বদিউর রহমান    |    
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
চেতনায় বুদ্বুদ
রাজনীতির খপ্পর থেকে পুলিশের নিষ্কৃতির উপায়

অতি সম্প্রতি দুটি জাতীয় দৈনিকের দুটি শীর্ষ স্টোরি জনমনে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে বলা যায়। প্রাতঃভ্রমণে বেশ কয়েকজন এ নিয়ে জমজমাট আলোচনাও করেছেন। সাধারণত আমরা রাজনীতি নিয়ে বেশি কথা বলি, বেশি সমালোচনা করি, একটু সুযোগ পেলেই নিজের পাণ্ডিত্য বেশি জাহির করার চেষ্টা করি। মঞ্চের মাইক পেলে, আসরী-আলোচনায় একটু বক্তা হতে পারলে, চায়ের দোকানের গালগল্পে, এমনকি জানাজার জামাতে একটু ফুরসত পেলেই আমরা বাঙালিরা যার যার জ্ঞান-গরিমা উজাড় করে দিতে কার্পণ্য করি না। রাজনীতি নিয়ে এমন আলোচনা বেশি বেশি হয়। জনপ্রশাসন, র‌্যাব প্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসন নিয়ে তেমন সরগরম আলোচনা বড় বড় ইস্যুতে ছাড়া হয় না। লিমন ইস্যু, নারায়ণগঞ্জের সাতখুন, নরসিংদীর গুলি, জঙ্গি আটক- এ ধরনের কিছু ইস্যুতে র‌্যাব বেশ আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। অপরদিকে রুবেল হত্যা, ব্যবসায়ী খুন, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সিটি কর্পোরেশন অফিসার নির্যাতন নিয়ে পুলিশেরও সমালোচনা বেশ জমজমাট হয়েছে।

র‌্যাব-পুলিশের অনেক সফলতা আছে : জঙ্গি দমনে, সন্ত্রাসী আটকে, বিএনপির তিন মাইস্যা পেট্রলবোমায় মানুষ মারার আন্দোলন দমনে। র‌্যাব-পুলিশের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ দু’বাহিনী যে ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি তা বলা যাবে না। তবে সেটাকে আমরা ব্যক্তিবিশেষের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই। কিন্তু এর ফলে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়, আমাদের ভয় বাড়ে, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী এ দু’বাহিনীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ কিছুটা হলেও কমে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সব সময় প্রো-আইনশৃংখলা বাহিনী, যদিও পুলিশকে শক্তিশালী না করে র‌্যাব সৃষ্টি আমার অপছন্দের, যেমন আমার বড় অপছন্দ ছিল রক্ষীবাহিনী সৃষ্টি। র‌্যাব মূলত পুলিশের অংশ হিসেবেই সৃষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন এখনও রয়েছে, পুলিশকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে কি আরও উন্নত করা যেত না? র‌্যাবের প্রাধান্য বা উচ্চতা এ বাহিনীতে সশস্ত্র বাহিনীর সংযুক্তির কারণে। বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনী তো নিজ নিজ বলয়ে সুপরিচিত, শক্তিশালী; আইনশৃংখলার প্রয়োজনে এ দু’বাহিনীর সহায়তা চাওয়ার বিধানও রয়েছে। এমন অবস্থায় আলাদাভাবে র‌্যাব সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল না। প্রতিষ্ঠিত বাহিনীকে যত বেশি শক্তিশালী করা যায় ততই মঙ্গল।

তারপরও র‌্যাব ইতিমধ্যে একটা বড় ভূমিকায় চলে এসেছে। র‌্যাবপ্রধান এখনও র‌্যাব-বিধান অনুসারে পুলিশ কর্মকর্তা। অর্গানাইজেশনাল বিহেভিয়ারে র‌্যাবে নিযুক্ত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে এবং মাঝে মাঝে আমরা তা কিছু খবরে জানিও। বস্তুত অস্বীকার করার উপায় নেই যে, র‌্যাব সৃষ্টির ফলে আইনশৃংখলা রক্ষায় বড় বড় ভূমিকায় র‌্যাব প্রশংসিত; কিন্তু এতে পুলিশের দক্ষতা কমছে বলতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ যেন গৌণ হয়ে পড়ছে। এটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। হ্যাঁ, এর কারণ হচ্ছে র‌্যাবের উন্নত প্রশিক্ষণ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সংযুক্তি, যানবাহনসহ বেশি সুবিধা ও ক্ষিপ্রতা। বর্তমান অবস্থায় র‌্যাব অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করছে। ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ প্রথম আলোর প্রধান খবর, ভ্যাট আদায়ে যুক্ত হতে চায় র‌্যাব। পুরো স্টোরিটা পড়ে র‌্যাবের প্রস্তাবের সদুদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই। আমি রাজস্ব বোর্ডে ছিলাম বিধায় খবরটি আমি দু’দুবার মনোযোগ সহকারে পড়েছি। র‌্যাবের প্রস্তাবের মোদ্দা বিষয়টি হচ্ছে, মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-কে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমানে মূল্য সংযোজন কর আইন মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় র‌্যাব অন্য কিছু ক্ষেত্রের মতো ভ্যাট আদায়ে অভিযান চালাতে পারছে না। বর্তমান র‌্যাবপ্রধান বেনজীর আহমদের দেশপ্রেম ও সদিচ্ছা থেকেই তার প্রস্তাব- এমনই আমরা ভাবতে চাই। কিন্তু আমার রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিশেষত এক-এগারোর সরকারের সময়ের অভিজ্ঞতা র‌্যাবের প্রস্তাবে সায় দেয়া সমীচীন হবে মর্মে আমাকে উদ্বুদ্ধ করে না। রাজস্ব আদায়ে প্রয়োজনে রাজস্ব বোর্ড আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তা নিতে পারবে এমন বিধান ভ্যাট আইনের ২৪ ধারায়ও রয়েছে। ভ্যাট গোয়েন্দা ইউনিট রয়েছে রাজস্ব বোর্ডের। এখন যেভাবে রাজস্ব বোর্ড প্রয়োজনে র‌্যাবের সহায়তা নিয়ে থাকে, সেভাবেই র‌্যাবের সহায়তা চলতে পারে। মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে ভ্যাট আইনকে অন্তর্ভুক্ত করে র‌্যাবের অভিযানকে অবারিত করে দিলে দুটি বড় অসুবিধার আশংকা সৃষ্টি হতে পারে- এক. রাজস্ব আদায় অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায় র‌্যাব অভিযানের ভয়ে একটা ভীতিকর অবস্থায় চলে যেতে পারে এবং এমন আশংকা একটা ভুলবার্তা দিতে পারে এবং দেবেও। দুই. জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেয়ে আইনি অভিযান রাজস্ব বোর্ডের ক্ষমতাকে প্রশ্নের যেমন সম্মুখীন করবে, তেমনি র‌্যাবের ক্ষমতার অপপ্রয়োগেরও একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। রাজস্ব বোর্ডের কাজ রাজস্ব বোর্ড করবে, রাজস্ব বোর্ড উপযুক্ত মনে করলে র‌্যাবের সহায়তা চাইবে- এটাই হবে সর্বোত্তম পন্থা। অতএব, র‌্যাবের প্রস্তাব বিবেচনা করা সমীচীন হতো না। তাই রাজস্ব বোর্ড র‌্যাবের প্রস্তাবটি নাকচ করে দিয়েছে।

আগেই বলেছি- আমি প্রো-আইনশৃংখলা বাহিনী, প্রো-পুলিশ তো বলাই যায়। স্থানীয় থানার সমন্বয় সভায় আমি যাই, রাজারবাগে পুলিশের অনুষ্ঠানেও আমি গিয়েছি। বেনজীর আহমদ মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার থাকতেও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের এক অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছি, বক্তব্যও রেখেছি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৩৮তম প্রতিষ্ঠা দিবসেও গিয়েছি। আমার বক্তব্যের একটা অংশ ছিল, পুলিশের অনেকের সঙ্গে মেশামেশি ভালো, কিন্তু ‘মাখামাখি’ ভালো নয়। এ ধরনের অনুষ্ঠানে সচরাচর আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে কেবল পুলিশের প্রশংসাই করে থাকেন। আমি প্রশংসার সঙ্গে একটু সমালোচনাও করেছিলাম। কারণ অনেক সময় দেখা যায় পুলিশ গুণ্ডাপাণ্ডা-সন্ত্রাসীর সঙ্গে বেশ ‘মাখামাখি’ সম্পর্কে থাকে। তাতে আমরা ভীত হই। পুলিশপ্রধানরা প্রায়ই বলে থাকেন, কিছুসংখ্যক পুলিশের অপকর্মের দায় পুলিশ বাহিনীর নয়। অবশ্যই সত্য কথা, আলবৎ সত্য, অকাট্ট সত্য। কিন্তু আমাদের কি এটাও মনে রাখা দরকার নয় যে, ‘শত মন দুগ্ধ নষ্ট বিন্দু গোচনায়’? আমাদের সমাজে, দেশে পুলিশকে বন্ধু ভাবে খুব কমজন, পুলিশকে ভয় পায় বেশিজন। ছোট্ট ছোট্ট হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার কিছু নজিরে আমিও পুলিশকে ভয়ই পাই বলা চলে। আইনের লোক পুলিশ, পুলিশের মারের বিচার ক’জন চাইতে পারে? আটক বাণিজ্য তো বেশ রমরমা আলোচনায়, ‘কিছুর’ বলে কীভাবে যে নির্দোষ-নিরীহকেও পুলিশ ঠেঙ্গাতে পারে, তা ভুক্তভোগী এবং তার স্বজনরাই জানে কেবল। তারপরও আমরা পুলিশকে বন্ধু না হলেও বন্ধু ভাবতে চেষ্টা করি। পুলিশ আছে বলেই তো আমরা নিরাপদে চলছি। দাঁত থাকতে যেমন দাতের মূল্য বোঝা যায় না, তেমনি পুলিশ না থাকলেই বোঝা যেত পুলিশ কেন প্রয়োজন। দেশে পুলিশ না থাকলে দেশটা আরও ভালো থাকত- এমন কথা কেউ কেউ হয়তো রাগ করে বলে থাকেন; কিন্তু তিনি/তারাও আবার বিপদের সময়ে দৌড়ে পুলিশের কাছেই যান। কিছু পুলিশের অপকর্মের জন্য অবশ্যই আমরা ‘পুলিশ কেন ফুলিশ হয়’ বলতে চাই না, বলবও না। কিন্তু ‘রাজনীতির খপ্পর থেকে নিষ্কৃতি চায় পুলিশ’ (যুগান্তর, ২৫ জানুয়ারি ২০১৬)- এমন স্টোরি দেখলে আমাদের বড় কষ্ট লাগে, আমরা বিরক্ত হই।

এমন খবরে আমরা কেন কষ্ট পাই, কেন বিরক্ত হই, তা জানতে চাইতে পারেন কেউ কেউ। রাজনীতির খপ্পরে পুলিশকে কে নেয়? কোনো পুলিশ যদি রাজনীতির খপ্পরে না যেতে চান, তবে কে পুলিশকে জোর করে রাজনীতির খপ্পরে নেবে? পুলিশ একটা সুশৃংখল বাহিনী। এ বাহিনীর বিচরণ সারা দেশে, এ বাহিনীর স্তরে স্তরে কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। একটা সঠিক নেতৃত্বে যদি বাহিনীটি পরিচালিত হতে পারে, তবে তো রাজনীতির প্রভাব তাদের ওপর আসার কথা নয়। আসামি গ্রেফতারে বা আসামি ছাড়াতে রাজনৈতিক চেলাচামুন্ডারা, বড় নেতারা, বা তস্য তস্য কেউ চাপ সৃষ্টি করলে পুলিশ তা না মানলে কী হবে? তাকে বদলির হুমকি আসবে; কিন্তু ওই বদলি তো পুলিশের আরেকজনই করবেন, নাকি? তিনি যদি শক্ত থাকেন এবং ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে তো তার অন্যায় বদলি হবে না। রাজনৈতিক পাণ্ডারা তাকে শারীরিকভাবে নাজেহাল করবে- এটা কি পুলিশ সামাল দিতে পারে না? অবশ্যই পারে। কিন্তু পুলিশরা নিজেরাই যদি রাজনৈতিক খপ্পরে পড়ে নিজেদের সুবিধাভোগী করতে চান, তখন তো রাজনৈতিক পাণ্ডারা আরও বেশি চাপ দেবেন। পুলিশের নিজেদের মধ্যে যদি নিয়মমাফিক চলার সাহস থাকে, তাহলে কোনো খপ্পরেই তাদের পড়তে হয় না। অনৈতিক ও অন্যায় সুযোগ-সুবিধা জায়েজ করতে পুলিশ নিজেই রাজনীতিকে অবলম্বন করে থাকে, রাজনৈতিক বলয়ে নিজেদের সঁপে দেয়, রাজনৈতিক নেতা-পাণ্ডা-গুণ্ডাকে তোয়াজ-তোষণ করে থাকে। ফলে রাজনৈতিক বলয়ের জায়েজ, না-জায়েজ সবাই পুলিশকে সময়মতো ‘ঘরকা মুরগি ডাল বরাবর’ ভেবে স্বার্থ হাসিলে সমর্থ হয়। একজন সাহসী আইজিপির নেতৃত্বে পুলিশ একবার একত্রে চেষ্টা করে দেখুক না তারা খপ্পর থেকে বেরোতে পারে কিনা- সবাই এক উদ্দেশ্যে চেষ্টা করলে অবশ্যই পারবে। আমরা আশাবাদী- পুলিশ সব খপ্পর থেকে, চাইলেই, বেরোতে পারবে।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত