¦
আমিরাতের চিড়িয়াখানায়

কামরুল হাসান জনি | প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০১৫

এক সময় পানিশূন্য আরব্য নগরীতে মানুষের বেঁচে থাকাই ছিল দুর্বিষহ। জীব-জন্তু, প্রাণীকূল বা চিড়িয়ার বসবাস করা যে স্বপ্নের কথপোকথনের মতোই ছিল! অথচ সেই মরুর বুকে এখন অনেকেই যত্নে পুষছেন জীবজন্তু। অবাধে বাস করছে নানা প্রজাতির প্রাণী। পশু-পাখির অবাধ চরণক্ষেত্র ছাড়াও আমিরাতে আগত দর্শনার্থীদের আনন্দ বিনোদন জোগাতে সরকারিভাবেই তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি চিড়িয়াখানা। আমিরাতের সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানাটি হচ্ছে আমিরাতের অন্যতম বিভাগ আল আইনে। নাম ‘আল আইন জু’। দুবাই শহরের জুমেইরাহ বিচ এলাকায় আরব্য উপদ্বীপের সবচেয়ে প্রাচীন চিড়িয়াখানা ‘দুবাই জু’। অনেক পর্যটক ‘দুবাই জু’ কে ‘অ্যানিম্যাল্ প্রিজ্ন’ (পশুর কারাগার) বলে থাকেন। এছাড়াও আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘আমিরাত পার্ক জু’ নামে নান্দনিক এক চিড়িয়াখানা। অ্যারাাবয়ানরা এটিকে বলে ‘হাদিকাতুল হাইওয়ানাত’। আবার এই পার্ক জু ‘কিডস পার্ক’ নামেও পরিচিত।
একজন ভ্রমণপিপাসু হিসেবেই তপ্ত মরুর বুকে বাস করা এ চিড়িয়াদের দেখতে মনস্থির করেই আবুধাবিতে পৌঁছলাম। যেহেতু বর্তমানে বসবাস দুবাই শহরে। তাই একদিন আগেই আমাকে যেতে হল আবুধাবির শাহামা এলাকায়। উঠেছিলাম আল বাইহিয়া এক বড় ভাইয়ের বাসায়। উদ্দেশ্য পরদিন সকাল সকাল ঘুরে বেড়াব আবুধাবির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। সকাল হল, পরিকল্পনা অনুযায়ী বের হলাম। যদিও প্রাইভেট গাড়িতে করে খুবই অল্প সময়ে যাওয়া যায় ‘আমিরাত পার্ক জু’তে। তবুও ভ্রমণকারী হিসেবে বাসেই যাত্রা কেই উত্তম মনে হল। চার দিরহাম বাস ভাড়া দিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটে আল বাহিইয়া আবাসিক এলাকা ঘুরে পৌঁছলাম গন্তব্যে। তখন সকাল আটটা। চিড়িয়াখানার মূল ফটকে শুধু একজন সিকিউরিটি আর কয়েকজন ক্লিনারকে দেখতে পেলাম। খানিকটা হতাশ হয়ে বাইরের চারপাশ ঘুরে দেখলাম। বাইরের দেয়ালে তৈরি করার ছবি আর জীবজন্তুগুলো বেশ চমৎকারই লাগছিল। কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর দেখা মিলল একজন পাকিস্তানি ভদ্রলোকের। তিনিও সিকিউরিটির দায়িত্বে আছেন। তবে চিড়িয়াখানার জন্য নয়, তার দায়িত্ব এখানকার পর্যটকদের জন্য তৈরি করা থ্রি স্টার আবাসিক হোটেলের। তার সঙ্গে কথা বলে জানলাম মূল ফটক ও টিকিট কাউন্টার খুলতে আরও সময় লাগবে। সকাল সাড়ে ৯টায়। কি আর করা অপেক্ষা করতে হল বেশকিছু সময়। অবশ্য সেই সময়টা গেটের সঙ্গে থাকা রেস্টুরেন্টে বসে কেটে গেছে। তবে কথা হয়েছে এখানকার অনেকের সঙ্গে। জানলাম চিড়িয়াখানা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়।
আমিরাত পার্ক জু : আবুধাবির পুরনো শাহামা বাস স্টেশনের কাছাকাছি আল বাইহিয়া নামক স্থানে বিশাল এলাকা নিয়ে নান্দনিক পরিবেশে তৈরি করা হয়েছে ‘আমিরাত পার্ক জু’। এ যেন মরুর বুকে জীবজন্তুর সমাহার। একদিকে যেমন চিড়িয়াদের দেখে চোখ জুড়ায় দর্শনার্থীদের অন্যদিকে খোলা পরিবেশে আড্ডা, গল্প আর পিকনিকেরও আয়োজন করে কাটানো যায় ছুটির দিন। এখানে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ দিরহাম, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২০ দিরহাম আর দুই বছরের কম বয়সের শিশুদের জন্য ফ্রি। এছাড়াও কয়েকজনের গ্র“প ট্যুরে এলে টিকিটে বিভিন্ন ধরনের ছাড়ও দেয়া হয়। যেমন ১০ জনের অধিক হলে ২টি টিকিট ফ্রি, ১৫ জনের অধিক হলে ৩টি টিকিট ফ্রি, আর ২০ জনের অধিক হলে ৪টি টিকিট ফ্রি পাওয়া যায়। তবে বাইরের খাবার নেয়া যাবে না এমন নিষেধাজ্ঞার শর্ত প্রযোজ্য থাকে সব দর্শনার্থীদের জন্য। এতে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ চিড়িয়াখানার ভেতরেই রয়েছে দুটি উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট। দূরে পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য আছে আবাসিক থ্রি স্টার হোটেল। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার উন্মুক্ত পরিবেশ। বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া, বানর, কুমির, উটপাখি, ঈগলসহ নানা প্রজাতির পশুপাখির সমারোহ এখানে। বর্তমানে চিড়িয়াখানা এলাকার ভেতরেই নতুনভাবে তৈরি করা হচ্ছে সুইমিংপুল ও বড়-ছোট বাচ্চাদের খেলাধুলার আলাদা ময়দান। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে নিরাপত্তাকর্মী। আর চিড়িয়াদের সেবায় নিয়োজিত আছে পশুর ডাক্তার।
আমিরাত পার্ক জু খোলা থাকে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। দর্শনার্থীরা অতিসহজে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে পৌঁছতে পারেন বাহিইয়াস্থ পার্কের একনম্বর গেটে। এটি পুরনো শাহামা বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা। তবে দূরের দর্শনার্থীদের জন্য আবুধাবি ও মুসসাফাহ থেকে রয়েছে সরাসরি বাসে যাতায়াতের সুবিধা। এছাড়া শাহামা বাস স্টেশন থেকে আছে ২০১, ২০২, ২১৮, ২২৫, ও ৪২০ নম্বর বাস। এ বাসগুলো স্ব-স্ব গন্তব্যে পৌঁছার আগে একবার করে আমিরাত জু পার্কের বাসস্ট্যান্ডে থামে।
দুবাই জু : জুমেইরাহ বিচ রোডে দুবাই জু’র অবস্থান। অ্যারাবিয়ান উপদ্বীপের প্রাচীনতম নির্দশন দুবাই চিড়িয়াখানা। সর্বপ্রথম ১৯৬৭ সালে ১.৫ হেক্টর আয়তনের পরিধি নিয়ে দুবাই চিড়িয়াখানার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে আয়তন বৃদ্ধি করে জুমেইরাহ এলাকায় ২ হেক্টর জায়গার ওপর নতুন করে গড়ে তোলা হয় দুবাই চিড়িয়াখানা। দুবাই মিউনিসিপালিটি ১৯৭১ সালে এটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়ে এতে বিড়াল, বানর, সরীসৃপ ও অল্প কিছু জীবজন্তুসহ একটি ছোট অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখে কিছু মাছ। পরে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত করা হয় চিড়িয়াখানার আবার নকশা ও পুনর্নির্মাণ। ১৯৮৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত করা হয়েছে কয়েকবার নকশার পরির্বতন। বর্তমানে বাঘ, সিংহ, জিরাফ, হরিণ, শিয়াল, জাগুয়ার, শিম্পাঞ্জি, বানর, শজারু, ভেড়া, নেকড়ে, বনবিড়াল, উটপাখি, গোল্ডেন ঈগল, তোতা পাখি, সরীসৃপসহ প্রায় হাজারও পশু-পাখি রয়েছে এখানে।
দুবাইতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের একটি বিশাল অংশই প্রতিবছর ঘুরে দেখেন নান্দনিক এ চিড়িয়াখানা। অনেকে এটিকে ‘অ্যানিম্যাল প্রিজন’ বলেও থাকেন। গ্রীষ্মকালে এটি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ও শীতকালে সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
আল আইন জু : সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানাটি হচ্ছে ‘আল আইন জু’। ১৯৬৯ সালে নির্মিত হয় এটি। এটি আমিরাতের আল আইন জেবেল হাফিত পর্বতমালার পাদদেশে ৪০০ হেক্টর আয়তন নিয়ে তৈরি করা হয়। গাছের ছায়ার তলে এ চিড়িয়াখানায় হরিণ, মৃগের প্রজননের জন্য খোঁয়াড় আকৃতির রয়েছে চমৎকার পরিবেশ। এখানে রয়েছে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সাদা সিংহ। বলা চলে এটি একটি বিড়ালের বড় ঘর। কারণ এখানে নানা প্রজাতির বিড়াল রাখা আছে। এছাড়াও আছে সিংহ, কালো ও ছোপওয়ালা চিতাবাঘ, জাগুয়ার সরীসৃপের আলাদা ঘর, মিশ্র প্রজাতির বানর, শিকারি পাখি, মাছের অ্যাকোরিয়াম ও পক্ষীশালা। ডাইনোসরদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে রাখা হয়েছে এখানে ১৫-২০টির মতো যান্ত্রিক ডাইনোসর। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজারের মতো জীবজন্তু রয়েছে আল আইন চিড়িয়াখানায়।
আবুধাবি থেকে আল আইন পৌঁছে মাত্র আধঘণ্টার রাস্তায় এ চিড়িয়াখানা। সড়কপথে ‘আল আইন জু’-এর দিকনির্দেশনা দিয়ে রাস্তার পাশে দেয়া আছে বিভিন্ন সাইনবোর্ড। ওসব বোর্ডগুলো অনুসরণ করে যে কোনো পর্যটক পৌঁছাতে পারে ‘আল আইন জু’তে। আল আইন হায়ার কলেজ অফ টেকনোলজি কলেজের খুব কাছে খলিফা বিন জায়েদ আল আওয়াল সড়কেই আল আইন জু। এটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে শনিবার থেকে বুধবার সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং বৃহস্পতি ও শুক্রবার খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এছাড়া দুই ঈদের ছুটিতে এটি খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। টিকিটের মূল্য বয়স ভেদে ভিন্ন ভিন্ন।
হেঁটে পুরো চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখতে সময় লেগে যেতে পারে প্রায় দুই ঘণ্টা। তবে চিড়িয়াখানার বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখতে দর্শনার্থীদের জন্য ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ‘হলুদ’ চিহ্নিত (আফ্রিকান সিংহ, বাংলার বাঘ, শিম্পাঞ্জী, লবণ জলের কুমির, প্যান্থার, নীল নদের কুমির এবং চিতাবাঘ) বিভাগে ট্রেন প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে। মনোরম পরিবেশ ও পাহাড়ি অঞ্চলে তৈরি প্রাণিকুলের সমারোহে এ চিড়িয়াখানা যেন অন্যরকম সৌন্দর্যে ভরা। যতই ঘুরে দেখা হয় ততই যেন নয়ন আটকে যায় একেকটি প্রাণীর একেক রকম সৌন্দর্যে।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক
[email protected]
 

পরবাস পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close