আমীন আল রশীদ    |    
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
দুর্নীতি বোঝার জন্য টিআই’র রিপোর্ট লাগে?
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) রাজধানীতে যেদিন বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করে, সেদিন অর্থাৎ ২৭ জানুয়ারি রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাদেশে দুর্নীতি কেন কমছে না?’ জবাবে তিনি বলেন, 'More development, more corruption'. অর্থাৎ যত বেশি উন্নয়ন, তত বেশি দুর্নীতি! এ কথার মানে কি এটি দাঁড়ায় যে, যে দেশ যত বেশি উন্নত, সে দেশ তত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত?
ওইদিনই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন মেনে নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেন,‘দেশে দুর্নীতি রোধে কোনো উন্নতি হয়নি। দুর্নীতির ব্যাপারটাতে আমরা টাচ-ই করতে পারিনি।’
টিআই’র প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের ১৬৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৩তম। আগের বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪তম। যদিও স্কোর গতবারের মতোই আছে, ১০০তে ২৫। এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬তম এবং ২০১২ সালে ১৩তম।
তবে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টিআই’র সূচকে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ছিল চ্যাম্পিয়ন। তার মানে এ ১১ বছরে দেশের দুর্নীতি কি অনেক কমেছে? যদি না কমে তাহলে এবার ১৩তম হলো কী করে? আর যদি দুর্নীতি কমে, তাহলে এর কী প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে?
প্রশ্ন হল, বাংলাদেশে যে দুর্নীতি কমেনি, তা জানার জন্য কি টিআই’র এ রিপোর্টের ওপর নির্ভর করতে হয়? যারা প্রতিদিনই সরকারি অফিসে কোনো না কোনো কাজের জন্য যান, তাদের কাছে এ ১৩তম বা ১৪তম আসলেই কি কোনো বার্তা বহন করে?
টিআই’র এ রিপোর্ট যেদিন প্রকাশ করা হয়, সেদিনই রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রাজউকের এক গণশুনানিতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, সময়মতো টাকা-পয়সা পরিশোধ করে, নিয়ম অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও অনেকে রাজউকের প্লট বুঝে পান না। আবার প্লটের কাগজপত্র বুঝে পেলেও বাস্তবে গিয়ে দেখা যায় প্লট নেই। অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অভিযোগ আমলে নিয়ে বলেন, ‘রাজউকের কাজে নজরদারির যথেষ্ট অভাব আছে।’ এখানে নজরদারি বলতে তিনি হয়তো বুঝিয়েছেন স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।
তবে কেবল রাজউক নয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, থানা, আদালত, ব্যাংকসহ সেবাদানকারী যে কোনো প্রতিষ্ঠানেই দুর্নীতি যে কমেনি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে, তা আশপাশে তাকালেই বোঝা যায়, দেখা যায়। একটা সময় পর্যন্ত সরকারি দলের নেতাদের তদবিরে অনেক কাজ হতো। কিন্তু এখন তদবিরেও কাজ হয় না। ঘুষ আবশ্যক।
শুধু বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি আগের চেয়ে বহুগুণ যে বেড়েছে, তা জানা-বোঝার জন্য আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বললেই পরিষ্কার হওয়া যায়। এখানে টিআই’র রিপোর্টে কী থাকল বা না থাকল, সেটি জরুরি নয়।
টিআই’র ?ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর এ নিয়ে গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস এবং সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এমনকি গবেষণা পদ্ধতি নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কোনো কোনো মন্ত্রী দাবি করেছেন, সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটালাইজড হওয়ায় দুর্নীতি অনেক কমেছে।
প্রশ্ন হল, কোন্ কোন্ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি কী হারে কমেছে, সরকারের কাছে তার কি পরিষ্কার কোনো পরিসংখ্যান আছে?
বলাই হয়, নীতিনির্ধারকরা সব সময়ই বড় বড় প্রকল্প, যেমন বড় ফ্লাইওভার, বড় সেতু, মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। কারণ যে প্রকল্পের বাজেট যত বেশি, সেখান থেকে তত বড় অংকের লুটপাটের সুযোগ থাকে। এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর খরচ বেড়েছে তিন গুণ, এর কাজ সম্পন্ন হতে হতে আরও কয়েক দফা হয়তো খরচ বাড়বে। মগবাজার ফ্লাইওভারের কাজ নিয়ে নানারকমের বিতর্ক আছে। এটিরও খরচ বাড়ছে হু হু করে। আর খরচ বাড়ানোর জন্যই কাজে বিলম্ব করা হচ্ছে। বিনিময়ে রাজধানীবাসীকে উপহার দেয়া হচ্ছে ধুলো, যানজট আর বিরক্তি।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথার মধ্যে একটা তিক্ত সত্য রয়েছে, উন্নয়নের নামে যত বেশি প্রকল্প নেয়া হয়, সেখানে দুর্নীতি ও লুটপাটও হয় তত বড়। অর্থাৎ বড় বড় অবকাঠামো গড়ে উঠছে ঠিকই; কিন্তু সেই অর্থ নেয়া হচ্ছে জনগণের পকেট থেকে এবং ভারি হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের ব্যাংক ব্যালান্স। আবার দুর্নীতির সেই টাকা যে দেশের অর্থনীতিতেই যোগ হচ্ছে বা বিনিয়োগ হচ্ছে, তা নয়; বরং টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে পাচার হয়ে। কারণ চুরি ও লুটপাটের টাকা দেশের ব্যাংকে রাখলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, ‘আপনি এ টাকা কোথায় পেয়েছেন?’
দুর্নীতি-লুটপাট যে কোনো অংশে কমেনি, বরং কোথাও কোথাও বেড়েছে, তা দেশের মানুষ প্রতিনিয়তই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে টের পায়। এখানে টিআই’র রিপোর্ট স্রেফ কিছু সংবাদ, কিছু নিবন্ধ, কিছু টকশো আর বিতর্ক তৈরিতেই সহায়তা করে। দুর্নীতি কমানোর জন্য যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, তা এখনও অনুপস্থিত, এটি বোঝার জন্যও কোনো জরিপের প্রয়োজন হয় না।
রাজউকের গণশুনানিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার মো. সাহাব উদ্দিনও বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে আমরা বড় বড় গবেষণা করি, সেমিনার করি। কিন্তু সমাধান পাই না। এ কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেখতে দুদক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক টিম পাঠানো হয়েছিল; কিন্তু এসব টিম থেকে কোনো আউটপুট পাইনি। এক সময় এসব টিমও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে।’
দুর্নীতি প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় সংস্থার কর্তাব্যক্তির মুখেই যখন এমন হতাশা, তখন মন্ত্রীরা যতই বলুন দেশ ডিজিটালাইজড হয়ে যাচ্ছে বলে দুর্নীতি কমছে, সেটি খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয় না।
আমীন আল রশীদ : সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক
[email protected]




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত