প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ভালো করার চেষ্টা ছিল সঙ্গীতাঙ্গনে
২০১৭ সাল ছিল সঙ্গীতের জন্য চ্যালেঞ্জের বছর। এ বছর অনেকেরই চেষ্টা ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর। এ তালিকায় নতুনদের পাশাপাশি পুরনোরাও শামিল হয়েছেন। কতটা সফল হয়েছেন তারা? কিংবা বছর শেষে কার মুখে হাসি লেগে আছে? এমন অনেক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সঙ্গীতাঙ্গনে। ফলাফল যা-ই হোক, আশা-নিরাশার মধ্যেও সবার যে ভালো কিছু করার চেষ্টা ছিল বছরজুড়ে, সেটিই ছিল চোখে পড়ার মতো। ভালোর মাঝে কিছু মানহীন কাজও সমালোচিত হয়েছে এ বছর। ২০১৭-এর সঙ্গীতাঙ্গনের অদ্যোপান্ত নিয়ে লিখেছেন সাদিয়া ন্যান্সী

বছরের শুরুতেই সঙ্গীতের প্রসার নিয়ে অনেকে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। পরিকল্পনা করেছেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও শুরু করেছিলেন অনেকেই। কারও কারও পরিকল্পনা শুধু কল্পনার মধ্যেই বাক্সবন্দি ছিল। সবকিছুর মধ্যেই সঙ্গীতের জন্য ২০১৭ সাল ছিল অন্ধকারে এক টুকরো আশার আলোর মতো। যে আলোতে, অন্ধকার তো কিছুটা হলেও ঘুচেছে! এমন সান্ত্বনা নিয়েই মূলত বছরটি কেটে গেছে। এ বছর বেশ কয়েকটি গান শ্রোতাদের কাছে মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটিও মন্দের ভালোর। আগের মতো গানের জনপ্রিয়তা নেই, এটা পুরনো কথা। নতুন কথা হচ্ছে, গানের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টার কমতি ছিল না কারও মধ্যে। ভালো কথা, সুর কিংবা সঙ্গীতের অভাবে সেই চেষ্টা বিফলেও গেছে অনেকের। এর মধ্যে কিছু গান বের হয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা যায়, বছরটি ছিল পুরোটাই চ্যালেঞ্জের। হাতের মুঠোয় প্রযুক্তির যুগে গানের শ্রোতাপ্রিয়তা যেখানে সহজ বিষয় ছিল, সেখানে কেউই এ সুবিধাটুকু কাজে লাগাতে পারেননি, শুধু ভালো কাজের অভাবে। সেটি লেখনী হোক, সুর কিংবা সঙ্গীতায়োজনই হোক। আধুনিক নিয়মে গান যেখানে শোনার বদলে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে ইন্টারনেট-নির্ভরতার দিকেই ঝুঁকেছেন প্রত্যেকে। এর মধ্যে ইউটিউব ভিউ নিয়ে সরব ছিলেন অনেকে। কার কত বেশি ভিউ (দর্শকরা গানের ভিডিও দেখেছেন) হল সেটি গুনতেই ব্যস্ত ছিলেন অনেকে। ইন্টারনেট ‘ভিউ’ দিয়েই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি বিচারে ব্যস্ত ছিলেন অনেকে। যদিও এ ইউটিউব ভিউ নিয়েও ব্যাপক ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কারণ এখানেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। অর্থের বিনিময়ে ‘বুস্ট’ (মানুষকে জোর করে গেলানো) করার মাধ্যমে হিট বাড়িয়েছেন অনেকে। যদিও অনেক বোদ্ধাও এ ‘ভিউ’, ‘বুস্ট’ ‘হিট’ তালিকাকে সফলতার সোপান বলে মন্তব্য করেছেন। এসব নিয়েই আলোচনা-সমালোচনায় কেটেছে ২০১৭ সাল। তবে একটি গান হিট হতে যে গানের কথা, সুর, সঙ্গীত ও গায়কীর প্রয়োজন অপরিহার্য- এর সঙ্গে একমত হয়েছেন সবাই। চলতি বছর প্রত্যেকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই প্রকাশ হয়েছে ইন্টারনেট মাধ্যমে। সিডি আকারে প্রকাশের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র। পুরনোদের পাশাপাশি গানের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা মন্দা বলে বিষাদের ঝড় তুললেও গান প্রকাশের মাত্রা গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছরই ছিল সবচেয়ে বেশি। এ বছর শুরুর দিকে কিছু অ্যালবাম প্রকাশ পেলেও সেটি হাতেগোনা এবং গানের সংখ্যাও কম। ঈদ কিংবা পরবর্তী সময় সিঙ্গেল বা তিনটি গান নিয়ে অ্যালবাম প্রকাশের হিড়িক ছিল বেশি। এর মধ্যে সিঙ্গেল গান প্রকাশ হয়েছে বেশি। এগুলোর সবক’টিই মিউজিক ভিডিও আকারে প্রকাশ হয়েছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব মতে, কয়েকটি গানের শ্রোতা-দর্শক ছিল প্রায় কোটির কাছাকাছি। কিছু কিছু মিউজিক ভিডিও অবশ্য তুলনামূলক ভালো ছিল। তবে বেশিরভাগই ছিল গতানুগতিক ও নিন্মমানের।

২০১৭ সালটিকে পুরোপুরি নিজের করে নেবেন এমনটি বলেছিলেন গানের যুবরাজ আসিফ আকবর। কথা রাখতেই সংখ্যার দিক থেকে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ গান প্রকাশ করেছেন তিনি। সিঙ্গেল গান নিয়ে পুরো বছর শ্রোতাদের সঙ্গে থেকেছেন এ শিল্পী। দ্বৈত গানেও বাজিমাত করেন গানের এ যুবরাজ। এ বছর ৫০টিরও বেশি গান প্রকাশ হয়েছে তার। সর্বাধিক গানের শিল্পীর বিবেচনায় আছেন কাজী শুভ। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের হার্টথ্রব হৃদয় খান সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে বছরের সর্বনিন্ম গানের বাহক। বেশ কয়েকটি গান এবং ‘ঘুম’সহ কয়েকটি মিউজিক ভিডিও নিয়ে আলোচনায় ছিলেন জনপ্রিয় সঙ্গীত তারকা হাবিব ওয়াহিদ। এ বছর গান দিয়ে না পারলেও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়েই কেটেছে ন্যান্সির দিনমান। আরেক কণ্ঠশিল্পী পড়শীর গানের ব্যস্ততা ছিলই না চলতি বছর। নায়িকা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এ গায়িকা একেবারেই হারিয়ে গেছেন শ্রোতাদের মাঝ থেকে। ২০১৭ কে কাজে লাগিয়ে নতুন গায়িকা ঐশী বাজিমাত করেছেন। বছরজুড়ে নিত্যনতুন গান দিয়ে শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছেন তিনি। খুব অল্পদিনে জনপ্রিয়তা পাওয়া সঙ্গীতশিল্পী ইলিয়াসের জন্যও বছরটি ছিল শুভ। ২০১৬ সালের মতো দাপটের সঙ্গে চলতে না পারলেও মন্দের ভালোর মধ্যে তিনিও নিজেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এ বছর। তবে নকল ভিডিও, আর কোটি ভিউয়ারস দিয়ে আলোচনায় আসার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন আরেক কণ্ঠশিল্পী ইমরান। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ভিউয়ারস বাড়লেও আলাদাভাবে বাড়েনি তার জনপ্রিয়তা। খোলামেলা পোশাকে ভিনদেশি মডেলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ দৃশ্য উস্থাপন করে কেবল ভালো গারনেসের বহিঃপ্রকাশ করেছেন বলেই মন্তব্য করেছেন অনেকে। তাই বলা যায়, সুস্থ ধারার বিনোদন দিতে পুরোটাই ব্যর্থ এ গায়ক। নিজের নতুন একক অ্যালবাম নিয়ে আলোচনায় ছিলেন জনপ্রিয় তারকা শিল্পী তাহসান খান। এ ছাড়াও চলতি বছর বেশকিছু গান প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতশিল্পী মিনার প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকটি গান। এর মধ্যে কারণে-অকারণে, দেয়ালে দেয়ালে, আবারসহ ইত্যাদি গান ছিল মিনার ভক্তদের পছন্দের তালিকায়। তাহসান গান নিয়ে এ বছর ছিল কিছুটা অনুজ্জ্বল। বছরজুড়েই গান প্রকাশ করেছেন কাজী শুভ। একাধিক গান প্রকাশ করলেও ‘বউ এনে দেয়’ গানটি শ্রোতারা ভালোভাবে নিয়েছে। বেলাল খান একাধিক গান প্রকাশ করলেও কোনো গান নিয়ে তিনি আলোচনায় ছিলেন না। আলোচনায় ছিলেন না আরফিন রুমি। বছরের শুরুর দিকে ‘দেহবাজী’ অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছেন। যদিও বছরের শুরুতে কথা দিয়েছিলেন এ বছর পুরোটা সময় শ্রোতাদের সঙ্গে থাকবেন। এফএ সুমন প্রকাশ করেছেন একক অ্যালবামসহ বেশ কয়েকটি সিঙ্গেলস গান। এর মধ্যে ‘পাগলি’রে গানটি শ্রোতারা পছন্দ করেছেন। তানজীব সারোয়ার গত বছর ‘মিথ্যা শিখাইলি’ গান নিয়ে আলোচনায় থাকলেও এ বছর তিনি ছিলেন আলোচনার বাইরে। গত বছর প্রীতম হাসান আলোচনায় থাকলেও এ বছর ‘জাদুকর’ গানটির আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। সিনিয়র সঙ্গীতশিল্পীরা এ বছর দূরেই ছিলেন। কুমার বিশ্বজিৎ, ফাহমিদা নবী, বাপ্পা মজুমদার গান প্রকাশ করে শ্রোতাদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের যে গানগুলো প্রকাশ হয়েছে ভক্তরা মোটামুটি পছন্দও করেছেন। নারী কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে অনেককে এ বছর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বছরজুড়ে গান নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী সালমা। বেশকিছু গান প্রকাশ হয়েছে তার। পঞ্চম একক অ্যালবাম ‘শুনতে চাই তোমায়’ উপহার দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে ছিলেন ন্যানসি। তবে আলোচনায় আসতে পারেননি এ শিল্পী। সঙ্গীতশিল্পী কোনালের ‘বন্ধু’ গান প্রশংসিত হয়েছে। সঙ্গীতশিল্পী মিলনের ‘লক্ষ্মীসোনা’ গানটি শ্রোতারা বেশ ভালোভাবে নিয়েছেন। তবে এত আলোচনার মধ্যেও বেশকিছু অস্থিরতা দেখা গেছে। চলতি বছরে ভেঙেছে প্রতিষ্ঠিত তিনটি ব্যান্ডদল। শিরোনামহীন, মাইলস এবং অবসকিউর- ভাঙন এ তিনটি ব্যান্ড বছরশেষ ছিল আলোচনা-সমালোচনায়। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীন। এ ব্যান্ডের তানযীর তুহিন প্রধান ভোকাল ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই শিরোনামহীন ছাড়ার ঘোষণা দিলেন তিনি। এ নিয়ে চলতে থাকে ব্যান্ডের অন্য সদস্যের সঙ্গে তুহিনের কাদা ছোড়াছুড়ি। যদিও মীমাংসা হয় এক পর্যায়ে; কিন্তু ব্যান্ডে তুহিন আর যোগ দেননি। নিজে ‘আভাস’ শিরোনামে একটি দল গঠন করেন। যেখানে যোগ দেন অবসকিউরের তিন সদস্য। বছরের শেষ দিকে মাইলসের দুই সদস্য শাফিন ও হামিনের মধ্যেও মনোমালিন্য দেখা গেছে। এখনও পর্যন্ত সেটি ঠিক হয়নি। আর হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখছেন না কেউ। অবসকিউরের দলছুট তিন সদস্যকে দলে ফিরিয়ে না নেয়ার কথা বলেছেন দলপ্রধান টিপু।

এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্পীর অনেক গানই মোটামুটি শ্রোতা-দর্শকদের কাছ থেকে সাধুবাদ পেয়েছে। মোটকথা ভালো-মন্দ মিলিয়েই ছিল এবারের বছরের গান।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত