পাঁচজনের সংসার। স্বামী শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ ও বর্ষা মৌসুমে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। চলতি বছর অকাল বন্যায় অর্থাৎ গত ২২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বন্যায় সাড়ে ৩ একর জমির বোরো ধান পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে বন্যার পানি ছিল এক ফুটেরও বেশি। কোথায় রাঁধব, কোথায় খাব। কি রাঁধব, স্বামী, সন্তানদের মুখে কী খাবার তুলে দেব একজন স্ত্রী-মাকে এই দুর্যোগের মধ্যেও ভাবতে হয়। আমাকেও ভাবতে হয়েছে। খাবার পানি নেই। সাঁতরে গিয়ে দূর থেকে পানি আনতে হয়েছে। গোসলখানা, পায়খানা ডুবে গেছে। বন্যার কারণে চার মাস স্বামীর কোনো আয়-রোজগার নেই। পাঁচজন মানুষের খাবার কোথা থেকে আসবে? কত সমস্যার মধ্য দিয়ে আমরা বেঁচে আছি কেবল আমরাই জানি।

বানভাসি আরেক গৃহিণী শিল্পী বেগম (৩০)। স্বামী দানিছ মিয়া, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। দিনমজুর স্বামী, সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে তাদের। এর মধ্যে নয় মাসের গর্ভবতী তিনি। চলাফেরা কষ্টকর হলেও চকি উঁচু করে স্বামী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বানের পানির মধ্যেই বাস করছেন। শিল্পী বেগম এর মতে, বানের পানি ঘরে ঢুকলেও বাড়ি ছাড়েননি। কোথায় যাবেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। বানের কারণে স্বামীর কাজ নেই। কোথা থেকে ত্রাণও পাননি। কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি কিভাবে তারা বেঁচে আছেন। শরীরের এই অবস্থায় ছেলেমেয়েদের দুমুঠো চাল ফুটিয়ে দেবেন তারও জোগাড় নেই। একবেলা ভাত জুটলে আরেক বেলা ভাত জোটে না। ধার-কর্জ দেয়ার মানুষও তো নেই। পায়খানা ডুবে গেছে। মলমূত্র পানিতে মিশে ঘরে চলে আসে। এর মধ্যে দিন পার করছেন। এসব দেখার কেউ নেই।

হাওরপাড়ের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের নাছিরপুর গ্রামের বেদেনা বেগম (৪৭) এর ঘরেও পানি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনিও পানিবন্দি। এর মধ্যে অনেক কষ্টে দিন পার করছেন খেয়ে না খেয়ে।

সাদিপুর গ্রামের রাজনা বেগমও স্বামী সন্তানদের নিয়ে পানিবন্দি হয়ে ঘরেই রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রাজনা বেগম (২৫) বলেন, ঘরে হাঁটু সমান পানি ও বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলেও আশ্রয় কেন্দ্রে যাইনি। ঘরে যেমন সমস্যা আশ্রয় কেন্দ্রে গেলেও অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে মেয়েদের বাথরুমের সমস্যায় বেশি পড়তে হয়। বন্যাকবলিত এলাকায় পায়খানার সমস্যা, খাবার পানির সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। বাঁশের অস্থায়ী বেড়া দিয়েই নির্মাণ করা হয় টয়লেট। মলমূত্র সবই সরাসরি মিশছে বন্যার পানির সঙ্গে। আর সেই পানিতেই প্রাত্যহিক কাজ সারি। শুধু খাবারের পানি দূরের নলকূপ থেকে আনা হয়।

তাদের মতো রুহিনা বেগম (৩০), আনিছা বেগম (৩৫), পপির (২০) পরিবারের চিত্রও একই রকম। বন্যাকবলিত হাওর তীরের এসব নারীরা শত কষ্ট উপেক্ষা করে স্বামী সন্তান নিয়ে নিজ বাড়িতেই থাকেন। কেউ ত্রাণ দিল বা না দিল তাতে তাদের কিছুই আসে যায় না। দিলে ভালো না দিলে খেয়ে না খেয়ে উপোষ করেন। কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ান না। এটাই তাদের চরিত্রের সবচেয়ে বড় গুণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াকু নারীদের এমন সাহসিকতায় গর্বিত তাদের স্বামীরাও। আর সন্তানরাও এই পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার সাহস মা-বাবার কাছ থেকে রপ্ত করছে তাদের শিশুরা।

দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতিপূরণ কিভাবে পূরণ হবে জানতে চাইলে রুহিনা জানান, বন্যার কারণে এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ডুবে যায়। তাই এখন স্কুল বন্ধ রয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নৌকাযোগে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এরপরও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ে যায়। ছোট্ট একটা চকিতে রান্না, খাওয়া, ঘুমানো এর মধ্যে ওরা পড়াশোনাও করে। ওরা জানে নইলে পড়াশোনায় ওরা পিছিয়ে যাবে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত