¦
কৃষি ব্যাংকের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা প্রয়োজন

| প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৫

কৃষি ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থলগ্নিকারী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে এর ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি ব্যাংকের অপরিহার্যতা অনুধাবন করতে হলে আমাদের এর উৎপত্তি ও উদ্দেশ্যাবলীর পর্যালোচনা করা দরকার। ১৮৭৬-৭৮ সালের ধ্বংসাত্মক দুর্ভিক্ষের ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় (বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়। খাদ্যশস্যের প্রকট অভাবের দরুন সংঘটিত হয় আকাল ও বীভৎস মৃত্যু, যা শিল্পী জয়নুল আবেদীনের চিত্রকর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আজও। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে সক্ষম হয়, খাদ্যশস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন ছাড়া এ দেশীয় মানুষের কল্যাণ কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। তাই কৃষক ও কৃষিপণ্য মুখ্য হয়ে ওঠে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর কাছে। সে লক্ষ্যে কৃষি সহায়তার জন্য ভূমির বিপরীতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য ১৮৮০ সালে ফেমিন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই কমিশনের সুপারিশের আলোকে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮০ সালে দ্য ল্যান্ড ইমপ্র“ভমেন্ট অ্যাক্ট এবং ১৮৮৪ সালে দি এগ্রিকালচারিস্ট লোন অ্যাক্ট প্রতিষ্ঠা করে। এতে কৃষকের মাঝে সহজ শর্তে কৃষিঋণ বিতরণের জন্য খাতসমূহ চিহ্নিত করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কূপ তৈরি, সেচ ব্যবস্থা, ভূমি উন্নয়ন, হালের পশু ক্রয়, বীজ, সার ও কীটনাশক ক্রয় ইত্যাদির জন্য নগদ টাকা ঋণ ব্যবস্থার সূচনা করা হয়। কৃষিকে প্রাধান্য দিয়ে এর ধারাবাহিকতায় ১৯২৮ সালে গঠন করা হয় দ্য রয়েল কমিশন অব এগ্রিকালচার। এর পর ১৯৪০ সালে দেশে ব্যাপক খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয় দ্য বেঙ্গল কো-অপারেটিভ সোসাইটি অ্যাক্ট। ১৯৪৭-৪৮ সালে দেশ বিভক্তির পর গঠিত হয় দি ইস্ট পাকিস্তান প্রভিন্সিয়াল ব্যাংক লি.। পাকিস্তান সরকারের তাকাভি ঋণ কৃষকের সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ছিল না বলে নতুন উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় দি এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (এডিএফসি)। এর মূলধন ছিল মাত্র ৫ কোটি টাকা। ঋণ চাহিদার তুলনায় এ প্রতিষ্ঠানটি যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দি এগ্রিকালচার ব্যাংক অব পাকিস্তান (এবিপি) এবং এর মূলধন বাড়িয়ে করা হয় ২০ কোটি রুপি। এরপর ১৯৬১ সালে এবিপিকে রূপান্তর করা হয় এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (এবিবিপি) এবং এ প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রদানের খাতসমূহও নতুনভাবে চিহ্নিত করা হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর এবিবিপিকে রূপান্তরিত করা হয় এডিবিবিতে। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ২৭নং আদেশ বলে ওই এডিবিবিকে সমন্বয় করা হয় বিকেবি নামকরণে। অর্থাৎ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক মর্যাদায়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রচলিত আইন ও অধ্যাদেশ অনুযায়ী একটি ব্যাংকিং কোম্পানি ও সরকারি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান মূলধন প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
এ দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ৮০ ভাগই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান ২০.১৬ ভাগ। বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যশস্যের চাহিদা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ টন। এর বিপরীতে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সক্ষমতা ১ কোটি ৭৭ লাখ টন। বাকি শস্য বিদেশ থেকে আমদানি করে প্রায় প্রতিবছরই চাহিদা পূরণের ঝুঁকিতে থাকছে সরকার। শুধু ২০০০-০১ অর্থবছরে কৃষি ব্যাংকের ঋণ সহায়তায় দেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। দেশে অন্যান্য সংস্থাসহ কৃষি খাতে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার মধ্যে কৃষি ব্যাংক একাই ৬৩ ভাগ ঋণ বিতরণ করে থাকে। কাজেই কৃষি অর্থনীতিতে কৃষি ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটি যে সমস্যার আবর্তে নিপতিত তা হচ্ছে, জনশক্তির অপ্রতুলতা ও মাঠপর্যায়ে দক্ষ কর্মীর অনুপস্থিতি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০০-০১ অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠানে জনবল ছিল ১১ হাজারেরও অধিক। ঋণস্থিতি ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে অধিক হারে কর্মকর্তা/কর্মচারী অবসরে চলে যাওয়ার পাশাপাশি নিয়োগ স্বল্পতার কারণে ব্যাংকটি জনবলের ভারসাম্যতা আর ধরে রাখতে পারেনি। ঋণগ্রহীতা ও ঋণস্থিতি বৃদ্ধির বিপরীতে লোপ পেতে থাকে মাঠপর্যায়ের পুরনো জনবল। কিছু নতুন নিয়োগের ব্যস্থা নিলেও দক্ষ জনশক্তির বলয় নিঃশেষের দারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। বর্তমানে কৃষি ব্যাংকে জনবল রয়েছে ৭ হাজারের কাছাকাছি। কিন্তু স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৩০ লাখ অতিক্রম করেছে। হঠাৎ করে জনশক্তি হ্রাসের কারণে ঋণ বিতরণপ্রবাহ, আদায় ও আমানত সংগ্রহে দারুণ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে কৃষি অর্থনীতি প্রবৃদ্ধিতে। বর্তমানে কৃষি ব্যাংকের ১ হাজার ২৫ শাখায় জনশক্তির বাজেট বরাদ্দের তুলনায় বণ্টনকৃত উপস্থিতি অর্ধেকেরও নিচে, যার জন্য গ্রাহক সেবা স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। শাখায় শাখায় অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, যে প্রতিষ্ঠানে জনশক্তির বাজেট ৮ জন, সেখানে কাজ করছে ৪ জন কর্মচারী। এতে আক্রান্ত হচ্ছে কৃষক ও কৃষি অর্থনীতি। কোনো কোনো শাখায় ক্যাশিয়ারই নেই। মাঠ কর্মকর্তা গ্রাম থেকে ৩টায় ফিরে এসে ক্যাশে বসেন। আর এতক্ষণ ধরে গ্রাহকরা তীর্থের কাকের মতো ব্যাংকে অপেক্ষা করতে থাকেন।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এ দেশে কৃষি ব্যাংকের জনবল সংকট উত্তরণের চিন্তা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় থাকা উচিত বলে কৃষিবিদ, বিদগ্ধজন ও বিশ্লেষকরা মনে করেন। এ অবস্থায় অবসরপ্রাপ্তদের দৈনিক চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে শাখাগুলোয় শুধু অফিসের কাজে সম্পৃক্ত করলে জনবল সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব এবং এতে ঋণ বিতরণ ও আদায় গতিশীল হবে।
আজিজ ইবনে মুসলিম
গলাচিপা,পটুয়াখালী
দৃষ্টিপাত পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close