¦
ফাঁসি ৮ জনের যাবজ্জীবন ৬

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৪

রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় দায়েরকৃত মামলায় হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোঃ রুহুল আমিন সোমবার দুপুরে এ রায় দেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী বলেছেন, মামলার রায়ে তারা খুশি নন। এর বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন। অন্যদিকে সরকারি পক্ষের আইনজীবীও ছয়জনকে যাবজ্জীবন দেয়ার ঘটনায় আপিল করবেন বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এতে ১০ জন নিহত এবং আহত হন অনেকে। ঘটনার ১৩ বছর পর সোমবার মামলার রায় ঘোষণা হয়। এই মামলার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে লোকজনকে হতাহত করে দেশে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে অস্থিতিশীল এবং উৎখাতের জন্য রমনা বটমূলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। একই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়েরকৃত মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন।
১৬ জুন এই মামলার রায় দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু রায় লেখা শেষ না হওয়ায় ওই দিন আদালত ২৩ জুন নতুন তারিখ ধার্য করেন। আদালত সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রায় পড়া শুরু করেন। এ মামলায় কারাগারে আটক আসামিরা রায় পড়ার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসাইন, মুফতি আবদুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা তাজউদ্দিন ও আরিফ হাসান সুমন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা শওকত ওসমান ও শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আটজনের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদেরও একই অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে, অনাদায়ে অতিরিক্ত এক বছর সাজাভোগ করতে হবে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক রয়েছেন মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে কারাগার থেকে ৯ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। বেলা ১১টার পর তাদের আদালতে তোলা হয়। রায় ঘোষণার পর হান্নানসহ সবাই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, আমরা নির্দোষ।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। হামলায় ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মারা যান আরও একজন। নিহতরা হলেন চট্টগ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৩৫), বরগুনার মোঃ জসীম (২৩), ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার এমরান (৩২), পটুয়াখালীর অসীম চন্দ্র সরকার (২৫), পটুয়াখালীর মোঃ মামুন, ঢাকার দোহার উপজেলার আফসার (৩৪), নোয়াখালীর ইসমাইল হোসেন ওরফে স্বপন (২৭), পটুয়াখালীর শিল্পী (২০) ও অজ্ঞাত একজন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। যে কারণে তাদের প্রতি কোনো প্রকারের অনুকম্পা বা সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, রমনা বটমূলের বোমা হামলা মামলায় যারা আহত কিংবা নিহত হয়েছেন তাদের সঙ্গে আসামিদের কোনো ধরনের শত্র“তা ছিল না। আবহমানকাল থেকে চলে আসা বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অংশ পহেলা বৈশাখ উদযাপন। আর ছায়ানট ষাট দশক থেকে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে আসছে। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলিত হয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির অগ্রযাত্রাকে নস্যাৎ করতে আসামিরা নিরীহ জনগণের ওপর বোমা হামলা চালিয়ে জঘন্যতম ও নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে। এ মামলায় ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ায় খুশি নন মামলা পরিচালনাকারী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এসএম জাহিদ সরদার। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত যেখানে বলেছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। ছয় আসামি যাবজ্জীবন পাওয়ায় আমরা খুশি না। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।’
অপরদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা এ রায়ে খুশি নই। মামলা সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলেও আদালত আসামিদের সাজা দিয়েছেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।’ অপরদিকে নিজের মামলা পরিচালনাকারী মুফতি হান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো সাক্ষী আমার বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য দেয়নি। জোর করে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।’
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র চালানোয় পারদর্শী মুফতি হান্নান মুন্সি, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা নূরউদ্দিন নুরুল্লাহ, মাওলানা আবু সাঈদসহ কতিপয় ব্যক্তি আফগান যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশে ফেরত এসে ‘হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ’ নামে একটি মৌলবাদী সংগঠন সৃষ্টি করে। সহযোগী হিসেবে মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা তাজউদ্দিন, আহসান উল্লাহ কাজল, মুত্তাকিন, মুরসালিন মহিবুল্লাহ, মাওলানা আবু বকর, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা সাব্বির, ওমর ফারুক, আরিফ হাসান সুমনদের ওই সংগঠনে সম্পৃক্ত করে। এরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে লোকজনকে হতাহত করে দেশে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় শক্তিশালী বোমা পেতে রাখে, যশোরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোসহ নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে তারা সিলেটে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা, ডা. রিফাতের বাসায় বোমা বিস্ফোরণ, ব্রিটিশ হাইকমিশনের ওপর গ্রেনেড হামলা, মেয়র কামরান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শাহ এমএস কিবরিয়া, জেবুন্নেছা হক এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।
এ মামলায় তিনজন নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরা হলেন মুফতি হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন ও আরিফ হাসান সুমন। স্বীকারোক্তিতে সুমন বলেন, ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখের আগের দিন মাওলানা তাজউদ্দিন আমাকে তার বাসায় ডাকে। তার নির্দেশে ও তার দেয়া ট্যাক্সিক্যাব ব্যবহার করে আমি, জুয়েল ও সুজন রমনা বটমূলে যাই। পরে আমি চলে এলে জুয়েল ও সুজন সেখানে বোমা ফিট করে চলে আসে।
অপরদিকে স্বীকারোক্তিতে মুফতি হান্নান বলেন, ঢাকা মহানগরীর দায়িত্বে থাকা হুজির রণাঙ্গনের শিল্পগোষ্ঠীর সভাপতি হাফেজ আবু তাহের, ঢাকার মাওলানা শেখ ফরিদের কাছে পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে গানের অনুষ্ঠান চলাকালে অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য বোমা বিস্ফোরণ করার প্রস্তাব আসে। পরে সিদ্ধান্ত হয় বোমা হামলা চালানোর। মাওলানা আবদুর রউফ, ইয়াহিয়া, সাব্বির, জাহাঙ্গীর বদর, আবু বকর ও আমিসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে শেখ ফরিদের মাধ্যমে তাহেরকে রমনা বটমূলের ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের আদেশ দেয়া হয়। তাহের তার লোকজন নিয়ে কাজ করে। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৬১ সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। হামলায় আহত পুলিশের আটজন সদস্য আদালতে সাক্ষ্য দেন। আর আহতদের মধ্যে সাতজন, নিহতদের ছয়জন আÍীয়, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকারীদের চারজন, চিকিৎসক দুইজন, জবানবন্দি রেকর্ডকারী দুইজন বিচারক মামলায় সাক্ষ্য দেন। মামলার বাদী অমল চন্দ্র আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে বলেন, রমনা থানার অধীনে বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলাম। ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখ ছায়ানট নববর্ষ উদযাপনের জন্য রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিকাল ৫টা থেকে ওই স্থানে আমার ডিউটি ছিল। ভোট ৫টা থেকে আমি আমার ফোর্সসহ রমনা বটমূলে ডিউটি করছিলাম। অনুষ্ঠান সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়। অনুষ্ঠানস্থলে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটের সময় রমনা বটমূলের অনুষ্ঠানস্থলের ১৫ থেকে ২০ গজ দক্ষিণ-পশ্চিমে বিকট আওয়াজ শুনতে পাই। আওয়াজ শোনার পরপরই কাছে গিয়ে দেখি, বোমা বিস্ফোরণে অনেক লোকের হাতে-পায়ে আঘাতের চিহ্ন ও মাথা রক্তাক্ত। সবাই কাতরাচ্ছে।
এ ঘটনার প্রায় আট বছর পর ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক আবু হেনা মোঃ ইউসুফ। এ মামলায় সাত তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেন। তদন্ত কর্মকর্তা বারবার পরিবর্তন, সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল ও তদন্ত কর্মকর্তারা ঠিক সময়ে আদালতে সাক্ষ্য না দেয়ার কারণে মামলার বিচার শুরু হতে বিলম্ব হয়। দুটি মামলারই অভিযোগপত্র একসঙ্গে দাখিল করা হয়। পরে বিচারের জন্য মামলা দুটি ২০০৯ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। আর ১০ নভেম্বর আসামিদের নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় জবানবন্দি দেন।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close