¦
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

ড. একেএম শাহনাওয়াজ | প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

১৪৬
ভিনভাষী-ভিনদেশী সেন শাসকদের শাসনকালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের সম্ভাবনা অন্ধকারেই ঘুরপাক খায়। সাংস্কৃতিক শক্তিতে বাঙালির আত্মপোলব্ধির কোনো সুযোগ থাকে না। রাজক্ষমতায় বাঙালির ফিরে আসার কোনো সুযোগ তখন ছিল না। বাংলার রাজক্ষমতায় পালাবদলের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের সূচনা হয়। সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে পুনরায় বাংলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন ভিনভাষী-ভিনদেশী মুসলমান সুলতানরা। সংস্কৃতের বদলে এবার রাষ্ট্রভাষা হল ফারসি। বাংলা সাহিত্যের ভ্রুণশিশু শৈশব দেখার আগেই লাঞ্ছিত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তাই মধ্যযুগের এই রাজনৈতিক পালাবদলে তার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল স্বাভাবিক। যদি তা হতো তবে সাতচল্লিশের পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানি শাসক চক্রের গলদঘর্ম হওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। মাতৃভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্ব উপলব্ধির চেতনাও ততদিনে বাঙালির হারিয়ে ফেলার প্রশ্ন দেখা দিত না। ফলে ভাষার প্রশ্নে আটচল্লিশে প্রতিবাদী হওয়ার তেমন কারণ ছিল না। বায়ান্নতেও হয়তো রক্ত ঝরার ঘটনা ঘটত না।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সর্বোপরি বাঙালির সৌভাগ্য যে, বহিরাগত সুলতানরা বাংলার শাসনক্ষমতায় এসে অচিরেই নিজ কর্মভূমিকায় বাঙালি হয়ে যান। এর কারণ প্রধানত রাজনৈতিক। তেরো শতকের পর বাংলা দিল্লির সালতানাতের প্রদেশ হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কথা। কিন্তু এদেশে নিয়োজিত গভর্নররা বাংলার মাটির প্রকৃত হাতছানি অনুভব করলেন। এদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ, সমৃদ্ধ জীবন মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকেই যুগ যুগ ধরে উৎসাহিত করেছে। এ বাস্তবতাই বোধকরি উৎসাহিত করেছিল অবাঙালি গভর্নরদের। তারা অচিরেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন দিল্লির স্বজাতি সুলতানদের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহীদের দমন করার দায়িত্ব বর্তায় দিল্লির ওপর। তাই নিজ অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্যই বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণাকারী সুলতানদের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়েছিল। এভাবে চৌদ্দ শতকের ভেতরেই নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারেন বাংলার সুলতানরা। এরপর বাংলার প্রশ্নে হাল ছেড়ে দেন দিল্লির সুলতানরা। বাংলার স্বাধীন সুলতানি নির্বিঘ্নে বিকশিত হতে থাকে। অবাঙালি শাসকরাও ততদিনে বাংলার জল-মাটির সঙ্গে একাকার হয়ে গেছেন। পিতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ আর তাদের ছিল না। সুতরাং বাংলা আর বাঙালির সার্বিক শ্রী বৃদ্ধিতে তারা অকুণ্ঠচিত্তে ভূমিকা রেখেছেন। সুলতানদের কর্মভূমিকায় যে উদারতা দেখা গেছে, তার প্রেক্ষাপটও খুঁজতে হবে এখানেই। সুলতানরা অনুভব করেছিলেন বাঙালির প্রকৃত সংস্কৃতিকে বিকশিত করেই বাঙালির মনন অনুভব করা যাবে। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে এর প্রয়োজন আছে। এ কারণেই সেনযুগের বদ্ধ অর্গল খুলে গেল সুলতানদের উদার নীতিতে। ধর্ম-নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সাহিত্য চর্চার দ্বার অবারিত হল। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ার তীব্র হল। অচিরেই তার ফসল দেখা দিল। বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হল। এ ভাষায় কাব্যে সৃষ্টি হতে থাকল। সাধারণ হিন্দুর মধ্যেও যে ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছিল, তা বোঝা গেল এ শ্রেণীর কবিদের কাব্য রচনা দেখে। এভাবে সুলতানি যুগের উদার পরিবেশ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন প্রেরণা দিল। বাঙালি কবিরা সৃষ্টি করলেন মঙ্গল কাব্যের বিশাল ভাণ্ডার। এতে হিন্দু সমাজ ধর্মীয় প্রেরণার মধ্য দিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে শাণিত করার নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করল।
 

সম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close