¦
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

ড. একেএম শাহনাওয়াজ | প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

১৪৫
আমাদের পেছনে ফেরা দৃষ্টি যদি নিকট অতীতে গিয়ে থামে, তবে বাঙালির স্বজাত্যবোধ ও চেতনার শক্তি খুঁজতে হয় বায়ান্নর রক্তঝরা উত্তাল দিনগুলো থেকে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি যে আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছিল, সেই চেতনা পরাধীন দেশে তাকে বারবার প্রতিবাদী করেছে। এই চৈতন্যের পথ ধরে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা এসেছে। মাতৃভাষার সংগ্রামে বাঙালির ত্যাগ এতটাই মহান ছিল যে, তা অর্ধশতকের মধ্যেই আন্দোলিত করেছে বিশ্ববাসীকে। আর তাই ২১ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করায় শুধু সার্বভৌমত্বই নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক বিজয়ও যেন পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু বাঙালির এ বিজয়ের উৎস কি ১৯৫২ বা ১৯৪৮? আসলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চারণভূমি খুঁজতে হবে চৌদ্দ, পনের ও ষোল শতকে। যদি মধ্যযুগের এই কালপর্বে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রকৃত কর্ষণ না হতো, বাঙালির সংস্কৃত চর্চার যাত্রাপথ আটকে দেয়া অচলায়তন রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় ভেঙে না যেত, তাহলে কি আটচল্লিশ বা বায়ান্নতে বাঙালি স্বজাত্যবোধে উদ্দীপিত হওয়ার মানসিক জোর পেত? মধ্যযুগে বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে পটপরিবর্তন না হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী হতে পারত?
ইতিহাসের গতিধারা পর্যবেক্ষণ করলে এটি অতিশয়োক্তি করা হবে না যে, বাংলা ভাষা সাধারণ মানুষ বা প্রাকৃতজনের কথ্য ভাষার নড়বড়ে স্থান নিয়েই হয়তো কায়ক্লেশে টিকে থাকত। পরিচর্যাহীন সে ভাষায় বড় কোনো সাহিত্য সৃষ্টি দুরাশা হতো বললেও বোধ করি অন্যায় হবে না। এ মন্তব্য করার কারণ সুস্পষ্ট। ছয় থেকে আট শতকে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা চর্যাপদের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে ভ্রুণ শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন, তার উজ্জ্বল বিকাশের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল পাল শাসন যুগে। মনে হয়েছিল সংস্কৃত সাহিত্যের প্রবল বেষ্টনী থেকে বোধহয় বাংলা সাহিত্যের ছোট চারাটি বেরিয়ে আসবে আলোকিত মাটিতে। চর্যা গীতিকার আগে এ দেশে সাহিত্য হয় সংস্কৃত নয়তো প্রাকৃত ভাষায় চর্চা করা হতো। ধারণা করা হয়, বণিক ও সাধুসন্তদের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির ঢেউ পৌঁছানোর আগেই বাংলায় সংস্কৃত ভাষা প্রবেশ লাভে সক্ষম হয়েছিল। তাই সংস্কৃতকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষা বিকাশের সম্ভাবনা দেখা দিত না, যদি পাল রাজাদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি না থাকত।
চর্যাপদের চর্চা হয়েছে এ প্রেক্ষাপটেই। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা দান করতেও পিছপা ছিলেন না। এ কারণে পাল যুগে একটি উদার সংস্কৃতি বিকশিত হওয়ার সুযোগ ছিল। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চর্যাগীতিকার পথ ধরে হয়তো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একটি বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছতে পারত। কিন্তু ছন্দোচ্ছেদ ঘটল সুদূর কর্নাটবাসী কট্টর ব্রাহ্মণ সেনদের হাতে বাংলার রাজদণ্ড চলে যাওয়ায়। এই বিদেশী শাসকরা নিজেদের ক্ষমতার আসনকে শক্ত করার জন্য বাংলার সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি বিকাশের মূল সুর অঙ্কুরেই থামিয়ে দিতে চাইল। বর্ণপ্রথার পৃষ্ঠপোষক সেনরা শূদ্র ও অন্তঃজ শ্রেণী বলে সমাজের নিুস্তরে যাদের ফেলে রাখল, তারাই প্রধানত এ মাটির সন্তান-বাঙালি। তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার পথ তৈরি হোক, তা সচেতনভাবেই চাইল না শাসক সেনরা। ফলে ভাষা ও সাহিত্যের শক্তিকে অনুভব করার আগেই বাঙালি শাসক শ্রেণীর আঘাতে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল। সমাজ বিধান জারি হল- সংস্কৃত ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ বা শ্রবণ করা শূদ্রের জন্য হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশীয় ভাষায় ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ করলে পাতকের জায়গা হবে রৌরব নরকে। তাই গোটা সেন শাসন যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের কোনো সুযোগ রইল না। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল চর্যাপদের দোহা গান।
সম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close