সুশান্ত সিনহা    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পরিবেশবাদীদের ঝুঁকি বাড়ছে বিশ্বব্যাপী
দিনে দিনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন। পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, গত বছর বন-পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত ২শ’ কর্মীকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৪ জন। এ কারণে ২০১৬ সালকে পরিবেশ রক্ষা কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছে গ্লোবাল উইটনেস। নিজ ভূমিসহ প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের বিরোধিতা করায় এই রেকর্ডসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এ সংক্রান্ত ‘ডিফেন্ডারস অব দ্য আর্থ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে পরিবেশবাদী এই সংগঠন।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বনজসম্পদ পাচারকারী চক্র, তেল-গ্যাস-কয়লাসহ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনকারী কোম্পানির লোকজনের হাতেই প্রাণ গেছে বেশির ভাগ পরিবেশকর্মীর। প্রতি বছরই বাড়ছে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত কর্মীদের খুনের ঘটনা; খুনের শিকার প্রায় ৪০ ভাগই স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী। ২০১৪ সালে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনে যুক্ত কর্মীদের খুনের সংখ্যা ছিল ১১৫। ২০১৫ সালে তা ছিল ১৮৫। আর গত বছর ১৫টি হত্যাকাণ্ড বেড়ে হয়েছে ২০০। এর মধ্যে শুধু ব্রাজিলে প্রাণ হারিয়েছে ৪৯ পরিবেশকর্মী। এর সঙ্গে কলম্বিয়ায় নিহতদের সংখ্যা যোগ করলে হত্যাকাণ্ডের ৬০ ভাগই ঘটেছে ল্যাটিন আমেরিকায়। বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগানদাতা ‘পৃথিবীর ফুসফুস’খ্যাত আমাজন বনের কাঠ পাচার, বন কেটে কৃষিকাজ করা, বাণিজ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ দখলই এসব হত্যাকাণ্ডের অন্তর্নিহিত কারণ তাও, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাজনের অমূল্য সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত লুণ্ঠনকারীদের হাতে শুধু ব্রাজিলে ২৪৯ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনকারী প্রাণ হারিয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল উইটনেস-এর ‘ডিফেন্ডারস অব দ্য আর্থ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনকর্মী খুনের শীর্ষ দশের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কলম্বিয়া, যেখানে প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ জন। উল্লিখিত তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিতে গত বছরে প্রাণ হারিয়েছে ২৮ জন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী। উল্লিখিত তালিকার তথ্য অনুযায়ী গত বছরে নিহতের সংখ্যা ভারতে ১৬, হন্ডুরাসে ১৪, নিকারাগুয়ায় ১১, কঙ্গোতে ১০, গুয়াতেমালায় ৬ এবং ইরানে ৩।
ভূমি থেকে উচ্ছেদে প্রথমে হুমকি, তারপর নানা কৌশলে প্রতিবাদকারীদের দমনের চেষ্টা করে খনিজ সম্পদ আহরণকারী কোম্পানি ও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। জুলুম-নির্যাতনের পরও সরে না গেলে চলে খুনখারাবি।
উন্মুক্ত কয়লা খনির কারণে পানি দূষণ ছড়িয়ে পড়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ার পরপরই হত্যার হুমকি দেয়া হয় কলম্বিয়ার আদিবাসী নেত্রী ও পরিবেশ অধিকারকর্মী জ্যাকুলিন রোমিরোকে। ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত খনির কারণে ওই অঞ্চলের নদীসহ জলাশয়গুলোর দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ছিল তার অপরাধ। পানির মূল উৎস দূষিত হওয়ায় বিপাকে পড়ে স্থানীয় ওয়াইনু আদিবাসী জনগোষ্ঠী। একদিকে দূষণ, অন্যদিকে উন্মুক্ত খনি সম্প্রসারণের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রাদায়টি।
একইভাবে উচ্ছেদ আতংকে দিন গুনছে নিকারাগুয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীও। ২০১৩ সালে ক্যারিবীয় সমুদ্রের মাধ্যমে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ মহাখাল নির্মাণে চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে নিকারাগুয়া সরকার। বিশ্বের সবচেয়ে প্রকৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত আন্তঃমহাসমুদ্র সংযোগ খালের দৈঘ্য ২৮৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ২০ মিটার এবং গভীরতা ২২ মিটার; যা সুয়েজ খালের চেয়েও প্রায় একশ’ কিলোমিটার বড়। আর পানামা খালের প্রায় তিনগুণ। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। যদিও চীনা কোম্পানির প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ও অর্থের জোগান নিয়ে রহস্য কাটেনি। এই মহাখাল নির্মাণ হয়তো সমুদ্র পথে বড় ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমাবে- বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখবে। অপরদিকে খাল খননের কারণে ওই এলাকায় বসবাসরত ১ লাখ ২০ হাজার আদিবাসীকে উচ্ছেদ হতে হবে। পূর্ব পুরুষের বসতভিটাসহ জীবন-জীবিকা রক্ষায় আন্দোলনে নামে স্থানীয়রা। ব্রাজিল-কঙ্গোর মতো এখানেও চলে ভয়ংকর দমন পীড়ন। গত বছরে ১১ আন্দোলনকর্মী খুন হয়েছে যার মধ্যে ১০ জনই ওই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। এ প্রকল্পের কারণে হুমকির মুখে পড়বে মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে বড় সুপেয় পানির আঁধার লেক নিকারাগুয়া। লেকের ভেতর দিয়ে যাবে আন্তঃমহাসমুদ্র মহাখালের প্রায় ২৫ কিলোমিটার। বড় বড় জাহাজ চলাচলে সুবিধার জন্য বর্তমান লেকের গভীরতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খনন করতে হবে। এতে লেক নিকারাগুয়ার মাছসহ প্রাণিজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়ার আশংকা পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের; যে ক্ষতি হবে অপূরণীয়। এতে নষ্ট হবে হাজার হাজার একর কৃষি জমিও। পুরো বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে, তখন পরিবেশ বিধ্বংসী এমন প্রকল্প কতটা জরুরি তা মূল্যায়ন জরুরি। বিশেষ করে কোন বিনিময়ে কী পাওয়া যাবে আর ভবিষ্যতে ক্ষতি কী হতে পারে তা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে নদ-নদী-খাল-বিলসহ পরিবেশের ওপর। কারণ পরিবেশ না বাঁচলে উন্নয়ন অর্থহীন হবে।
সুশান্ত সিনহা : সাংবাদিক
[email protected]




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত