jugantor
ত্বকী হত্যায় অংশ নেয় ১১ জন : নির্দেশক আজমেরী
শিগগিরই আদালতে চার্জশিট

  তোহুর আহমদ  

০৬ মার্চ ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের খুনিরা শনাক্ত হয়েছে। এই খুনের মূল পরিকল্পক, নির্দেশক ও সরাসরি অংশগ্রহণকারী হলেন আজমেরী ওসমান। আজমেরী নারায়ণগঞ্জের এমপি নাসিম ওসমানের ছেলে। হত্যাকাণ্ডে আজমিরীর সঙ্গী হয়েছিল আরও ১০ জন। ত্বকী হত্যার আজ এক বছর পূর্তির সময়সীমার মধ্যে খুনি শনাক্তকরণে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছেন র‌্যাব ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। শিগগির এ সংক্রান্ত চার্জশিট আদালতে পেশ করা হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে মামলার অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থার হালনাগাদ তথ্য যুগান্তরের হাতে এসেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘাতকরা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে সুপরিকল্পিতভাবে তিনটি পর্বে এ হত্যা ঘটায়। প্রথম পর্বে বেশ কিছুদিন ধরে আজমেরীর ছয় সহযোগী ত্বকীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় পর্বে কিলিং পয়েন্ট হিসেবে ওসমান পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইনার ফ্যাশন ভবনকে বেছে নেয়া হয়। অপরাধ সংঘটনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে দ্রুত গাড়ি নিয়ে ঢুকতে না পারে সেজন্য ভবনের পাশের রাস্তায় বাঁশ ফেলে বাধা তৈরি করে রাখা হয়। তৃতীয় পর্বে সাত ব্যক্তি ত্বকীকে তুলে আনে এবং হত্যাকাণ্ডের পর লাশ কুমুদিনী খালে ফেলে দেয়।

গত বছরের ৬ মার্চ এ হত্যাকাণ্ডের পর নারায়ণগঞ্জসহ দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। দীর্ঘ তদন্তে সেই সত্যিই বেরিয়ে এলো।

সংশ্লিষ্টতা : বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ত্বকী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জাতীয় পার্টির এমপি একেএম নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমান। কিলিং মিশনে অংশ নেয় আজমেরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও নারায়ণগঞ্জ শহরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেন লিটন ওরফে বিলাই চক্ষু লিটন, তায়েব উদ্দীন আহমেদ ওরফে জ্যাকি, রাজীব, কালাম সিকদার, অপু, মামুন, যুবলীগ নেতা শাহ নিজামের ভাই কাজল, শিপান ও জামশেদ।

যেভাবে হত্যা : ত্বকীকে হত্যার জন্য আজমেরীর ডানহাত সন্ত্রাসী সুলতান শওকত ভ্রমর, কালাম সিকদার, লিটন, মামুন ও রাজীবের সঙ্গে পরামর্শ করে দিনক্ষণ ঠিক করে। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য আজমেরীর টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত শহরের ইকবাল রোডে অবস্থিত ওসমান পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইনার ফ্যাশনকে বেছে নেয়। এজন্য ইকবাল রোডের দু’স্থানে বাঁশ ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গাড়ি আসার আগেই তারা সরে পড়তে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউসুফ হোসেন লিটন, কালাম শিকদার মামুন, রাজীব ও জামশেদ আজমেরীর ব্যবহৃত এক্স ফিল্ডার গাড়িতে করে সমাজকল্যাণ অফিসের সামনে থেকে ত্বকীকে অপহরণ করে উইনার ফ্যাশনে নিয়ে যায়। রাত সাড়ে ৯টার সময় ত্বকীকে আজমেরীর কক্ষে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়। রাত ১১টার দিকে আজমেরীর উপস্থিতিতে ত্বকীকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। একপর্যায়ে কালাম সিকদার ত্বকীর বুকের ওপর উঠে গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর লাশ ফেলে দিয়ে আসার নির্দেশ দেয় আজমেরী। লাশ গুম করার জন্য মধ্যরাতে ত্বকীর লাশ বস্তাবন্দি করে তোলা হয় আজমেরীর গাড়ির বুটে (ডালা তুলে ভেতরে কিছু রাখার ফাঁকা জায়গা)। গাড়ি চালাতে শুরু করে আজমেরীর ড্রাইভার জামসেদ। তার পাশে বসে সুলতান শওকত ভ্রমর। গাড়ির পেছনে বসে বিলাই চক্ষু লিটন, রাজীব, কালাম সিকদার ও মামুন। গাড়ি নিয়ে তারা শহরের চারারগোপ এলাকায় যায়। সেখানে একটি তেলের দোকানের পাশে ১৬ তলা ভবনের সামনে গাড়ি পার্ক করা হয়। এরপর গাড়ি থেকে ত্বকীর লাশ নামিয়ে নৌকায় তোলা হয়। নৌকাযোগে লাশ নিয়ে গিয়ে কুমুদিনী জোড়া খালের পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে তারা উইনার ফ্যাশনে ফিরে আসে। মিশন সফল করায় আজমেরী সবাইকে বিরিয়ানি খাইয়ে আপ্যায়ন করে। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর ৮ মার্চ কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্তভার যায় র‌্যাবের কাছে।

যে কারণে হত্যা : বিগত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ওসমান পরিবারের প্রার্থী ও আজমেরীর চাচা শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার চালান। শামীম ওসমানের বিরোধী প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে তিনি তার সমর্থকদের কাজে লাগান। এছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় রাব্বীর ওপর ক্ষুব্ধ হয় ওসমান পরিবার। ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান আজমেরী ওসমান রাফিউর রাব্বীকে শায়েস্তা করতে তার কিশোর পুত্রকে খুনের পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ত্বকীকে হত্যা করা হয়। তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, কিশোর ত্বকীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। অত্যন্ত মেধাবী এই ছাত্র গত বছরের ৭ মার্চ ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ নম্বর পেয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

যারা পলাতক : হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী আজমেরী ওসমানসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ৮ জনই পলাতক। তারা হল- রাজীব, কালাম সিকদার, মামুন, অপু, কাজল, শিপান ও আজমেরীর গাড়িচালক জামশেদ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মাত্র ৫ জনকে গ্রেফতার করা গেছে। এরা হল- ইউসুফ হোসেন লিটন ওরফে বিলাই চক্ষু লিটন, সালেহ রহমান ওরফে সীমান্ত, রিফাত বিন ওসমান, সুলতান শওকত ভ্রমর, তায়েব উদ্দীন ওরফে জ্যাকি। এদের মধ্যে খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত দু’জন আসামি ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, কারাগারে আটক সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হতে পারে। কারাবন্দি আরেক আসামি তায়েব উদ্দীন ওরফে জ্যাকির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তিনি এখনও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

মামলার আলামত : সূত্র জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ও গলাটিপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল উইনার ফ্যাশন থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত তিনটি লাঠি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ত্বকীকে অপহরণ ও লাশ গুমের কাজে ব্যবহৃত আজমেরীর এক্স ফিল্ডার ও সুলতান শওকত ভ্রমরের মার্ক গাড়ি দুটির হদিস পাওয়া যায়নি। এ দুটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, মালিকানা ও বর্তমান অবস্থানসহ যাবতীয় তথ্যের জন্য বিআরটিএ’র পরিচালকের কাছে আবেদন পাঠিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার গতি নিয়ে কথা : ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ঘটনার সঙ্গে আজমেরী ওসমান কোনোভাবেই জড়িত নয়। তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই খুনের ঘটনায় ফাঁসাতে গ্রেফতারকৃতদের নির্যাতন করে জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এখন পর্যন্ত যে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের সবাইকে কয়েক মাস ধরে গুম করে রেখে তারপর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই মামলা তদন্তে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এখন যে মামলা সঠিক গতিতে চলছে তা বলা যাবে না। কারণ লিটন ও ভ্রমর ঘটনার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও পরে তারা দু’জনেই আদালতের কাছে জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। সর্বশেষ আবেদনে তারা বলেছে, দীর্ঘদিন গুম করে রেখে অমানুষিক নির্যাতনের পর সাজানো জবানবন্দি দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শাস্তি দেখতে চায় পরিবার : ত্বকী হত্যার এক বছর পূর্তিতে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার পর আমরা বলেছিলাম, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওসমান পরিবার জড়িত। আমরা বেশ কয়েকজনের নামও বলেছিলাম। কিন্তু পুলিশ তাদের স্পর্শ করেনি। র‌্যাব তাদের তদন্তে ওসমান পরিবারের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। এখন তাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব হালিম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা ত্বকীর হত্যার বিচার চেয়ে এখনও প্রতিদিন হুমকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আমরা এ হুমকির অবসান চাই।


 

সাবমিট

ত্বকী হত্যায় অংশ নেয় ১১ জন : নির্দেশক আজমেরী

শিগগিরই আদালতে চার্জশিট
 তোহুর আহমদ 
০৬ মার্চ ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের খুনিরা শনাক্ত হয়েছে। এই খুনের মূল পরিকল্পক, নির্দেশক ও সরাসরি অংশগ্রহণকারী হলেন আজমেরী ওসমান। আজমেরী নারায়ণগঞ্জের এমপি নাসিম ওসমানের ছেলে। হত্যাকাণ্ডে আজমিরীর সঙ্গী হয়েছিল আরও ১০ জন। ত্বকী হত্যার আজ এক বছর পূর্তির সময়সীমার মধ্যে খুনি শনাক্তকরণে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছেন র‌্যাব ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। শিগগির এ সংক্রান্ত চার্জশিট আদালতে পেশ করা হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে মামলার অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থার হালনাগাদ তথ্য যুগান্তরের হাতে এসেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘাতকরা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে সুপরিকল্পিতভাবে তিনটি পর্বে এ হত্যা ঘটায়। প্রথম পর্বে বেশ কিছুদিন ধরে আজমেরীর ছয় সহযোগী ত্বকীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় পর্বে কিলিং পয়েন্ট হিসেবে ওসমান পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইনার ফ্যাশন ভবনকে বেছে নেয়া হয়। অপরাধ সংঘটনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে দ্রুত গাড়ি নিয়ে ঢুকতে না পারে সেজন্য ভবনের পাশের রাস্তায় বাঁশ ফেলে বাধা তৈরি করে রাখা হয়। তৃতীয় পর্বে সাত ব্যক্তি ত্বকীকে তুলে আনে এবং হত্যাকাণ্ডের পর লাশ কুমুদিনী খালে ফেলে দেয়।

গত বছরের ৬ মার্চ এ হত্যাকাণ্ডের পর নারায়ণগঞ্জসহ দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। দীর্ঘ তদন্তে সেই সত্যিই বেরিয়ে এলো।

সংশ্লিষ্টতা : বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ত্বকী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জাতীয় পার্টির এমপি একেএম নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমান। কিলিং মিশনে অংশ নেয় আজমেরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও নারায়ণগঞ্জ শহরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেন লিটন ওরফে বিলাই চক্ষু লিটন, তায়েব উদ্দীন আহমেদ ওরফে জ্যাকি, রাজীব, কালাম সিকদার, অপু, মামুন, যুবলীগ নেতা শাহ নিজামের ভাই কাজল, শিপান ও জামশেদ।

যেভাবে হত্যা : ত্বকীকে হত্যার জন্য আজমেরীর ডানহাত সন্ত্রাসী সুলতান শওকত ভ্রমর, কালাম সিকদার, লিটন, মামুন ও রাজীবের সঙ্গে পরামর্শ করে দিনক্ষণ ঠিক করে। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য আজমেরীর টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত শহরের ইকবাল রোডে অবস্থিত ওসমান পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইনার ফ্যাশনকে বেছে নেয়। এজন্য ইকবাল রোডের দু’স্থানে বাঁশ ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গাড়ি আসার আগেই তারা সরে পড়তে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউসুফ হোসেন লিটন, কালাম শিকদার মামুন, রাজীব ও জামশেদ আজমেরীর ব্যবহৃত এক্স ফিল্ডার গাড়িতে করে সমাজকল্যাণ অফিসের সামনে থেকে ত্বকীকে অপহরণ করে উইনার ফ্যাশনে নিয়ে যায়। রাত সাড়ে ৯টার সময় ত্বকীকে আজমেরীর কক্ষে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়। রাত ১১টার দিকে আজমেরীর উপস্থিতিতে ত্বকীকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। একপর্যায়ে কালাম সিকদার ত্বকীর বুকের ওপর উঠে গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর লাশ ফেলে দিয়ে আসার নির্দেশ দেয় আজমেরী। লাশ গুম করার জন্য মধ্যরাতে ত্বকীর লাশ বস্তাবন্দি করে তোলা হয় আজমেরীর গাড়ির বুটে (ডালা তুলে ভেতরে কিছু রাখার ফাঁকা জায়গা)। গাড়ি চালাতে শুরু করে আজমেরীর ড্রাইভার জামসেদ। তার পাশে বসে সুলতান শওকত ভ্রমর। গাড়ির পেছনে বসে বিলাই চক্ষু লিটন, রাজীব, কালাম সিকদার ও মামুন। গাড়ি নিয়ে তারা শহরের চারারগোপ এলাকায় যায়। সেখানে একটি তেলের দোকানের পাশে ১৬ তলা ভবনের সামনে গাড়ি পার্ক করা হয়। এরপর গাড়ি থেকে ত্বকীর লাশ নামিয়ে নৌকায় তোলা হয়। নৌকাযোগে লাশ নিয়ে গিয়ে কুমুদিনী জোড়া খালের পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে তারা উইনার ফ্যাশনে ফিরে আসে। মিশন সফল করায় আজমেরী সবাইকে বিরিয়ানি খাইয়ে আপ্যায়ন করে। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর ৮ মার্চ কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্তভার যায় র‌্যাবের কাছে।

যে কারণে হত্যা : বিগত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ওসমান পরিবারের প্রার্থী ও আজমেরীর চাচা শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার চালান। শামীম ওসমানের বিরোধী প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে তিনি তার সমর্থকদের কাজে লাগান। এছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় রাব্বীর ওপর ক্ষুব্ধ হয় ওসমান পরিবার। ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান আজমেরী ওসমান রাফিউর রাব্বীকে শায়েস্তা করতে তার কিশোর পুত্রকে খুনের পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ত্বকীকে হত্যা করা হয়। তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, কিশোর ত্বকীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। অত্যন্ত মেধাবী এই ছাত্র গত বছরের ৭ মার্চ ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ নম্বর পেয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

যারা পলাতক : হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী আজমেরী ওসমানসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ৮ জনই পলাতক। তারা হল- রাজীব, কালাম সিকদার, মামুন, অপু, কাজল, শিপান ও আজমেরীর গাড়িচালক জামশেদ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মাত্র ৫ জনকে গ্রেফতার করা গেছে। এরা হল- ইউসুফ হোসেন লিটন ওরফে বিলাই চক্ষু লিটন, সালেহ রহমান ওরফে সীমান্ত, রিফাত বিন ওসমান, সুলতান শওকত ভ্রমর, তায়েব উদ্দীন ওরফে জ্যাকি। এদের মধ্যে খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত দু’জন আসামি ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, কারাগারে আটক সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হতে পারে। কারাবন্দি আরেক আসামি তায়েব উদ্দীন ওরফে জ্যাকির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তিনি এখনও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

মামলার আলামত : সূত্র জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ও গলাটিপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল উইনার ফ্যাশন থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত তিনটি লাঠি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ত্বকীকে অপহরণ ও লাশ গুমের কাজে ব্যবহৃত আজমেরীর এক্স ফিল্ডার ও সুলতান শওকত ভ্রমরের মার্ক গাড়ি দুটির হদিস পাওয়া যায়নি। এ দুটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, মালিকানা ও বর্তমান অবস্থানসহ যাবতীয় তথ্যের জন্য বিআরটিএ’র পরিচালকের কাছে আবেদন পাঠিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার গতি নিয়ে কথা : ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ঘটনার সঙ্গে আজমেরী ওসমান কোনোভাবেই জড়িত নয়। তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই খুনের ঘটনায় ফাঁসাতে গ্রেফতারকৃতদের নির্যাতন করে জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এখন পর্যন্ত যে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের সবাইকে কয়েক মাস ধরে গুম করে রেখে তারপর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই মামলা তদন্তে পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এখন যে মামলা সঠিক গতিতে চলছে তা বলা যাবে না। কারণ লিটন ও ভ্রমর ঘটনার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও পরে তারা দু’জনেই আদালতের কাছে জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। সর্বশেষ আবেদনে তারা বলেছে, দীর্ঘদিন গুম করে রেখে অমানুষিক নির্যাতনের পর সাজানো জবানবন্দি দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শাস্তি দেখতে চায় পরিবার : ত্বকী হত্যার এক বছর পূর্তিতে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার পর আমরা বলেছিলাম, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওসমান পরিবার জড়িত। আমরা বেশ কয়েকজনের নামও বলেছিলাম। কিন্তু পুলিশ তাদের স্পর্শ করেনি। র‌্যাব তাদের তদন্তে ওসমান পরিবারের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। এখন তাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব হালিম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা ত্বকীর হত্যার বিচার চেয়ে এখনও প্রতিদিন হুমকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আমরা এ হুমকির অবসান চাই।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র