¦
দীর্ঘ চলার পথে হারিয়েছে অনেক ত্যাগী নেতা

প্রিন্ট সংস্করণ, ২৩ জুন: | প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৫

ঐতিহাসিক প্রয়োজনে জন্ম নিয়ে নানা চড়াই-উতরাই ও সংগ্রামমুখর পথ ধরে ৬৭ বছরে পা দিল দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংকট সামলে উঠলেও দলটি হারিয়ে ফেলেছে অনেক সংগ্রামী, ত্যাগী ও আদর্শবান নেতা। কখনও দল তাদের ত্যাগ করেছে আবার কখনও তারা নিজেরাই দল ছেড়ে গেছেন। ১৯৪৯ সাল থেকে শুরু করে সর্বশেষ এক-এগারোয় অনেকে দল থেকে ছিটকে গেছেন।
এ প্রক্রিয়ায় অনেকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, অনেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দল থেকে বাদ পড়েছেন। আবার অনেকে আদর্শচ্যুত হয়ে দল ত্যাগ করেছেন। কিংবা অনেকে অভিমান করে দল থেকে দূরে সরে আছেন।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামছুল হক। প্রতিষ্ঠার আট বছর পর ১৯৫৭ সালে ভাসানী দল ছেড়ে ন্যাপ গঠন করেন আর শামসুল হক দীর্ঘ জেলজীবনে পাকিস্তানি শাসকের অত্যাচারে অসুস্থ হয়ে যান। চার জাতীয় নেতার অন্যতম তাজউদ্দীন আহমদ শেষ জীবনে আওয়ামী লীগে থাকতে পারেননি। আওয়ামী লীগ ছেড়ে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ গড়েছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথমদিকে প্রকাশ্যে প্রতিবাদকারীর একজন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন নেই আওয়ামী লীগে। তিনি এখন গণফোরামের সভাপতি।
দল ছেড়েছিলেন তুখোড় সংগঠক আবদুর রাজ্জাকও। পরে অবশ্য তিনি দলে ফিরে আসেন। তার সমসাময়িক নেতা আবদুল জলিল শেষ জীবনে দলে উপেক্ষিত হয়ে পড়েন। দুজনই দীর্ঘ রোগে ভুগে মৃত্যুবরণ করেন।
বঙ্গবন্ধুর চার খলিফাখ্যাত ছাত্রলীগের সাবেক চার নেতার কেউই এখন আওয়ামী লীগে নেই। এদের একজন শাজাহান সিরাজ এখন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আরেকজন নূরে আলম সিদ্দিকী সাবেক ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশন গড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। আ স ম আবদুর রব এখন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি। আর তৎকালীন ডাকসুর জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন মারা গেছেন।
ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কেএম ওবায়দুর রহমান ও কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতি করেছেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী এখন পিডিপির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ছাত্রলীগের নিউক্লিয়ারসখ্যাত মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক সিরাজুল আলম খান অনেক আগেই আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।
যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এবং বৃহত্তর রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফুলু সরকার এখন রাজনীতিতেই নেই। নেপথ্যে থেকে দলের নেতাকর্মীদের জন্য কাজ করে গেলেও অভিমানে তিনি দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন। চেষ্টা করেও দলে ফিরতে পারেননি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মোজাফফর হোসেন পল্টু।
ফুলু সরকার যুগান্তরকে বলেন, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার বা আওয়ামী লীগ করার কেউ ছিল না বলা চলে। ঢাকা শহরসহ যেখানে যেখানে দলের লোকজন আত্মগোপনে ছিল লুঙ্গি পরে হেঁটে হেঁটে তাদের কাছে যেতাম। ধরা পড়লে মেরে ফেলবে বলে মূল রাস্তা ছেড়ে গলি ধরে যাতায়াত করতাম। দলের লোকদের সঙ্গে এভাবে যোগাযোগ করতাম আমরা। কখনও একা কখনও বা তিন-চারজন মিলে। এভাবে দলকে সংগঠিত করার কাজে ঢাকা শহরসহ পুরো দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। দল ত্যাগীদের, সংগ্রামীদের একদিন না একদিন মূল্যায়ন করবে বলে বিশ্বাস করি। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দল, সেই আদর্শ ধারণ করেই পথ চলছি।
আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুপন্থী ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম। আর দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন তার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। শেখ শহিদুল ইসলাম জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) মহাসচিব। আর শফিউল আলম প্রধান জাগপার সভাপতি। একসময়ের বলিষ্ঠ নেতা মুকুল বোস এক-এগারোর ধাক্কা আজও সামলাতে পারেননি। তিনি এখনও দলের বাইরে। তার মতোই এক-এগারোর সময় দল থেকে ছিটকে পড়েন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান, অধ্যাপিকা নাজমা রহমানসহ আরও অনেকে।
মুকুল বোসের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভাই মৃণাল বোস জগন্নাথ হলে শহীদ হন। তা শোনার পর তার বাবা হার্ট ফেইল করে মারা যান। ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার সাত বছর জেল হয়, সেনাবাহিনী তাকে নিয়ে দুই মাস অত্যাচার করে যা শুনে তার মা হার্ট ফেইল করে মারা যান। আওয়ামী লীগের জন্য তার পরিবার অনেক ত্যাগ করেছে এবং ভবিষ্যতেও যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেন মুকুল বোস।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি, করব, এর বাইরে কোনো নেতা নেই। অতীতের মতো ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগের সেবায় তিনি ও তার পরিবার প্রস্তুত। তবে, দলে ত্যাগীদের প্রতিষ্ঠিত করা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, টাকাওয়ালারা আজ আছে তো কাল নেই।
তুখোড় বক্তা ৭৫-পরবর্তী ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এখন বিএনপির কিশোরগঞ্জ জেলার সভাপতি। দলে নেই ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ) সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। জাসদ থেকে আওয়ামী লীগে আসা একসময়ের জনপ্রিয় নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না দল থেকে বাদ পড়ে সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। পরে নাগরিক ঐক্য গঠন করেন। শেষে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো গুরুতর অভিযোগে এখন কারাগারে।
আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করা ছাত্রলীগ নেতা মোস্তফা মহসীন মন্টু গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগের তুখোড় নেতা হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গ দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। কিছুদিন আগে এক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন এ নেতা।
৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা। একই অবস্থা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাজহারুল হক বাকী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ, ৬৯ সালের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলীর। তারা কেউই এখন আওয়ামী লীগে নেই।
এ ছাড়া ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ রশিদ, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুন্নু, সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নানও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নন।

সর্বশেষ খবর পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close