জামাল হোসেন    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
কেঁচো দিয়ে কম্পোস্ট সার তৈরি করে স্বাবলম্বী আনোয়ারা

চারদিকে খোলা টিনের চালার নিচে লম্বা সারি সারি বাঁশের মাচা। বাঁশের মাচার ওপর থরে থরে রাখা হয়েছে মাটির গামলা। এই মাটির গামলায় কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) ও চালা কম্পোস্ট তৈরি করছিলেন আনোয়ারা বেগম (৪৭)। যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের বারবাকপুর গ্রামের গৃহবধূ তিনি। স্বামী আবদুল খাঁ একজন কৃষক। কেঁচো কম্পোস্ট তৈরিতে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে আনোয়ারা বেগম বলেন, ২০১৪ সালে আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষের ওপর এসসিডিপির প্রশিক্ষণ নিই। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কেঁচো কম্পোস্ট ও চালা কম্পোস্ট কিভাবে তৈরি করা হয় তা হাতেকলমে শেখার সুযোগ হয়। আমি বাড়ির আঙিনায় বেড তৈরি করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনসহ কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) ও চালা কম্পোস্টের মাধ্যমে সার উৎপাদন করি। নিজের ক্ষেতে তা ব্যবহার করি এবং বেশিটা অন্যদের কাছে বিক্রি করি। আমার কৃষিবান্ধব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখে এলাকার অনেক নারী উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। এর ফলে আমার বসত ভিটার এক ইঞ্চি জমিও পতিত নেই। বিঘাখানেক বসতভিটার মধ্যে আমি পরিকল্পিতভাবে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছি। যার মধ্যে আটটি বেড তৈরি করে বেগুন, গিমা কুমড়া, সবুজ শাক, মরিচ, ওল, শসা, করলা ও মৌসুমি সবজি শিম, চিচিঙ্গা ইত্যাদি চাষ করছি। তিনটি মাচা করে লাউ, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, মেটে কুমড়া, মিষ্টি করলা ও বাড়ির চারপাশের বেড়ায় মিঠা পুল্লা ও ঝিঙে লাগিয়েছি। এর ফলে অফলা গাছ চাল কুমড়া এবং মিষ্টি কুমড়ার লতা ও ফলে ভরে থাকে সারা বছর। টিউবওয়েলের পানি গড়ানোর নিচু জায়গায় লতিকচুর চাষ করি। ছায়াযুক্ত জায়গায় ঘ্যাটকোল, মানকচু ও আদা লাগিয়েছি। আনোয়ারার বসতভিটায় রয়েছে সব ধরনের ফলের গাছ। যার মধ্যে আম, জাম, জামরুল, লিচু, বেল, সফেদা, বরই, বাতাবি লেবু, জাম্বুরা, সজনে, কমলা, মাল্টা, আনারস, কাঁঠাল, নারিকেল, কামরাঙ্গা, জলপাই, পেয়ারা, পেঁপে, কলা, ডুমুর, সুপারি ইত্যাদি গাছও রয়েছে।

আনোয়ারার মতে, তার স্বামীর সাতবিঘা আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। এসব জমিতে তারা স্বল্পমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করলেও মূলত গুটি ইউরিয়া সার ও তার নিজের উৎপাদিত কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) এবং চালা কম্পোস্টের সার ব্যবহার করেন। কীটপতঙ্গ ও বালাইনাশক হিসেবে কীটনাশকের পরিবর্তে মেহগনির তৈল, খৈল, ভাটির পাতা, তুলসীপাতা, নিমপাতা, ঢোলকলমি, বাসকের পাতা, নিম ও পাটের বীজ ইত্যাদি জৈব ভেষজের নির্যাস থেকে রোগবালাই প্রতিষেধক তৈরি করে ফসলে প্রয়োগ করেন। এতে অনেক সুফল পাওয়া গেছে। তাদের উৎপাদিত তরিতরকারি যেমন টাটকা তেমনি খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। সে কারণে সচেতন ক্রেতারা তাদের বিষমুক্ত সবজি বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যায়। চাষাবাদের পাশাপাশি গবাদিপশু, হাঁসমুরগি ও কবুতর পালন করেন। এছাড়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বর্ধনশীল জাতের ক্যাম্বেল হাঁস পালন করেন। তবে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) সার কারখানায় মাসিক আয় বেশি হয়। তার কারখানায় প্রতি নান্দায় প্রতি মাসে তৈরি হয় ১০-১২ কেজি জৈব সার। তার কারখানায় নান্দা রয়েছে ১০৪টি। নিজের সংসারের খরচ যোগানোর পাশাপাশি ছেলেদের লেখাপড়ার খরচও চালান তিনি।

বছর দুয়েক আগে ১০০ গ্রাম কেঁচো দিয়ে দুইটি নান্দায় দুই ঝুড়ি গোবর সার দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল আনোয়ারার কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি। তাকে দেখে অনেকেই আবার নিজেই এই কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরিতে ঝুঁকেছেন। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ওই এলাকার ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আইয়ুব হোসেন দেড়শ টাকা দিয়ে ১০০ গ্রাম কেঁচো কিনে দিয়েছিলেন তাকে। দুইটি নান্দা কিনে সেই কেঁচো দিয়ে দুই ঝুড়ি গোবরের মাধ্যমে জৈব সার তৈরি করেন আনোয়ারা বেগম। তা থেকে প্রথম বছরে যে সার তৈরি হয়েছিল সেটা তার স্বামী আবদুল খাঁ জমিতে ব্যবহার করেন। সেই ১০০ গ্রাম কেঁচো থেকে বর্তমানে আনোয়ারার ১০৪টি নান্দায় কেঁচো রয়েছে ১২-১৫ কেজি। এক কেজি কেঁচোর দাম ১৫০০/- টাকা। আনোয়ারা এ বছর কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) সার তৈরির জন্য একটি চালা (শেড) তৈরি করেছেন। আনোয়ারার দুটি গরু। ফলে তাকে গোবর কিনতে হয় না। প্রতিটি নান্দায় ২০০ গ্রাম কেঁচো আর এক ঝুড়ি গোবর দিলে তা থেকে ১৫-২৫ দিনের মাথায় ১২-১৩ কেজি জৈব সার পাওয়া যায়। এক কেজি জৈব সারের দাম ১৫ টাকা। পাশাপাশি প্রতি নান্দা থেকে ২-৩ মাস পর পর ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি করে কেঁচো বিক্রি করা যায়। আনোয়ারার কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরিতে এলাকাতেও এই সারের কদর বেড়েছে। প্রতিমাসে তার আয় ১০-১২ হাজার টাকা।

আনোয়ারা গৃহস্থালির পাশাপাশি স্বামীর সব কাজে সহযোগিতা করেন। তাদের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সাদ্দাম হোসেন যশোর পলিটেকনিক্যাল কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন। ঢাকার ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি করছেন। ছোট ছেলে শরিফুল ইসলাম বাংলাদেশ টেকনিক্যাল কলেজ থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছেন।




 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত