এ কে এম শাহনাওয়াজ    |    
প্রকাশ : ২০ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
আত্মশুদ্ধিই উত্তরণের একমাত্র উপায়

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এবার ১৫ আগস্ট ‘জন্মদিনের’ কেক না কাটার ঘোষণা দেয়ায় আমাদের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট উদার সুশীলসমাজের অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করছেন এবং নেত্রীকে সাধুবাদ দিচ্ছেন। শুনে মনে হচ্ছে, বিএনপি নেত্রী একটি মহৎ কাজ করে ফেলেছেন। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর একসময় বিএনপি নেতৃত্ব আবিষ্কার করলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ জীবদ্দশায় তিনি নিজেই এ তথ্যটি জেনে যেতে পারেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক গতিধারার বাইরে থাকা সামরিক বাহিনীর একজন মেজর ঘোষণা দিলেন আর কোটি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল! আমি বুঝে পাই না, ইতিহাসের শাসন ও সত্যের ধার না ধেরে কার মাথায় অমন দুর্বুদ্ধি খেলেছিল। তখন থেকেই সচেতন মানুষ লক্ষ করেছে, বিএনপি নেতৃত্ব ভুল পথে হাঁটছেন। বহিরাবরণের চকচকে পোশাকে কি আর অন্তরের অন্ধকার দূর করা যায়! এরপর একদল অর্বাচীন বিএনপি নেত্রীকেও ভুল পথের ঠিকানায় নিয়ে যেতে লাগলেন। অথবা তিনি স্বেচ্ছায় মাথা পেতে দিলেন।

দল হিসেবে বিএনপির কয়েকটি সংকট জন্মলগ্ন থেকেই ছিল। কোনো রাজনৈতিক দলই ঐতিহ্য নিয়ে জন্মায় না, ধীরে ধীরে ঐতিহ্য গড়ে তোলে। এজন্য প্রথমেই একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে দলটিকে দাঁড়াতে হয়। দলের হাল ধরতে হয় মেধাবী দূরদর্শী রাজনীতিকদের। এসব হোমওয়ার্ক না করেই বিএনপি জন্মের পর থেকে বেড়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্ম নেয়া দল হলেও মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনের পুরো কৃতিত্বটিই নিতে চাইল। তাদের শহীদ দলনেতাকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক এবং একমাত্র কাণ্ডারি বানাল। কিন্তু ক্ষমতার শক্তি আর প্রচারণার দাপটে যে ইতিহাসের সত্য পাল্টানো যায় না, তা বিএনপি নেতারা বুঝতে চাননি। একেবারে বুঝতে যে পারেননি তা বোধহয় নয়; কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারেননি।

বিএনপি নেতাদের একটি অবাস্তব অভিলাষ মাথায় চেপেছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জন্ম না নেয়া বিএনপির নেতৃত্ব ক্ষমতার শক্তিটাকেই বড় করে দেখেছে। তারা মনে করেছে, ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা সম্ভব। এ কারণে ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় বিএনপি সহজে মানতে পারেনি। ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নতুন পরিকল্পনা নেয় বিএনপি। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগও নানা ভুলভ্রান্তি করে। ফলে বিএনপির আবারও ক্ষমতায় আসা সহজ হয়ে গিয়েছিল। ২০০১-এ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিএনপি সব অন্ধকার পথ চিনে নিল। এসব পথের অধিকর্তা হয়ে আজ্ঞাবহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অনুগত নির্বাচন কমিশন গঠন করে তাদের দিয়ে বানায় ভুয়া ভোটার তালিকা। এভাবে বিএনপি নেতৃত্ব পরম নিশ্চিন্ত হয়ে যান সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বারবার ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যাপারে। আর একই কারণে তাদের প্রশ্ন করার মতো কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট নেই বলে নিশ্চিন্ত হয়ে যান। একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় প্রশ্ন করার কেউ নেই বলে এ সময় থেকে দুর্নীতিতে ডুবে যান বিএনপি নেতারা।

দল হিসেবে বিএনপি অনেক বেশি কলঙ্কিত হতে থাকে এ পর্বে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সব কলঙ্ক দৃশ্যমান হয়। যদিও দুদকের অনেক ভ্রান্তি ছিল, হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যায় সিদ্ধান্তও ছিল, তবে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, অনেক রাঘববোয়াল দুর্নীতিবাজের টিকি ধরে টান দিতে পেরেছিল দুদক, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। সর্বস্তরে বিএনপির দুর্নীতি প্রকাশ মানসিকভাবে দলীয় নেতাদের দুর্বল করে দেয়। এ প্রেক্ষাপটের সঙ্গে নির্বাচনের আগে যুক্ত হয় বিএনপির জোটবন্ধু জামায়াত ইস্যু। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি ক্রমে গণদাবিতে পরিণত হয় আর এর অনেকটা দায় এসে পড়ে বিএনপির ওপর। সে সময় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের গোহারা এরই অনেকটা প্রতিফলন। সাধারণ পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, তরুণ আর মহিলা ভোটাররা বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সমর্থন দিয়েছিল মহাজোটকে। এভাবে ইতিহাস ভুলিয়ে বিএনপির সুবিধা আদায়ের প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ বাস্তবতায় বড় রকমের বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয় বিএনপি।

আদর্শভিত্তিক দল না হওয়ায় কিছু সুবিধাবাদীর নেতৃত্বে চলা বিএনপি নির্বাচনে ভরাডুবির পর সুস্থ পথে না হেঁটে ক্রমে পথ চলাকে জটিল করে তুলল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪-এর নির্বাচনে না আসা এবং ভয়ানক সন্ত্রাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা করা বিএনপির ক্রমাগত রাজনৈতিক ভ্রান্তিরই প্রকাশ ছিল। এ সময় থেকে ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে, বিএনপি ক্রমে নিজ কক্ষ ছেড়ে জামায়াতের কক্ষপথে ছুটতে থাকে। জনসভা থেকে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহতের নামে সহিংসতা ছড়ানোর সব দায়িত্ব অনেকটা স্বেচ্ছায় নিয়ে নেয় জামায়াত আর শিবির। এভাবেই বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মীদের মাঠের রাজনীতি অনেকটা ভুলিয়ে দেয় তারা। দল হিসেবে বিএনপির একটি বড় ক্ষতি হয়ে যায় এ সময় থেকে।

এসব দুর্বলতা যখন হতাশ আর বিভ্রান্ত দশায় ফেলেছে বিএনপিকে, তখন দলের জন্য শংকা নিয়ে এসেছে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের বিক্ষোভ। কমিটি গঠন নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। দীর্ঘ বিরতির পর দলীয় মহাসচিবের কাব্যিক শব্দের ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার বাস্তবতা দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা গেল না। পাঁচ শতাধিক সদস্যের হাইব্রিড কমিটি শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রকাশ করল। এরপরও পদলোভীদের মধ্যে অস্বস্তি প্রকাশ পেতে থাকলে কমিটি আরও বড় করার ইঙ্গিত দিতে থাকলেন নেতারা। অনেকে এখন রসিকতা করে বলছেন, বাঁধ যখন একবার ভেঙে গেছে তখন হাজার অতিক্রম করে হলেও ইচ্ছুক সবাইকে পদাধিকারী বানিয়ে দেয়া হোক।

কিন্তু বিএনপির মতো একটি বড় দলের এমন করুণ অবস্থা কেন! এই ‘কেন’-এর উত্তর বিএনপির অন্ধ সমর্থক ছাড়া সবারই কম-বেশি জানা। এ লেখার শুরুতেও রয়েছে এ সংক্রান্ত বিশ্লেষণ। এ সংকট দৃশ্যত এখন আরও ঘনীভূত হয়েছে। খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপির ঐক্যের প্রতীক। এ মুহূর্তে তিনি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। কয়েকবার চেষ্টা করে দেখেছেন, আন্দোলনের জন্য নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো যাচ্ছে না। বিরোধী দলে থেকে এমন নাজুক অবস্থায় মাঠের আন্দোলনে থাকতে না পারলে দলকে চাঙ্গা করা সম্ভব নয়। এখন একমাত্র খালেদা জিয়া রাজপথে নেমে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে পারত; কিন্তু তা খুব সহজ হবে না। নিজের বয়স, দলের ছন্নছাড়া অবস্থা, পুত্রশোক ও তারেক রহমানের প্রায় স্থায়ী প্রবাস নির্বাসন তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে।

এসব বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করে সচেতন মানুষের কাছে খালেদা জিয়ার জন্মদিনের কেক কাটা না কাটা বড় কোনো তাৎপর্য বহন করছে না। এর আগে ১৫ আগস্ট জাতি যখন শোক পালন করত, মোড়ে মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজত, কাঙালিভোজ হতো, ঠিক তখনই দেখা যেত একটি বড় দলের নেত্রী, একজন প্রধানমন্ত্রী অথবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কোনো রকম দ্বিধা, সংকোচ ছাড়াই দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কেকোৎসব করছেন। যা হোক, শেষ পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বের বোধোদয় ঘটেছে।

সবকিছুর পর এ সত্যটি মানতে হবে, বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে দারুণ হতাশা কাজ করছে। এভাবে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতিই হয়তো বরণ করতে যাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু এটি এ দেশের মানুষের জন্য সুখবর নয়। এমনিতেই এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অপূর্ণ গণতান্ত্রিক বোধ নিয়ে পথ হাঁটছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সবল না হলে স্বেচ্ছাচারিতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়বে। এ কারণে হলেও অন্তত বিএনপির প্রতি ভালোবাসা আছে- এমন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নেতাদের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।

এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]ail.com


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত