¦

এইমাত্র পাওয়া

  • রাজধানী থেকে কোকেনসহ আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের ৩ সদস্য আটক
হুমকি দেন সরকারদলীয় এমপি ও প্রার্থীরা

কাজী জেবেল | প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

পৌর নির্বাচনে কেন্দ্র দখল ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে বাধা দেয়ায় কয়েকজন রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন সরকারদলীয় এমপি ও প্রার্থীরা। এ ছাড়া কয়েকটি পৌরসভায় ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা এবং ভোট গ্রহণের সময় কেন্দ্র দখলে সহযোগিতা না করায় কয়েকজন প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকেও মারধর করেছে তারা। কোথাও কোথাও রিটার্নিং কর্মকর্তাকেও জিম্মি করে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। বুধবার ভোট গ্রহণের সময় নির্বাচন কমিশনে পাঠানো রিটার্নিং কর্মকর্তাদের গোপন প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, কোথাও কোথাও ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন নির্বাচনী কর্মকর্তারাও। ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে লুকিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে নির্বাচন কমিশন কতৃক গঠিত অইনশৃংখলা পরিস্থিতি মনিটরিং সমন্বয় সেলকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। অথচ নির্বাচনে আইনশৃংখলা বাহিনীর কার্যক্রম মনিটরিং ও নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্ব ছিল এ কমিটির ওপর।
ইসি সূত্র জানায়, ভোট গ্রহণ পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে সমন্বয় সেল ছাড়াও পৃথকভাবে কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে তা কমিশনার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেন। ওইসব প্রতিবেদনে নির্বাচনের অনিয়ম, কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া, প্রভাব বিস্তারসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশ কিছু পৌরসভায় কমিশন ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে বেলা পৌনে ১টায় তিন নম্বর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোরহানউদ্দিন পৌরসভায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম। এ পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন নির্বাচনে সুষ্ঠু রাখতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পরপর দু’বার ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা কোথায় থাকবেন তা দেখে নেয়া হবে বলেও হুমকি দেন তারা।
ওই প্রতিবেদনে আরাও বলা হয়, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ৯নং কেন্দ্র, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের ৮নং কেন্দ্রে ও উজিরপুরের ৯নং কেন্দ্রে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে আইনশৃংখলা বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে এসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। কয়েকটি পৌরসভায় ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মারা ছিল। কোথাও কোথাও নির্বাচন কর্মকর্তারা নিজেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়েন। মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভার দুটি কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারার ঘটনায় ওই দুই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে লুকিয়ে রেখেছিলেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। ওই পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন কমিশনে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ৬ নং ওয়ার্ডের ১০নং ভোট কেন্দ্র কাস্টঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্যালট পেপার যাচাই করে দেখা গেছে মেয়র ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর আসনের ১ হাজার ৪৩৬টি ব্যালটের মধ্যে উভয় পদে ৮০১টি ব্যালট পেপারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে জিজ্ঞাসাবাদে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. নিরোদ বরন জয়ধর স্বীকার করেন, ৮০১টি ব্যালটে সিল মেরে ফাইল কেবিনেটে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এ কেন্দ্রের দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা এসআই মো. কুদ্দুস ব্যালট পেপারে সিল মারার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একই পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ জনারদন্দী কেন্দ্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদের জিম্মি করে ভোটের আগের রাতে ৫০০ ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করতে অনুরোধ জানান। এ খবর পেয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ রাত ২টার দিকে কেন্দ্রে গিয়ে ৫০০ ব্যালট পেপার নৌকা প্রতীকে সিল মারা অবস্থায় উদ্ধার করেন। এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
অপর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বরুড়া পৌরসভার সাবের শিলমুড়ি উ. ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে স্থাপিত কেন্দ্রে ভোটের আগের রাত ২টা ৩০ মিনিট থেকে ৪টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টা দখল করে ১ হাজার ২০০ ব্যালট পেপারে সিল মারে সন্ত্রাসীরা। ওই সময়ে মেয়র পদের এক হাজার ২০০ ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারা হয়। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে এ সময় পুলিশ ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনায় ওই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
বুধবার ভোরে চন্দনাইশ পৌরসভার ১৫ নম্বর কেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ব্যালট পেপারের নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রাখে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে ভোট গ্রহণ সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ওই পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা।
জামালপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রাসেল সাবরিন এক প্রতিবেদনে ইসিকে জানান, ভোট গ্রহণ শুরুর এক ঘণ্টা পর বুধবার সকাল ৯টার দিকে বানিয়া বাজার উচ্চ বিদ্যালয়, ছনকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বগাবাইদ আজাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল করে মার্কিং, সিল ও ব্যালট পেপার ছিনতাই করা হয়। চাটখিল পৌরসভার বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তর হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৪টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের মারধর করা হয়েছে। এছাড়া ব্যালট পেপার ছিনতাইসহ কেন্দ্র দখলের ঘটনায় এ পৌরসভার ৪টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা।
অপর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ঘেরাও করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। ওই সময় ঘেরাওকারীরা নৌকা প্রতীকে মিছিল  ও স্লোগান দেয়। মতলব পৌরসভার দক্ষিণ বাইশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র কতিপয় সন্ত্রাসী দখল করে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় এক ঘণ্টা ভোট গ্রহণ স্থগিত ছিল। সেখানে ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার পর ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়। লাকসাম পৌরসভার ধামৈচ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের আশপাশে মারামারি ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। তবে ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়নি।
অকার্যকর ছিল আইনশৃংখলা সমন্বয় সেল : পৌর নির্বাচনের আইনশৃংখলা সমন্বয় ও মনিটরিংয়ের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ভোট গ্রহণের সময় ওই কমিটির কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। কমিশন সচিবালয়ের তৃতীয় তলার কনফারেন্স রুমে বসানো মনিটরিং সেলে একাধিকবার গিয়ে দেখা যায়, কমিটির সাত সদস্যের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও কমিটির মাত্র দু’জন সদস্য চুপচাপ বসে আছেন। নির্বাচন মনিটরিংয়ের জন্য তাদের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। তবে নির্বাচন কমিশনের ১৪ জন কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দফায় দফায় প্রতিবেদন তৈরি করেন। ওই প্রতিবেদনের আলোকে কমিশনকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা পাঠাতে দেখা গেছে। সূত্র জানায়, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের এ কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব, পুলিশের এসপি পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা, বিজিবি, র‌্যাব এবং আনসার ও ভিডিপির মেজর পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের এসপি/এডিশনাল এসপি পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল- আইনশৃংখলা বাহিনীর নিজস্ব যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কমিশনের নির্দেশনা তাৎক্ষণিক মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। ভোট কেন্দ্র বা নির্বাচনী এলাকায় শান্তিশৃংখলা রক্ষার্থে বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করা। ভোট গ্রহণ কাজে নিরাপত্তা বিধানের জন্য মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত আইনশৃংখলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে সহায়তা দেয়া। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ কমিটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।
অনিয়মে জড়িত ৬ কর্মকর্তা সাসপেন্ড : ইসি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনী অনিয়মে জড়িত অভিযোগ প্রমাণ পাওয়ায় পুলিশের ৫ কর্মকর্তা এবং এনএসআই’র এক সদস্যকে সাসপেন্ড করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের থেকে ইসিতে আসা প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ইসি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, পৌর ভোটে অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও মাদারীপুরের কালকিনির ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে আইজিপিকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পুলিশ কর্মকর্তারা হলেন চন্দনাইশ পৌরসভায় দায়িত্ব পাওয়া নাজমুল হোসেন, আলমগীর ভূঁইয়া ও মো. সোলাইমান এবং কালকিনির আবদুল কুদ্দুস শিকদার ও শরীফ আবদুর রশীদ। এদিকে পটুয়াখালী জেলার এনএসআই’র পর্যবেক্ষক কনস্টেবল ফরহাদ হোসেন রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ফোন করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কাজ করতে নির্দেশ দিতে বলেন। বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল কবীর নির্বাচন কমিশনকে জানালে ওই সদস্যকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। বুধবার সন্ধ্যায় উপসচিব সামসুল আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কমিশনের এ সিদ্ধান্ত এনএসআই মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।  
 

বাংলার মুখ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close