মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী    |    
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ইতিহাস বিকৃতির চর্চা আর কখনও নয়
লেখক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তির অবদানের কথা আমরা জানি। গত ২০ বছরে একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে তাদের লেখা পড়ে। দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাঙালি এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ- এই বিশ্বাসগুলো বাংলাদেশী তরুণদের মনের গভীরে স্থায়ী করতে তাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মিথ্যা আর ইতিহাস বিকৃতির যে চর্চা খুব সুপরিকল্পিতভাবে দেশে শুরু হয়েছিল, এর বিপরীতে বর্তমান প্রজন্মকে এ বিষয়গুলোতে সঠিক ধারণা দেয়ার কাজটি তারা করেছেন খুব সফলভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঢাকায় যে উত্তাল জনস্রোত হয়েছে, তাতে আমরা এর প্রমাণ দেখেছি। সেদিন গণজাগরণ মঞ্চের ডাকে জড়ো হওয়া লাখ লাখ মানুষের বেশিরভাগই ছিলেন বয়সে তরুণ- স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যাদের জন্ম।
১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানি নরপিশাচ এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা হত্যা করে ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী, ১৭ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলীকে। দেশপ্রেমে তাদের একেকজন ছিলেন হিমালয়সম। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা ছিলেন বিশ্বমানের- মেধায়-মননে-প্রজ্ঞায়-অভিজ্ঞতায় ও কর্মে। তারা এ দেশকে দিতে পারতেন অনেক- হয়তো একজন বা দশজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা মুহম্মদ জাফর ইকবালের চেয়েও বেশি।
’৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিটি ধাপে পাকিস্তানি শাসকদের স্বৈরাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার এ বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন সোচ্চার। তারা এ কারণেই ছিলেন পাকিস্তানি শাসকদের বিরাগভাজন। পাকিস্তানি নরপিশাচ ও তাদের এ দেশীয় দোসররা জানত এ সূর্যসন্তানরা কতটা তেজি, কতটা মেধাবী। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঠিকই এ দেশকে সোনার বাংলা বানিয়ে ছাড়বেন। যুদ্ধে পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী নীলনকশা আঁকে এদের হত্যা করে বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বহীন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়ায় পরিণত করার। ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির সার্বিক নির্দেশনায় নীলনকশার নেতৃত্ব দেয় পাকিস্তানের কিছু সামরিক কর্মকর্তা আর এর বাস্তবায়ন করে মুজাহিদ-নিজামীদের কুখ্যাত আলবদর-আলশামস বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা।
এই অদম্য ও মেধাবী শহীদ বুদ্ধীজীবীদের একজন ছিলেন ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী। তিনি ১৯৬২ সালে ইংল্যান্ডের এডিনবার্গ থেকে কার্ডিওলজিতে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তার গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছিল পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীতে। ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার কারফিউ ২ ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হয়েছিল। একজন রোগীকে দেখে ফিরে আসার পথে তিনি প্রচুর শাকসবজি কিনেছিলেন। তার স্ত্রী তাকে বারবার ৭৫ সিদ্ধেশ্বরীর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বললেও তিনি রাজি হননি। দুপুরের খাওয়ার পর তিনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। বিকালে মুজাহিদ বাহিনীর সৈন্যরা তাকে জিপে করে নিয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার দু’দিন পর ১৮ ডিসেম্বরে তার বীভৎস মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল মিরপুরে আরও শত শত শহীদ বুদ্ধিজীবীর মৃতদেহের স্তূপের মাঝে। সেদিন দুপুরে, ডা. রাব্বীকে বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে নেয়ার ঠিক আগে, তিনি কী দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন তা কি আমরা কোনোদিন জানতে চেষ্টা করেছি? তার সন্তান অথবা প্রিয়তম স্ত্রী কীভাবে কেঁদেছিলেন, তা কি আমাদের কোনো টিভি চ্যানেল কখনও দেখিয়েছে? কিন্তু আমাদের এ বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের যারা মেরেছে, তাদের ফাঁসির খবরে এই নরখাদকদের ছেলেমেয়ে বা স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া রেডিও, টিভি ও সংবাদপত্রে নিয়মিত দেখছি। তাদের কান্না, রাগ, অসহায়ত্ব দেখছি। কিন্তু কেন তাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হল, তার কোনো বর্ণনা আমরা দেখি না। আপনারা ইনসেটে তাদের অতীত কার্যকলাপও দেখান। খুনের দৃশ্য দেখান। বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও দেখান এবং স্পষ্ট করে জাতিকে বলুন এরা খুনি, এরা আমাদের সূর্যসন্তানদের ঘাতক।
২.
আমরা জানি, বাংলাদেশের একশ্রেণীর মানুষ সবসময় স্বাধীনতা যুদ্ধের সব বিষয় নিয়েই বিতর্কের সূচনা করতে ভালোবাসে। বিদেশে তুলনামূলক এটা হরহামেশা হয়। কয়েকদিন আগের এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। বাংলাদেশের এক ছাত্র অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করতে এসেছে। দেশের যে কোনো ইস্যুতে তার একটা ভয়াবহ নেগেটিভ মন্তব্য থাকে। সে তার সহপাঠী এক বাংলাদেশী ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছে- ‘তোমার দেশে ’৭১-এর যুদ্ধে কতজন মারা গেছে (খেয়াল করবেন, সে বলেছে তোমার দেশে- তার মানে বাংলাদেশ নামক দেশটা তার না)? উত্তরের অপেক্ষা না করে সে তার মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসাব করতে করতে বলল- ধরো, তোমাদের মুজিবের কথামতো ৩০ লাখ মারা গেল, তাহলে ৩০ লাখকে ৬৪ দিয়ে ভাগ করো- প্রতি জেলায় কতজন মারা গেছে তার একটা সংখ্যা তুমি পাবে। এখন এ সংখ্যাকে প্রথমে উপজেলা তারপর গ্রামের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে প্রতি গ্রামে কতজন মারা গেছে তার আনুমানিক একটা সংখ্যা পাবে। এভাবে তুমি ২ লাখ রেপের সংখ্যা থেকেও প্রতি গ্রামে রেপের সংখ্যাটা বের করতে পারবে। এখন তুমি কি প্রমাণ দিতে পারবে, তোমার গ্রামে এত সংখ্যক মানুষ ’৭১-এ মারা গেছে? রেপ হয়েছে?’
এ রকম স্পর্ধার উত্তর কী হওয়া উচিত তা আমার জানা নেই। তবে এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই যে, ৯২ হাজার প্রশিক্ষিত সৈনিক এবং ২ লাখ রাজাকার মিলে ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছে। দেশে সেনাশাসন বা পাকিস্তানপন্থীদের শাসনামলে অনেক ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের সামনে সব তথ্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আইয়ুব খানের জীবনীতেই পড়েছি- এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা একাই ১৪ হাজার বাংলাদেশী মেরেছিল। ’৭১ সালের নভেম্বর মাসে তাকে নেয়া হয়েছিল পিন্ডি হাসপাতালে। এত লাশ দেখতে দেখতে সে পাগল হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া পৃথিবীর কোনো গণহত্যার ঘটনাতেই সংখ্যা নির্ধারণ খাতা-কলম নিয়ে কেউ করেনি। টালির দাগ দিয়ে দিয়ে পাকিস্তানি জেনারেলরা বাংলাদেশে মানুষ মারেনি। সুতরাং শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই হবে না, সরকারকে আরও একটি কাজ করতে হবে। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কোনো বিরূপ কথা বলা, কোনো প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা যাতে কেউ না দেখায়- আইন করে তা বন্ধ করে দিতে হবে। সরকারের উচিত ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানো নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি যারাই ছড়াবে বা ছড়ানোর চেষ্টা করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ কোনো কথা বলা যাবে না। ঔদ্ধত্যপূর্ণ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে কঠিন শাস্তি দিতে হবে। জার্মানির হলোকস্ট ডিনাইল আইনের মতো।
৩.
বাংলাদেশের মতো এত হতভাগা দেশ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। অনেক দেশ দেখেছি। অনেক দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ওদের দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্বন্ধে কিছুটা হলেও জেনেছি। আমার এ সামান্য জানার ওপর ভর করে একটি কথা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি : পৃথিবীর কোনো প্রান্তে আপনি একটি দেশও পাবেন না, যে দেশের মানুষ তাদের নিজের দেশ এবং দেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলে। যে দেশের আলো-বাতাস-মাটি-পানিতে বড় হয়েছে, যে দেশের মানুষের টাকায় ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে- সে দেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষিত সমাজ তো দূরের কথা, কোনো শ্রেণীর মানুষই দাঁড়ায় না। যারা বাংলাদেশে বসবাস করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়, জাতির জনককে নিয়ে কথা বলে, ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে কথা বলে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের অপমান করে, যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়- তাদের ঘৃণা করা উচিত। সর্বক্ষেত্রে বর্জন করা উচিত। আইনের আওতায় আনা উচিত।
কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম, পাকিস্তানের কিছু তরুণ দাবি তুলেছে ১৯৭১ সালের কৃতকর্মের জন্য তাদের সরকারকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ দাবিটি আমাদের উঠতে-বসতে করা দরকার। সব আন্তর্জাতিক ফোরামে এ দাবিটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবসময় তোলা উচিত। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের কীর্তিকলাপের বর্ণনাও দেয়া উচিত। এগুলো যত বেশি বেশি করা হবে, ততই বিশ্ব জানবে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে কী করেছিল। ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানকে এটা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে।
মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী : বিজ্ঞানী ও শিক্ষক, গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
[email protected]




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত